Editorial

চিনি: সরকারি অপদার্থতা

সম্পাদকীয় বিভাগ

ইথানলের জন্য চিনির দাম বাড়েনি বা চিনির পর্যাপ্ত মজুত ভাণ্ডার আছে অথবা খুব তাড়াতাড়ি চিনির দাম কমে যাবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আমলাদের মুখে এমন জ্ঞানগর্ভবাণি, যুক্তি বিন্যাস, ব্যাখ্যা ও আশ্বাসবাণী গত কয়েক দিন ধরে বিস্তর বিতরণ করেছেন এবং এখনও বিতরণ করে চলেছেন। চিনি, পেয়াজ সহ কার্যত সব নিত্য ব্যবহারের পণ্যের অনেকটা আচমকাই বিপুল হারে বেড়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ এসব কথা মোটেই শুনতে চাইছেন না। তাদের কাছে প্রধান প্রশ্ন এতটা দাম বাড়ল কেন? কাদের স্বার্থে সরকারি নজরদারি শিথিল হয়েছে? ঠিক কবে থেকে দাম আগের জায়গায় ফিরবে? এসব প্রশ্নের জবাব সচেতনভাবেই সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে নিজেদের অপদার্থতা এবং চিনির কল ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ আড়াল করতে। সর্বোপরি ইথানল ব্যবহার সংক্রান্ত অপরিনামদর্শী নীতি আড়াল করার জন্য।
সরকারের প্রথম অপদার্থতা আখ ও চিনি উৎপাদকদের সংগঠনের দেওয়া আখ উৎপাদন সংক্রান্ত অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যানে অন্ধ বিশ্বাস। তাতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার থেকে বিপুল উদ্বৃত্ত দেখানো হয়েছিল। অনিয়মিত বৃষ্টি, এল নিনোর প্রভাবে বাস্তবে কতটা চাষ হয়েছে এবং কতটা উৎপাদন হতে পারে তা সরকার যাচাই করে দেখেনি। তাই অবাস্তব পরিসংখ্যায় ভরসা করে মহানন্দে বিদেশি মুদ্রা আয়ের লক্ষ্যে ২০ লক্ষ টন চিনি রপ্তানির ছাড়পত্র দিয়েছে। পাশাপাশি পেট্রলে ১০ শতাংশের জায়গায় ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ৩৫ লক্ষ টন চিনি ইথানল উৎপাদনের জন্য সরিয়ে রাখে। ফলে যা হবার সেটাই হয়েছে।
যে পরিমাণ উৎপাদনের পূর্বাভাসের উপর অন্ধ বিশ্বাস রেখে সরকার এত পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বাস্তবে সেই উৎপাদন অনেকটাই কমে গেছে। এদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক চিনি বিদেশে রপ্তানি হয়ে গেছে। চিনির মরশুম শেষ হতে এখনও অনেকটা দেরি। তেমনি ইথানল উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ চিনিও চলে গেছে। মাঝখান থেকে দেশের বাজারে বিক্রির জন্য চিনির যোগানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সুযোগ বুঝে চিনি কল এবং চিনির পাইকারি ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম অভাব দেখিয়ে হুহু করে চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়ে মোটা টাকা কামানোর ব্যবস্থা করে ফেলেছে। এতকিছুর মধ্যে সরকার নাকে সরষের তেল দিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। চিনির ক্ষেত্রে দেশে কি কাণ্ড চলছে তার খবরও রাখেনি। যখন দেখে মাত্র ২০ দিনে খুচরো বাজারে চিনির কেজি প্রতি ২০ টাকা বেড়ে গেছে তখন তাদের টনক নড়ে। তড়িঘড়ি ঘোষণা করা হয় ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানি করতে। তারজন্য আমদানি শুল্ক পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়। কম দামে চিনি রপ্তানি করে এখন গাড্ডায় পড়ে বেশি দামে চিনি আমদানি করতে হচ্ছে। প্রসঙ্গত, ভারতের মতো চিনি উদ্বৃত্ত দেশ সরকারি অপদার্থতায় গত এক দশকে এই প্রথম চিনি আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment