DA protesters got bail

ধৃত ৪৭ জনেরই জামিন

কলকাতা

বৃহস্পতিবার সন্ধে ৭টা ১৫। ধৃত সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকরা আদালতের নির্দেশে জামিন পেয়ে একে একে বেরোতেই আরেক দফা তুমুল স্লোগান উঠলো ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে। আইনি লড়াইয়ে তাঁদের মুক্তির প্রতীক্ষায় দিনভর উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিলেন অসংখ্য সহকর্মী এবং সহযোদ্ধা। মুহূর্তে ছুটে গিয়ে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্তদের মালা পরিয়ে দেন তাঁরা। ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনকারীদের পক্ষেই গেল আদালতের রায়। অন্যায়ভাবে ধৃতদের সকলেই জামিন পেলেন এদিন। আরও একবার মুখ পুড়লো রাজ্য সরকারের।
রাজ্য সরকারের অনিচ্ছুক হাত থেকে হকের অধিকার আদায়ের শপথ ঘোষণা করে এদিন সন্ধ্যাতেই কোর্টপাড়া চত্বরে বিরাট বিজয় মিছিল করলেন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকারীরা। নবান্নের গোপন নির্দেশে যে পুলিশ বাহিনী বুধবার কর্মী-শিক্ষক আন্দোলনে হিংস্র বেপরোয়া হামলা চালিয়েছিল, বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করেছিল, এদিন সন্ধ্যায় তারাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই বিজয় মিছিল দেখতে বাধ্য হলো। 


‘‘আমরা তো ক্রিমিনাল নই। ন্যায্য বকেয়া ৩৫ শতাংশ ডিএ’র জন্য আন্দোলন করেছিলাম। চেয়েছিলাম স্বচ্ছতার সঙ্গে সমস্ত শূন্যপদ পূরণ এবং অস্থায়ী চুক্তিভুক্তদের স্থায়ী চাকরি। তাহলে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে সারা রাত লকআপে রাখা হলো কেন? কেনই বা আজ সারাদিন হয়রানি করা হলো?’’ বৃহস্পতিবার দিনভর ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষের মুখে প্রতিধ্বনিত হয়েছে এই প্রশ্ন। শুধু আদালত প্রাঙ্গণই নয়, রাজ্যের সব  সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজেও এদিন ধিক্কার ধ্বনিত হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পুলিশবাহিনীর ন্যক্কারজনক ভূমিকার বিরুদ্ধে। প্রতারিত চাকরিপ্রার্থীদের ওপর লাগাতার হামলার পরে এবার যেভাবে নির্দোষ সরকারি কর্মী ও শিক্ষকরা, এমনকি মহিলারাও পুলিশি বর্বরতার মুখে পড়লেন, তা মেনে নিতে পারছেন না কেউই। ধৃতদের মধ্যে হাইকোর্টের কর্মচারীরা থাকায় এদিন উচ্চ আদালতের বহু কাজকর্মও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। 
বুধবার বিধানসভা অভিযান চলাকালীন ১১ জন মহিলা সহ যে ৪৭ জন সরকারি কর্মী ও শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, এদিন তাঁদের একেবারে দাগী অপরাধীর মতো পুলিশ ভ্যানে চাপিয়ে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তোলে পুলিশ। পুলিশের এই ঘৃণ্য আচরণে আদালত চত্বরে অসন্তোষ দেখা যায়। এর মধ্যেই বিচারপতি সৌম্যক মুখার্জির এজলাসে মামলা উঠলে গ্রেপ্তার হওয়া কর্মচারীদের জামিনের আবেদন জানান তাঁদের আইনজীবীরা। সরকার পক্ষের আইনজীবী এই আবেদনের বিরোধিতা করে ধৃতদের পুলিশ হেপাজত চান। কিন্তু সরকারি কর্মী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কেন জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে পুলিশি হেপাজত চাওয়া হচ্ছে তার কোনও জোরালো যুক্তি ছিল না সরকার পক্ষের কাছে। ফলে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের যুক্তিনিষ্ঠ সওয়ালের পরে বিচারক ধৃত ৪৭ জনেরই জামিন মঞ্জুর করেন।


