অধ্যাপক ড. জগৎ পতি সরকার
ভারতের বুকে ভীমরাও রামজী আম্বেদকরের অবদান শুধু দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনাতেই নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি স্মরণীয়। তাঁর এরকমই একটি অবদান ছিল চৌদা লেক আন্দোলন। সময়কাল ছিল ১৯২৭ সাল। আমরা বি আর আম্বেদকরের কথা বারবার উল্লেখ করলেও তাঁর এই আন্দোলনের কথা প্রায় ভুলে গেছি। কিন্তু তিনি সেদিনের যে আন্দোলন এই ভারতের মাটিতে সংগঠিত করেছিলেন তা ছিল এককথায় সাম্প্রদায়িকতা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন আন্দোলন। একশো বছর পেরিয়ে গেলেও তার প্রাসঙ্গিকতা আজও প্রবল। আজও ভারতবর্ষের মাটিতে সমানে চলে সামাজিক সঙ্কীর্ণতা, ধর্মীয় কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা ধর্মীয় ভাবাবেগের নানান উন্মত্ত চেহারা। একশো বছর আগে এই অমসৃণ রুক্ষ ভূখণ্ডে কিন্তু আম্বেদকরই গড়ে তুলেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার সহনশীলতার এক অনবদ্য পরিচয়।
এ কথা আমরা সকলেই জানি যে আম্বেদকরের রাজনৈতিক জীবন শুরুই হয়েছিল সমাজের একেবারে অবহেলিত, দলিত শ্রেণির মানুষের জীবন সংগ্রামকে সাথে নিয়ে। তিনি নিজে ছিলেন সমাজের অন্ত্যজ মাহার সম্প্রদায়ের মানুষ। যে সম্প্রদায়টিও ছিল তৎকালীন সমাজের একটি নিম্নবর্গীয় সম্প্রদায়। তাঁর এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছিল অবহেলা আর অবজ্ঞার নিজস্ব অভিজ্ঞতা। তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন সেসব দিনের ঘটনা। ১৯১৭ সালে বরোদারাজের সামরিক বাহিনীতে তিনি নিজে তার শিকার হন। তিনি তখন ভাবতেন তার চিরন্তন নিরসনের কথা। দলিত মানুষের অধিকারকে ছিনিয়ে নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তিনি সেদিন থেকেই। শুধু তাই নয়, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকেও তিনি সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নিয়েছিলেন সেই সময় থেকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় চৌদা আন্দোলনটিই ছিল আম্বেদকরের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আন্দোলন। এই সময়কালের মধ্যেই আম্বেদকর মুম্বাই প্রেসিডেন্সির আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
উক্ত চৌদা লেক আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ঐ হ্রদটিকে সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা। সেই সময় পর্যন্ত উক্ত হ্রদটিকে ব্যবহার করতে পারত শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের মানুষেরা। তারা সেদিন সেখানে তাদের অধিকার কায়েম করেছিল একমাত্র তাদের ধর্ম এবং বর্ণের দোহাই দিয়ে। সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষেরাও যে মানুষ তা তারা মনেই করতো না। হ্রদ জলাশয় তো প্রকৃতির দান। এখানে তো কেউ জাতি, ধর্ম, বর্ণের শরিক হতে পারে না। ভাবিয়ে তুলল আম্বেদকরকে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি আঘাত হানলেন সমাজের এই বৈষম্য ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। রুখে দাঁড়ালেন তখনকার সমাজের শিরোমণিদের বিরুদ্ধে। অসাধারণ সাহস এবং এক সংগ্রামী চেতনাকে প্রত্যক্ষ করল ভারতের মানুষ। ১৯২৭ সালের ১৯ এবং ২০ মার্চ মাহাদে একটি প্রতিবাদ সভা সংগঠিত করলেন আম্বেদকার। সংগঠিত হলো একটি প্রতিবাদ মিছিল। সেদিনের সেই সভা এবং মিছিলের উপর অমানুষিক আঘাত হানলো তখনকার শাসক শ্রেণি। কিন্তু সেদিনের সেই আন্দোলন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর রূপ নিল। রূপ নিল এক বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের। তাই বলা যায় আম্বেদকর শুধুমাত্র ভারতের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, অসম অধিকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন তাই নয়, তিনি লড়াই করেছিলেন একটা গোটা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। সমাজের নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল এই চৌদা লেক মুক্তি আন্দোলন। আন্দোলনের ফলে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলো