SIR Tribunal and EC

কমিশন কি চাইছে

সম্পাদকীয় বিভাগ

ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার সার কথাটাই হলো বিচার প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হবে এবং এমনভাবে রায় ঘোষিত হবে যাতে কোনও অবস্থাতেই কোনও নিরাপরাধ সাজা না পায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাহাত্ম্য নিহিত আছে এই জায়গাতেই। গণতন্ত্রে নাগরিকরাই সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন থাকে। তাই গণতান্ত্রিক দেশের আইন, তদন্ত প্রক্রিয়া ও বিচার ব্যবস্থা সেভাবেই গড়ে ওঠে যাতে প্রকৃত অপরাধীরাই উপযুক্ত সাজা পায়। তেমনি নির্বাচন কমিশনকেও এমনভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয় এবং ভোটার তালিকা তৈরি করতে হয় যাতে দেশের একজন নাগরিক বা একজন প্রকৃত ভোটারেরও ভোটাধিকার হারাতে না হয়। গণতন্ত্রে নাগরিকদের ভোটেই দে‍‌শের সরকার নির্বাচিত হয়। সেখানে যোগ্য ভোটারই যদি ভোট দিতে না পারেন বা ভোটাধিকার না থাকে তাহলে সেই গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন  সেটা হয়ে যায় শাসকতন্ত্র। জনগণের মতামতের কোনও গুরুত্ব থাকে না। শাসক তাদের ক্ষমতার স্বার্থে বাছাই করা ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেবার চেষ্টা করে। শাসকের ছাতার তলায় শাসকের হয়ে কাজ করতে নির্বাচন কমিশন।
দেশজুড়ে এমন গুরুতর এবং উদ্বেগজনক অভিযোগটি উঠছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। ভোটার তালিকা তৈরির প্রশ্নে যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবার কথা সেখানে কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি ছাঁটাইমূলক। অর্থাৎ তাদের পাখির চোখ তালিকা থেকে নাম বাদ দেবার দিকে, নাম রাখা বা যুক্ত করার দিকে নয়। একাজ করতে গিয়ে না জটিলতার ও অস্বচ্ছতার আড়ালে পাইকারি হারে তালিকা থেকে যোগ্যদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। স্বৈরাচারী ও আধিপত্যবাদী শাসকের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হচ্ছে কমিশনের কাজে। এদের গোপন লক্ষ্য অযোগ্য খোঁজার ছলে রাজনৈতিক বিপক্ষদের যথাসম্ভব তালিকা থেকে ছাঁটাই করে ফেলা। এটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সলিল সমাধির রাস্তা প্রশস্ত করে।
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নামে পশ্চিমবঙ্গে যে প্রথা ও পদ্ধতি কমিশন অবলম্বন করেছে এবং প্রতিনিয়ত নিয়ম বদল করে শর্ত বদল করে প্রক্রিয়াকে জটিল থেকে জটিলতর করেছে তার থেকে পরিষ্কার ভোটাধিকার কাড়াই প্রধান লক্ষ্য। খসড়া তালিকা প্রকা‍‌শের পর প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বিচারাধীন থাকে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের যাচাইয়ের পর যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা তৈরি হয় তাতে বাদ যায় ২৭ লক্ষ নাম। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই ২৭ লক্ষ ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট তখন ট্রাইবুনাল গঠন করে বাদ যাওয়া ২৭ লক্ষ ভোটারের আবেদন বিচার করার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালত এটাও স্পষ্ট করে দেয় ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানে বেনাগরিক হওয়া নয় বা তাদের নাগরিক অধিকার বাতিল হওয়া নয়।
এখন আরটিআই করে পাওয়া তথ্য এবং সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা নির্বাচন কমিশনের তথ্য থেকে জানা যায় ৭ আগস্ট পর্যন্ত ৩৮ লক্ষ আবেদন জমা পড়ে ট্রাইবুনালে। তালিকায় বাদ যাওয়া ২৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৭ লক্ষ নাম যুক্ত করার আবেদন করেছে। তাহলে মোট আবেদনের মধ্যে বাকি ৩১ লক্ষ আবেদন অবশ্যই এসেছে নির্বাচন কমিশন থেকে। কমিশনের চোখে যারা যৌক্তিক অসঙ্গতির কারণে বিবেচনাধীন ছিল এবং বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্তে তালিকাভুক্ত হয়েছে তাদের ৩১ লক্ষকে তালিকা থেকে বাদ দিতে আবেদন করা হয়েছে। অর্থাৎ কমিশন নাম ছাঁটাই করতেই বেশি উৎসাহী।
এদিকে বাতিল হওয়া ভোটারদের যে ৭ লক্ষ ফের নাম তোলার আবেদন করেন তার মধ্যে ৮২ হাজার আবেদনের ফয়সালা হয়েছে। ৭৫ হাজার অর্থাৎ ৯১ শতাংশ ভোটারের নাম তালিকাভুক্তির ছাড়পত্র মিলেছে। এই ঘটনায় পরিষ্কার কমিশন অকারণ জটিলতা তৈরি করে পাইকারি হারে ভোটাধিকার কাড়ার চেষ্টা করেছে। ট্রাইবুনাল সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর পরও তালিকায় থাকা আরও ৩১ লক্ষ নাম বাদ দেবার আবেদন করেছে। প্রশ্ন কার নির্দেশে বা কার স্বার্থে কমিশন প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেবার চেষ্টা করছে?

Comments :0

Login to leave a comment