এদিকে, ডিএ’র দাবিতে আন্দোলনের ওপর পুলিশের হিংস্রতা ও যথেচ্ছ ধরপাকড়ের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারও পথে নামে রাজ্য সরকারি কোষাগার থেকে বেতনপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মচারী, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের যৌথ মঞ্চ। বুধবার রাতেই যৌথ মঞ্চ নেতৃত্ব ও কর্মীরা শপথ নেন, সহকর্মীরা মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এদিন বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরেও জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়। কো-অর্ডিনেশন কমিটির ডাকে সরকারি কর্মচারীরা কালো ব্যাজ পরে দুপুরে বিক্ষোভ দেখান। একইভাবে এবিটিএ, এবিপিটিএ’র ডাকে কালো ব্যাজ পরে শিক্ষক-শিক্ষিকারাও স্কুলে স্কুলে প্রতিবাদে শামিল হন। এই অন্যায় গ্রেপ্তারির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সহ অধ্যাপকরাও।
সহযোদ্ধাদের মুক্তির দাবিতে এদিন সকাল থেকেই দলে দলে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে পৌঁছে যান স্থায়ী-অস্থায়ী সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীরা। ছিলেন ধৃতদের পরিবারের সদস্যরাও। নির্ধারিত সময় বেলা সাড়ে বারোটা থেকেই আদালতের বাইরের রাস্তায় তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। আন্দোলনকারীদের হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড অথবা সাদা কাগজের কোনোটিতে লেখা ছিল, ‘ডিএ চোর সরকার আর নেই দরকার’। আবার কোনটিতে লেখা, ‘যতই চাটো হাওয়াই চটি, পুলিশ তোমারও ডিএ বাকি’। আদালত চত্বর ছাড়িয়ে চারপাশের বহু মানুষ দিনভর এই জোরালো বিক্ষোভ দেখতে থাকেন, তাঁদের সমর্থনও জানিয়ে যান।


সেই বিক্ষোভের মাঝেই বেলা দু’টো নাগাদ পরপর তিনটি পুলিশ ভ্যানে চাপিয়ে আদালতে নিয়ে আসা হয় ধৃতদের। পুলিশ ভ্যান থেকেই ধৃতরা চেঁচিয়ে জানাতে থাকেন পুলিশ লকআপে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কথা। তবে একইসঙ্গে তাঁদের অদম্য মনোভাবও স্পষ্ট হয়ে যায় এদিন। জানা যায়, ধৃতদের বিরুদ্ধে আইপিসি ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ১৮৮, ৩৩২, ৩৫৩, ৫০৬, ৫০৯, ২৮৩ ধারায় সাজানো মামলা দিয়েছে হেয়ার স্ট্রিট থানার পুলিশ। সমাজের অত্যন্ত দায়িত্বশীল অংশের প্রতিনিধি হলেও দৃশ্যতই অপরাধীদের মতো তাঁদের সোজা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় কোর্ট লকআপে। এরপর বেলা তিনটে নাগাদ এজলাসে শুরু হয় সওয়াল জবাব। 
আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এদিন তাঁর সওয়ালে বলেন, এই সম্মানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা, সরকারি কর্মচারী এবং অবসরপ্রাপ্তরা বুধবার ঠিক কতটা অন্যায় করেছেন তা বিস্তারিতভাবে বলুক সরকারপক্ষ। এঁরা কি কোন ভীষণ অপরাধমূলক কাজ করেছেন? ১৪৪ ধারা তো হামেশাই লঙ্ঘন হয়। তাই বলে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা কেন? এরপরেই ধৃতদের জামিনের আবেদন জানান তিনি। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ছাড়াও ধৃতদের পক্ষে আইনজীবী হিসাবে ছিলেন শামিম আহমেদ, মহম্মদ ইয়াসিন রহমান প্রমুখ। সওয়াল-জবাব শেষে বিচারপতি সৌম্যক মুখার্জি প্রথমে মামলার রায়দান স্থগিত রাখলেও পরে ব্যক্তিগত ৫০০ টাকার বন্ডে সকলের জামিন মঞ্জুর করেন। পরবর্তী শুনানি আগামী ১১ জানুয়ারি। কর্মচারী-শিক্ষক আন্দোলনের সমর্থনে এদিন উপস্থিত ছিলেন কলকাতা হাইকোর্ট এবং ব্যাঙ্কশাল কোর্টের গণতান্ত্রিক আইনজীবীরাও।


রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয়শঙ্কর সিংহ এদিন বলেন, জামিনে মুক্ত হয়েছেন কর্মচারী, শিক্ষকরা। আজকে আইনি লড়াইয়ে আমাদের জয় হয়েছে। সরকার যা খুশি করবে তা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যায্য সাংবিধানিক অধিকার মানতে আর কত সময় নেবে সরকার? ডিএ দিতেই হবে সরকারকে। ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমানো যাবে না।


 

0 Comments

Login to leave a comment