সকল মানুষের সমান অধিকার। আর রক্ষা পেল পরিবেশ। আজকের পরিবেশ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেও তাই এই আন্দোলনটি বলা যায় খুবই সদর্থক ভূমিকা পালন করেছিল সেদিন। ঠিক এইরকম আরও একটি হ্রদকে বাঁচানোর কথা আমরা পাই ইতিহাসের পাতায়। উল্লেখ আছে রুদ্রদমনের গিরনার শিলালিপিতে। সময়কাল ছিল খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী। সেই হ্রদটির নাম ছিল সুদর্শন হ্রদ। ভেঙে পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া হ্রদ পুনরুদ্ধারে প্রথম রুদ্রদমন একটি বড় সংস্কার কাজ হাতে নিয়েছিলেন যা রুদ্রদমনের শিলালিপিতে লিপিবদ্ধ আছে। আম্বেদকরও যেন তেমনই ঐতিহাসিক লড়াইতে নেমে হ্রদ পুনরুদ্ধার করে দলিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেমেছিলেন। সারা দেশের দলিত মানুষকে এই আন্দোলন উদ্বুদ্ধ করেছিল,নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে।
আম্বেদকরের এই চৌদা লেক আন্দোলনে সে যুগে প্রাণ দিয়েছিলেন পাঁচজন নিরীহ আন্দোলনকারী মানুষ। আম্বেদকর সেখানকার পুলিশ প্রশাসনকে এইরূপ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর নির্মম অত্যাচারের কথা জানিয়ে অভিযোগ পত্র জমা দিয়েছিলেন। ফল হয়নি। উপরন্তু যে পাঁচ জন নিরীহ মানুষকে তখনকার শাসক শ্রেণি জেলবন্দি করেছিলেন এবং তাদেরকে চরমতম শাস্তি এবং অমানুষিক অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। আম্বেদকর তবুও বিরত হননি। লড়াই চালিয়েছিলেন বহুকাল। তিন বছর ধরে আদালতে তার বিচার প্রক্রিয়া চলেছিল। শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেছিলেন তিনি। সমাজের অবহেলিত মানুষরা অচিরেই তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছিল। আম্বেদকরের সত্যনিষ্ঠ রাজনৈতিক শ্রেণি সংগ্রাম ভারতের মাটিতে সার্থকতা লাভ করেছিল।
ইতিহাসের পাতায় অনেক জায়গাতে এটিকে মাহাদ আন্দোলন নামেও ভূষিত করা হয়। কারণ স্থানটির নাম ছিল মাহাদ। চৌদার যে জলাশয়ের জল পান সেই সময়কালের সমাজে তথাকথিত নিচু জাতের মানুষের কাছে নিষিদ্ধ ছিল, সেই জলাশয়ের ওপরে সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আম্বেদকর। সোচ্চারে ঘোষণা করেছিলেন, জলের কোনো জাত নেই, জলের অধিকার সবার সমান। এটা মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। প্রশ্নটি আজও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলিত মানুষদের জলের মতো আবশ্যিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে রাখা হয়। কোথাও দলিতদের জল আনতে গ্রামের বাইরে বহুদূর যেতে হয়, কারণ গ্রামের কুয়ো অথবা পুকুর উচ্চবর্ণের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে। দলিত পরিবারের মহিলাদের বহু শারীরিক কৃচ্ছ্রসাধন করে দূর থেকে জল বয়ে আনতে হয়।
চৌদা লেক আন্দোলনের পরে ভারতবর্ষের মাটিতে সংগঠিত হয়েছে আরও অনেকগুলি আন্দোলন বিশেষত ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল সত্যাগ্রহ আন্দোলন, এবং সেগুলি সবই ছিল অমরাবতী, পুনে, বোম্বাই কিংবা নাসিক শহরের নানান হিন্দু মন্দিরে প্রবেশাধিকার প্রসঙ্গে। সেখানেও ছিল সমাজের শিরোমণিতন্ত্রের অসামান্য প্রভাব। সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষের অধিকার সেখানে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এগিয়ে এলেন আম্বেদকর। আঘাত হানলেন এই অসম প্রবেশ নীতির বিরুদ্ধে। লড়াই সংঘটিত করলেন তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সহযোগিতায়। তাদের জন্য পৃথক মন্দির স্থাপনের প্রস্তাবকে এককথায় উড়িয়ে দিলেন তিনি। তিনি বললেন, একই মন্দিরেই সমাজের সকল স্তরের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নানান সামাজিক দমন-পীড়ন অবহেলাকে সহ্য করেও সেই আন্দোলনে জয়লাভ করেছিলেন বি আর আম্বেদকর। এখানে লেনিনের কথা মনে পড়ে। তিনি একসময় বলেছিলেন, ‘দশক কেটে যায় যখন কিছুই ঘটে না কিন্তু একটা সপ্তাহ থাকে যখন গোটা দশকটা ঘটে যায়।’
তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষের অধিকার অস্বীকার করা মনুস্মৃতিকে মানতে অস্বীকার করেছিলেন আম্বেদকর, তিনি মনুস্মৃতি দহনের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন মনুস্মৃতি সামাজিক সমতার একেবারেই বিপরীতে। বরং সামাজিক বৈষম্যের জনক, উৎসাহ দাতা। মনুস্মৃতি দহন আসলে একটা প্রতিবাদ। বৈষম্যের বিরুদ্ধে, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে। যে মনুস্মৃতিকে ধারণ করে সে কিছুতেই অস্পৃশ্যের স্বার্থে ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে না। গান্ধীজী যেমন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসাবে বিদেশি বস্ত্র পোড়ানোর কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন মনুস্মৃতি দহনও ঐরকম একটি প্রতীকী কার্যক্রম ছিল। সমতার লক্ষ্যে, বর্ণ ব্যবস্থার অবসানের লক্ষ্যে। আম্বেদকরের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দেশের বর্তমান শাসকদের মনুস্মৃতিকে সংবিধানের চেয়ে প্রাধান্য দেওয়া, এটাই হলো দুই দৃষ্টভঙ্গির মধ্যে মূল আদর্শগত পার্থক্য। শাসকদের মনুস্মৃতির জন্য এতই অনুরাগ, যে মনুস্মৃতিতে উল্লিখিত জাতি-ভিত্তিক বৈষম্য এবং নারীর অধীনতা সম্পর্কিত ধারণাসমূহ তারা এখনও অনুসরণ করতে চায়। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আম্বেদকরের ধারণা এবং ভারতের সংবিধানের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও লিঙ্গ সমতার নীতিসমূহের সরাসরি বিরোধী। ভারতীয় সমাজের ইতিহাস বর্ণবিভাজনের দ্বারা আগাগোড়া প্রভাবিত। এই ইতিহাসকে গর্বের অতীত হিসাবে ব্যাখ্যা করতে শাসকরা বর্ণভেদ এবং বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে চায়। আম্বেদকর জীবনের শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। নিজের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে সামাজিক বৈষম্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আম্বেদকরের চিন্তাধারা বিকশিত হয়েছিল। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময়ও সেই বিকাশের পর্ব চলেছিল। ঐ সময়েই তিনি সারা বিশ্বের বিশেষ করে আধুনিক, বিকশিত ও কার্যকরী সাংবিধানিক গণতন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়ন করেন। বৈষম্য ও আধুনিকতা সম্পর্কে নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং দৃঢ় চেতনার সেই অনন্য সমন্বয়ই আম্বেদকরকে আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতিগোষ্ঠী হিসাবে সদ্য স্বাধীন ভারতের পথ চলার সংবিধান প্রণয়নে সাহায্য করেছিল।
আম্বেদকর আজীবন লড়াই করে গেছেন সমাজের অন্ত্যজ মানুষের জন্য। তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক, অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। যে লড়াই অবিরাম চলছে ভারতবর্ষের মাটিতে। তাই সবশেষে বলতে পারি ড. ভীমরাও রামজী আম্বেদকর শুধুমাত্র রাজনীতিক ছিলেন না, শুধুমাত্র ভারতের সংবিধান প্রণেতা ছিলেন না, শুধুমাত্র ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের অগ্রণী সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের পিছিয়ে পড়া, অনগ্রসর জাতির অবদমিত, নিষ্পেষিত সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অন্যতম সংগ্রামী চেতনার প্রতীক। ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সমাজের এই সমস্ত মানুষের ভূমিকাও যে অসামান্য একথা প্রথম স্বীকৃত হয়েছিল আম্বেদকরের অপরিসীম সংগ্রামের ফসল হিসাবেই। ভারতবর্ষের মানুষের সংগ্রামী ইতিহাসের এই অধ্যায়ে তাই তিনি আজও অনন্য। এ প্রসঙ্গে আরেকজন মানুষের কথা উল্লেখ করতেই হয় যিনি বি আর আম্বেদকরের সমসাময়িক যুগেই এরূপ সামাজিক অবহেলা এবং মানসিক অবদমনের শিকার হয়েছিলেন নানাভাবে। কারণ তাঁর অপরাধ ছিল তিনিও জন্মেছিলেন সমাজের এক অন্ত্যজ শ্রেণিতে। তিনি ছিলেন আমাদের দেশের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক মেঘনাদ সাহা। এরূপ আরও অনেক মানুষ নিপীড়িত হয়েছিলেন, আজও আমাদের দেশের দলিত, অসহায় অসংখ্য মানুষের অধিকার বিপন্ন। তাদের বাঁচার লড়াই দীর্ঘজীবি হোক। সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা লাভ করুক ভারতের মাটিতে।
Comments :0