কথায় বলে আকাশের দিকে মুখ করে থুতু ছুঁড়তে নেই, সেটা নিজের গায়েই নামে। কলকাতায় এসে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ সেই কাজটাই করে গিয়েছেন। ‘চার্জশিট’ নামে রাজ্য বিজেপি’র একটি পুস্তিকা তিনি প্রকাশ করেছেন, তাতে তৃণমূলের গত ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেছেন। সে পুস্তিকার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোলা বিভিন্ন অভিযোগ পুস্তিকা থেকে পড়েও শুনিয়েছেন। এখানেই গোল বেধেছে। কারণ তৃণমূলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, বিশেষত অপরাধ, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে বাংলার মানুষের সন্দেহ না থাকলেও এর পিছনে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি’র মদত নিয়েও সন্দেহ নেই। বাংলায় তৃণমূলের শাসনের পনেরো বছরের মধ্যে শেষ তেরো বছর কেন্দ্রে বিজেপি’র শাসনই চলেছে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তৃণমূলের কোনও অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বাংলার মানুষকে ন্যায়বিচার দেয়নি। অথচ নির্বাচন এলেই বাংলায় তৃণমূলকে শায়েস্তা করার মিথ্যা হুমকি দিয়ে গেছে। এই হুমকি ন্যায়বিচার দেওয়ার জন্য নয়, এই হুমকি রাজনৈতিক। বাংলার বুকে তৃণমূল এবং বিজেপি’র মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ করার স্বার্থে। একই কাজ তৃণমূলও করে চলেছে। তারাও বিজেপি’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এবং হুঁশিয়ারি দিলেও প্রকৃতপক্ষে বিজেপি’র বিরুদ্ধে যায় এমন কোনও কাজ করেনি। এই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নকল লড়াইতে মানুষকে দীর্ঘদিন ঠকিয়ে রাখা যায় না। বাংলার মানুষ বাংলাকে বাঁচাতে বিজেপি এবং তৃণমূলের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছেন।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ পুস্তিকায় অমিত শাহের দল পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পের শ্মশানে পরিণত করা ও সিঙ্গুরের দুর্দশার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করেছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির সিঙ্গুর আন্দোলনে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে শরিক ছিলেন বিজেপি’রই তৎকালীন সর্বভারতীয় সভাপতি রাজনাথ সিং। ২০১৬ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে ৩০০ জন বিজেপি কর্মী তৃণমূলের হিংসায় বলি হয়েছেন বলে অমিত শাহের দাবি। শাহ একথাও বলেছেন যে গত জানুয়ারি মাসে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও আক্রান্ত হয়েছিলেন। বাংলায় মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীকে লড়াকু ব্র্যান্ডের ছাপ লাগিয়ে প্রচার করার তাগিদ হয়তো অমিত শাহের রয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে তো শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি’র নেতা ছিলেন না, তিনি তো তখন তৃণমূলেরই হিংসাশ্রয়ী দুষ্কৃতীদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মমতা ব্যানার্জির ঝান্ডা ধরে। সেই অপরাধগুলিকে ভোলাবেন কী করে! পশ্চিমবঙ্গে একশো দিনের কাজ সহ নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকায় তৃণমূলের দুর্নীতির অভিযোগও করা হয়েছে বিজেপি’র প্রচার পুস্তিকায়। সিএজি রিপোর্ট থেকে বাংলায় দুর্নীতি ও আর্থিক তছরুপের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা নিয়ে দুর্নীতি তো বটেই, এমনকি আইনি পরিধির বাইরে একচিলতে ব্যবহার করা হলেও তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনি পদক্ষেপের অধিকার রয়েছে, নির্দিষ্টভাবে দায়ী প্রশাসনিক আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর করে শাস্তিদানের অধিকার আছে। কেন্দ্রীয় সরকার সে পথে না হেঁটে কেবল বাংলার গ্রামে একশো দিনের কাজের টাকা বন্ধ করেছে, আর ভোটের আগে দুর্নীতির হ্যাসট্যাগ লাগানো অভিযোগ প্রচারে নেমেছে। অমিত শাহের অভিযোগাবলীতে আর জি করের ঘটনাতেও তৃণমূল সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। এমন ভয়াবহ ঘটনার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ তো বটেই সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদ করেছেন, ন্যায়বিচারের দাবি করেছেন। অথচ অমিত শাহ নিয়ন্ত্রিত সিবিআই মমতা ব্যানার্জি নিয়ন্ত্রিত পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে তদন্ত করেছে এবং সেই অনুসারেই চার্জশিট জমা দিয়েছে। সিবিআই’র এই ভূমিকার বিরুদ্ধে স্বয়ং নির্যাতিতার মা বাবা সরব হয়েছিলেন, কিন্তু তখন অমিত শাহরা কেউ তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেও রাজি হননি। আর জি কর আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালীন শঙ্কিত মোহন ভাগবৎ তো মমতা ব্যানার্জির পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তৃণমূল যে দাগী তা প্রমাণে এখন আর বিজেপি’র অভিযোগের প্রয়োজন নেই, কারণ সেই একই কালিতে বিজেপি’র সর্বশরীর কালিমালিপ্ত হয়েই রয়েছে।
editorial
আকাশপানে শাহের থুতু
×
Comments :0