Editorial

বিভাজন প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ শ্রমজীবীদের

সম্পাদকীয় বিভাগ

পশ্চিমবঙ্গে রামনবমী পালনের চেহারা বদলেছে। হিন্দিভাষী প্রধান এলাকায় এই অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সংগঠকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন সেই অভিজ্ঞতা। রামনবমী ঘিরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির সংগঠিত প্রয়াস জানতে কিছু সমীক্ষাও হয়েছে। ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়া-জগদ্দল এলাকার দীর্ঘদিনের এক সংগঠক সমীক্ষকদের একটি অংশকে জানিয়েছেন যে এখন যা হয় তা রাজনৈতিক দলগুলির মিছিল। বলেছেন, ‘সেই উৎসাহ আর নেই, আছে তলোয়ার, বর্শা নিয়ে আস্ফালন।’
ধারাবাহিকভাবেই সমীক্ষা চলছে, তার বিবরণও বেশ খানিকটা সতর্ক করে দিচ্ছে।। অতীতে এসব এলাকায় হিন্দিভাষীদের পাশাপাশি ওড়িয়া, তেলুগুভাষী বাসিন্দারা যোগ দিতেন। যোগ দিতেন উর্দুভাষীরাও। তাছাড়া বাংলাভাষীরা তো থাকতেনই। ফারাক এই যে, তখন বিশাল সমারোহের উৎস ছিল বাড়ি বাড়ি থেকে তোলা চাঁদা। কোনও দাদা বা দিদির অনুগামীবৃন্দের ছড়িয়ে দেওয়া অর্থ নয়। ফারাক এ-ও যে ব্যানারে ছবিতে থাকত হিন্দু দেবদেবীর ছবি। রানা প্রতাপ, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ সাজতেন। এখন ছবিতে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের ছবি। ফারাক এমনও যে অন্য ধর্মকে আক্রমণ করে, নিন্দা করে নিজের ধর্মকে বড় করার প্রয়াস ছিল না। প্রবীণ এলাকাবাসীরা বলেছেন, সেসব প্রয়াস হলে তাঁরা তাড়া করে এমন লোকজনকে বের করে দিতেন। মুসলিমরাও থাকতেন। দাঁড়িয়ে দেখতেন শোভাযাত্রা। 
ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক চরিত্র দেওয়া এই রাজ্যে চলছে গত কয়েক বছর ধরে। বিজেপি এবং আরএসএস বিভিন্ন হিন্দু উৎসবকে ব্যবহার করছে অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যে ভয় ছড়ানোর জন্য। নিজের মন্দিরে আর ধর্মপালন সীমাবদ্ধ নেই। নিজের এলাকাতেও নয়। অন্য ধর্মীয় উপাসনাস্থলের সামনে উন্মত্ত ভিড়ের জমায়েত এবং তাণ্ডব চলছে সংগঠিত কায়দায়। তার সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্কও নেই। রয়েছে রাজনীতির সম্পর্ক। গোটা দেশে এই কৌশল বিভিন্ন সময়ে কাজে দিলেও বাংলায় তা প্রতিহত হতো। এখন হচ্ছে না। 
তৃণমূল কংগ্রেস রাজনৈতিক ফয়দা থেকেই পরিপূরক সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি চালাচ্ছে। ধর্মীয় উসকানি রুখতে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গলদ ধরা পড়ছে বারবার। যে ধর্মেরই হোক, অন্যকে আক্রমণ করলে বা সামাজিক শান্তি ব্যাহত করার মতো উসকানি তৈরি করেও রেহাই মিলছে অনায়াসে। প্রশাসনিক মঞ্চ থেকে কড়া ব্যবস্থা তো দূর, বরং সংহতির বার্তা নিয়ে নামতে চাইলে বাধা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়। ‘মোদীর রাম মন্দিরের’ বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মমতার জগন্নাথ মন্দির’! চলছে মজুরি এবং ফসলের দামে নিদারুণ বঞ্চনার অধর্মও।
বস্তুত কেন্দ্রে এবং রাজ্যে, দুই সরকারেরই বিরুদ্ধে জনতার জীবন-জীবিকা ঘিরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভিযোগ প্রবল। দুই সরকারই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে নারাজ। বরং প্রশ্ন করলে, প্রতিবাদ জানালে নানা উপায়ে হেনস্তায় চৌকস। শিক্ষা থেকে কাজ বা বাসস্থান- জনজীবনের প্রতিটি সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে জনতার বড় অংশকে মাতিয়ে রাখতে আয়োজনের ত্রুটি নেই।   
এবার রামনবমী ঈদের কয়েকদিন পরই। বিভেদ ছড়ানোর আশঙ্কা ছিল, কিছু জায়গায় সেই প্রয়াস দেখাও গিয়েছে। সিপিআই(এম) এবং বামফ্রন্ট সব অংশের কাছে আবেদন জানিয়েছে সতর্ক থাকার, সজাগ থাকার। এ রাজ্যে ২০ এপ্রিল ব্রিগেডে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন শ্রমজীবী, কৃষিজীবীরা। তার প্রস্তুতি চলছে পাড়ায় মহল্লায়। দেখা যাচ্ছে যে সম্প্রীতির পক্ষে রাজনৈতিক কর্মসূচি জীবিকার লড়াই ঘিরে ব্রিগেড সমাবেশের প্রচারের অংশ হয়ে গিয়েছে। অনুকম্পা নয়, অধিকার বুঝে নিতে মেহনতি মানুষ একজোট হয়ে লড়াইয়ে নেমেছে বিভাজনের রাজনীতিরও প্রতিরোধে। শ্রমজীবীিদের কাছে এটাও একটা চ্যালেঞ্জ।

Comments :0

Login to leave a comment