North Bengal Flood

দুর্যোগের এক বছর, জলঢাকার আতঙ্কে এখনও অন্ধকারে বহু পরিবার

জেলা

কৌশিক দাম: নাগরাকাটা

পুজোর মুখে চারদিকে যখন উৎসবের প্রস্তুতি। কোথাও আলোর সাজ, কোথাও আবার মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা। কিন্তু জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা-টন্ডু চা বাগানে বাসিন্দাদের এক বছর আগের ৫ অক্টোবরের স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জলঢাকা নদীর বাঁধ ভেঙে নেমে আসা জলের তোড়ে মুহূর্তে বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে গিয়েছিল। তিন শিশু সহ ১১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেতু ভেঙে নাগরাকাটার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এক বছর পরেও সেই শোক এখনও কাটেনি। তার সঙ্গে ফের দুর্যোগের আশঙ্কা যুক্ত হয়েছে।
গত বছরের ৪ অক্টোবর রাতের প্রবল বৃষ্টির পর ৫ অক্টোবর ভোরে জলঢাকার জল ঢুকে বামনডাঙ্গা-টন্ডু এলাকায়। মডেল ভিলেজ-সহ বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হয়। টন্ডু ডিভিশনেও গাঠিয়া নদীর জলে বহু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিপর্যয়ের এক বছর পর স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা এখনও নিশ্চিত হয়নি।
মডেল ভিলেজের আকাশ নায়েকের কাছে ৫ অক্টোবর শুধুই একটি তারিখ নয়। ওই দিন স্ত্রী মঞ্জু, পাঁচ বছরের মেয়ে নিবৃত্তি এবং আড়াই বছরের ছেলে নিবাংশ-কে হারিয়েছেন। আকাশ বলেন, ‘‘কাজের মধ্যে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের মুখ সবসময় চোখের সামনে ভাসে। রাতে ঘুম আসে না।’’
আরেক চা বাগানের বাসিন্দা প্রকাশ মুণ্ডা মাত্র দু’মাসের শিশুকে জলের তোড়ে হারিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমার স্ত্রী এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। আবার যদি সেই ধরনের দুর্যোগ আসে, সেই ভয়েই থাকি।’’
দুর্যোগের স্মৃতি শুধু স্বজনহারা পরিবার গুলির মধ্যেই আটকে নেই। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যেও স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রুজিরুটির তাগিদে অনেককে অন্য চা বাগানে কাজে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আকাশ কালো হলেই ফিরে আসে এক বছর আগের সেই ভয়। সম্প্রতি কুর্তি চা বাগানে কাজের সময় বৃষ্টি শুরু হওয়ায় কয়েকজন শ্রমিক কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। চা শ্রমিক সুনীতা গোপ বলেন, ‘‘ছোট বাচ্চাদের বাড়িতে রেখে কাজে যাই। বৃষ্টি বা মেঘের গর্জন শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে।’’
বামনডাঙ্গার কৃষ্ণা ওঁরাও জানান, এক বছর পরেও এলাকার শিশুরা মাঝে মধ্যে সেই দিনের কথা মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। স্থানীয় নীলিমা ওঁরাওয়ের কথায়, ‘‘উৎসব আসছে, কিন্তু আমরা আগের জীবনে ফিরতে পারিনি।’’
বামপন্থী শ্রমিক নেতা সিকান্দার মাঝির অভিযোগ, ‘‘এত বড় বিপর্যয়ের পরও জলঢাকার ভাঙা বাঁধ স্থায়ী ভাবে মেরামত হয়নি। মেঘ দেখলেই শ্রমিকদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হয়।’’
ফলে এক বছর পরেও বামনডাঙ্গা-টন্ডুর সামনে একই প্রশ্ন—ক্ষতিপূরণ ও প্রতিশ্রুতির বাইরে দুর্যোগ ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা কবে? উৎসবের আলো ফিরলেও জলঢাকার আতঙ্কে এখনও অন্ধকারে বহু পরিবার।

Comments :0

Login to leave a comment