Editorial

‍মহা সঙ্কটে ট্রাম্প

সম্পাদকীয় বিভাগ

ইরানকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার দিবাস্বপ্নে বিভোর ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। অতি ঘনিষ্ট বন্ধু রাষ্ট্র ইজরায়েলের অপরিণামদর্শী আবদার ফেলতে না পেরে তড়িঘড়ি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়লেন। ভেবেছিলেন ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার মতো ইরানকেও পদানত করে দেবেন। একবারও ভেবে দেখার চেষ্টা করেননি ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং পালটা হামলার ক্ষমতা ও দক্ষতা ঠিক কতটা। এটাও বোঝার প্রয়োজন মনে করেননি ইরান আক্রান্ত হলে আহত বাঘের মতো ঠিক কি করতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার মতো একটি তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ অঞ্চল যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক তৃতীয়াংশের উৎস, সেখানে যুদ্ধের দামামা বাজলে এবং সেটা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তার পরিণাম যে বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ আকার নিতে পারে সেটাও আন্দাজ করার চেষ্টা করেননি ট্রাম্প। ইজরায়েলের চাপে হই হই করে নেমে পড়েছেন অ্যাডভেঞ্চারে। যুদ্ধের তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হবার পর ইরানের সাত হাজারের বেশি পরিকাঠামোয় হামলা চালিয়ে সীমাহীন ধ্বংসলীলা চালিয়ে ১৬৫ জন ছাত্রী সহ দেড় হাজারের বেশি মানুষ খুন করে আজ ট্রাম্প হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় আর যাই হোক বেঞ্জামিন নেতানেয়াহুর হাতের মোয়া নয়। এদিকে যুদ্ধের ঘনঘটায় আক্রমণ পালটা আক্রমণের পরিসর দ্রুত বাড়তে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে কুয়েত, বাহরিন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ওমান, জর্ডন থেকে শুরু ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন, সিরিয়া, সাইপ্রাস, তুরস্ক পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। হুহু করে বাড়তে থাকে অশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম। যুদ্ধ শুরুর আগে যে তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার সেটা সর্বশেষ বেড়ে হয়েছে ১১৮ ডলার। তেলের দাম বাড়ার ফলে শেয়ার বাজারে নামছে ধসের পর ধস। ভয়ে লগ্নিকারীরা শেয়ার বেচে টাকা তুলে নিচ্ছেন। অধিকাংশ দেশের মুদ্রার মূল্য বিরাট পতন হয়েছে।
এই অবস্থায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ ট্রাম্পের ওপর। মিত্র-শত্রু প্রায় সব দেশই কমবেশি আমেরিকার উপর বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। তারা মনে করছেন অকারণে জোর করে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ফল ভুগতে হচ্ছে সকলকে। এখানে মনে রাখা দরকার ইরান কিন্তু আগ বাড়িয়ে যুদ্ধে যায়নি। আমেরিকা-ইজরায়েলই আগে ইরানের উপর হামলা চালিয়েছে। পালটা হামলায় দু’দিন পরে নামে ইরান। ইজরায়েলের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় যেখানে যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে এবং যেসব ঘাঁটি থেকে আমেরিকা ইরানে হামলা চালাচ্ছে সেখানে আক্রমণ করছে ইরান। পরে সেটা সম্প্রসারিত হয়েছে তেল ও গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্রগুলিতে। ইরানের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্রে ইজরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরান যখন পর পর কাতার, সৌদি আরব, আর আমিরশাহী, ওপান ও ইজরায়েরেল তেল-গ্যাস ক্ষেত্রে পালটা হামলা চালায় তখন তেল ও গ্যাসের দাম ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেড়ে যাবার পর ট্রাম্প বুঝে যান এবার ব্যাপারটা বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে। তাই সুর নরম করে স্বীকার করেন ইজরায়েল গ্যাস প্রকল্পে তাঁকে না জানিয়ে হামলা করেছে। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন ইরানের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রে ইজরায়েল আর হামলা চালাবে না।
ট্রাম্প বুঝে গেছেন ইরান সহজে মাথা নত করবে না। তাই যুদ্ধ আশু শেষ হবার নয়। এই অবস্থায় যদি তেল-গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র যদি ধ্বংস হয়, হরমুজ দিয়ে যদি জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হয় তাহলে তেলের মূল্য কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানে না। এদিকে হরমুজে অবরোধ তুলতে ট্রাম্প সব মিত্র দেশ এবং চীনকে নৌবাহিনী পাঠানোর আবেদন করলেও কেউ সাড়া দেয়নি। সকলে বলেছে এই যুদ্ধ তাদের নয়। ইরান যুদ্ধে তাদের কোনও স্বার্থ নেই। ফলে যত দিন যাচ্ছে ট্রাম্প একা হয়ে যাচ্ছে। নিজের দেশেও এমনকি নিজের দলের মধ্যেও বিরোধিতা ক্রমশ বাড়ছে। যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মার্কিন নাগরিকদের ওপর। তাই সুর নরম করা ছাড়া ট্রাম্পের উপায় নেই। যুদ্ধ থেকে সরে আসারও উপায় নেই। দুনিয়া বলবে ট্রাম্প পরাজিত।

Comments :0

Login to leave a comment