EDITORIAL

সংস্কৃতি রক্ষার দায়

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাজ্যে ক্ষমতা হাত বদলের অব্যবহিত পরেই নতুন শাসক আরএসএস-বিজেপি’র আ‍‌শ্রিত এক দল দুষ্কৃতী বাংলার নাট্য ঐতিহ্যের অন্যতম পীঠস্থান আকাদেমি অব ফাইন আর্টস’র একটি অংশে চিরাচরিত সাদা রং মুছে গেরুয়া রং করে দেয়। বার্তা দেওয়া হয় জমানা বদলের আবহে রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী গেরুয়া সংস্কৃতির দখলদারির। গোবলয়ের ধর্মান্ধ সংস্কৃতির আমদানি হবে এ রাজ্যে। শুরু হবে উদার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতি চর্চার উপর গেরুয়া আগ্রাসন। গেরুয়া রাজনীতির দখলদারিত্ব কায়েম করতে অনুগামীরা সময় নষ্ট করেনি। অত্যুৎসাহে কাজে নামে গেরুয়া রং নিয়ে। টার্গেট আকাদেমি অব ফাইন আর্টস। এই দুষ্কৃতীদের রাজনৈতিক গুরুরা হয়তো বাজিয়ে দেখতে চেয়েছে বাংলার নাট্যকর্মীদের সংস্কৃতি চেতনার তেজ ঠিক কতটা। আকাদেমিকে টেস্ট কেস হিসাবে বুঝতে চেয়েছিল গোটা রাজ্যের নাট্যচর্চা ও নাট্য আন্দোলনকে কীভাবে এবং কতটা কবজা করা যাবে।
শুধু আকাদেমির রং বদলের চেষ্টা নয় আক্রান্ত হয়েছে শুভঙ্কর দাসশর্মা নামে একজন নাট্যকর্মী। তাকে বেধড়ক মারধর করে এতটাই জখম করা হয় যে বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে। তার কানের পর্দা চিরতরে নষ্ট হবার মুখে। হামলা হয়েছে একটি নাটক চলাকালীন সময়ে। নাটকের আবহ সঙ্গীতে আজানের ধ্বনি থাকায় স্বঘোষিত কিছু স্থানীয় গেরুয়া মাতব্বর হলে ঢুকে ফতোয়া জারি করে আজানের শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। নাট্য কর্মী ও দর্শকদের সম্মিলিত প্রতিরোধে তারা অবশ্য রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনাগুলি থেকে পরিষ্কার নাটক, সঙ্গীত সহ সংস্কৃতির যাবতীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন ভাবনার প্রকাশে হিন্দুত্ববাদী কূপমণ্ডুকদের আপত্তি আছে। রাজ্যে যেহেতু তারা ক্ষমতায় তাই তাদের গেরুয়া সংস্কৃতির বাইরে আর কোনও সাংস্কৃতিক ভাবনাকে পরিসর দেওয়া যাবে না। কিন্তু গেরুয়া সংস্কৃতির কালকাযোগীদের ধারণাই নেই যে এখনও গোটা বিশ্ব বাংলা তথা কলকাতাকে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে মান্যতা দেয়। বাংলার সংস্কৃতি উদারবাদী ও প্রগতিশীল ঐতিহ্যের শেকড় প্রোথিত আছে সেই নবজাগরণের উর্বর মাটিতে। বাংলার সংস্কৃতি চেতনা নৈরাজ্যবাদী বা ধর্মান্ধ রাজনীতির তোয়াক্কা করে না। শাসকের রক্ত চক্ষুর সামনে প্রতিস্পর্ধী হতে তাদের হাঁটু কাপে না। ধর্ম, মত, সম্প্রদায়, জাত ইত্যাদির বিভাজন রেখা উচ্ছেদ করে বাংলার সংস্কৃতির অনন্ত স্রোত প্রবাহিত হয় মিলনের ধারায়। প্রকৃতির সৃষ্টি মানুষ আপন ছন্দে সৃষ্টির আনন্দে মেতে থাকে। তারই শৈল্পিক প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতির নানা আঙিনায়। বাংলা তাকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। বাংলার সংস্কৃতির শাসক রাজনীতির দাসত্বকে কোনোদিন মেনে নেয়নি, নেবেও না।
আকাদেমিতে শাসক রাজনীতির রঙের প্রলেপ দিয়ে নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী তথা নাট্যানুরাগীদের মাথা নোয়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী এবং রং মোছার দাবি সংবলিত চিঠি গেছে শাসক দলের রাজ্য প্রধানের কাছে। নাট্যকর্মীরা তাঁর সাথে দেখাও করেছিলেন। তিনি দুষ্কৃতীদের দলীয় মান্যতা দেননি এবং একপক্ষকালের মধ্যে সাদা রং ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যথারীতি পালন করেননি। অতএব আকাদেমির কলঙ্কমোচন করে তার শ্বেত শুভ্রতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিজ হাতেই পালন করলেন নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

Comments :0

Login to leave a comment