‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের বুলডোজার গুঁড়িয়ে দিল যাদবপুর স্টেশন লাগোয়া গরিবের মাথা গোঁজার ঠাঁই, দোকান, হকারদের গুমটি। তবে তার আগে রবিবার রাতভর সিপিআই(এম) কর্মী সমর্থকদের প্রবল বাধার মুখে পড়তে হয়েছে পুলিশ, আরপিএফ-কে। তাদের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছেন প্রাক্তন সাংসদ সুজন চক্রবর্তী, নাট্য পরিচালক জয়রাজ ভট্টাচার্য সহ প্রতিরোধকারীদের অনেকে। গরিবের রুটিরুজি, বাসস্থান রক্ষায় রুখে দাঁড়ানোয় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫ জন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম এসএফআই’র সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। সোমবার আদালত ধৃতদের জামিন দিয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার রাজ্যের অনেক জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল, সভা হয়েছে।
রবিবার রাতকে বুলডোজার-অভিযানের জন্য রেল এবং রাজ্য সরকারের বেছে নেওয়ার পিছনে আছে ন্যক্কারজনক চালাকি। গত মঙ্গলবার যাদবপুরে এই উচ্ছেদ-হামলার জন্য বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়েছিল আরপিএফ, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ। সেদিনও বামপন্থীরা এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ তুমুল বিরোধিতা করেন। রেল কর্তৃপক্ষ গত মঙ্গলবার উচ্ছেদ করতে এলে প্রতিরোধকারীরা আইনি নথি দেখিয়ে বলেছিলেন যে, যাদবপুর স্টেশন চত্বরে কমার্শিয়াল প্লট না দিয়ে, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা যাবে না। ১৯৮৮ সালে কলকাতা হাইকোর্টের এই মর্মে রায় আছে। ৮ জুন, সোমবার আদালত খুলবে। সেই রায়ের সার্টিফায়েড কপি আদালতে জমা দেওয়া হবে সেদিন, তাও গত মঙ্গলবার সৃজন ভট্টাচার্যরা রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। সেদিন আদালতের কপি দেখে রেলের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, আপাতত সপ্তাহ তিনেক এখানে কোনও উচ্ছেদ হবে না। কিন্তু সোমবার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি রেল কর্তৃপক্ষ। রাজ্য সরকারের সহায়তা নিয়ে এবিষয়ে রবিবার রাতে গরিব মানুষের রোজগার, মাথা গোঁজার ঠাঁই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
রবিবার রাত সাড়ে ৮ টা নাগাদ বুলডোজার নিয়ে যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হাজির হয় রেল কর্তৃপক্ষ, আরপিএফ, রাজ্য পুলিশ। খবর ছিল প্রতিরোধকারীদের কাছে। তাঁরা হাজারো সংখ্যায় উপস্থিত ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় মানুষ। ছিলেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশন, কংগ্রেসের কর্মীরাও। এলাকা থেকে বেরোনোর প্রতিটি পথ ঘিরে ফেলেছিল পুলিশ। যে জায়গা ভাঙা হবে, সেই এলাকাও ঘিরে ফেলেছিল ব্যারিকেডে। কিন্তু সিপিআই(এম) নেতা, কর্মী, সমর্থকরা কোনও বাধাই মানেননি। বুলডোজারের সামনে গিয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে পড়েন। চলে লাগাতার স্লোগান। রাত বারোটা নাগাদ শুরু হয় লাঠিচার্জ। বেপরোয়া লাঠি চালায় পুলিশ। সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তীর উপর চলে লাঠি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আক্রান্ত হন। জয়রাজ ভট্টাচার্য, ঋতব্রত ঘোষ সহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাঁদের মাথা লক্ষ্য করে লাঠি চালায় পুলিশ। এভাবেই নিরস্ত্র মানুষের প্রতিরোধকে রক্তাক্ত করে গরিবের আশ্রয়, রুটি-রুজির গুমটিগুলি চুরমার করে কেন্দ্র-রাজ্যের পুলিশ বাহিনী।
ঘটনাস্থলে গ্রেপ্তার হন সৃজন ভট্টাচার্য, সুদাম বৈরাগী, তীর্থঙ্কর সেনগুপ্ত, বিশ্বজিৎ দাস এবং পার্থ শীল। রক্তাক্ত হয়েছেন ১৬ জনের বেশি। সুজন চক্রবর্তী সহ আহতদের কেপিসি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। ঋতব্রত ঘোষের মাথায় ১২টি সেলাই করতে হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
সংবিধান ও কোর্ট নির্দেশিত আদেশনামার প্রতিলিপি হাতে নিয়ে প্রিজন ভ্যানে বসে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আমরা আছি। লড়ছি। বেআইনি কাজ করছে রেল। আদালত ও আইনকে উপেক্ষা করে উচ্ছেদ করতে এসেছে। এনিয়ে রাস্তায় এবং কোর্টে আমাদের আইনি লড়াই চলবে।’’ সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘গরিব মানুষ হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করবেন, সেটাও এরা করতে দেবে না। কর্পোরেট, পুঁজিপতিদের স্বার্থে দেশের সমস্ত কিছু তুলে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনধারণের অধিকারকে এভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে তছনছ করা যায় না। স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী কায়দায় মানুষের জীবন-জীবিকার উপর এই আক্রমণের বিরুদ্ধে আরও জোরালো প্রতিবাদ বিক্ষোভ হবে। লড়াই এই রাতে শেষ হয়নি।’’ পার্টিনেতা সুদীপ সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘আদানি, আম্বানি থেকে বড় বড় পুঁজিপতি, শিল্পগোষ্ঠীর হাতে দেশের ৭০ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র থেকে জল জমি খনি সহ প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মানুষের বুকের উপর বুলডোজার চালানো হচ্ছে। চাকরি নেই। বহু মানুষের বাসস্থান নেই। মানুষের জীবন-জীবিকার দায়িত্ব নেওয়া তো দূর, উপরন্তু রুজি-রুটির বন্দোবস্ত কেড়ে, পেটে লাথি মেরে পথে বসানো হচ্ছে। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আরও জোরালো লড়াই চলবে।’’
রবিবার রাত থেকেই গরিব হকারদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এবং সৃজন ভট্টাচার্য সহ ধৃতদের মুক্তির দাবিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে প্রতিবাদী ধরনা অবস্থান শুরু করেন এসএফআই কর্মীরা। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি কর্মচারী সংসদের পক্ষ থেকে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। সন্তোষপুর মিনিবাসস্ট্যান্ড থেকে পালবাজার এবং যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন ৯ বি বাসস্ট্যান্ড থেকে রামগড় পর্যন্ত প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিল করে বামপন্থী দলগুলি।
Hawker Eviction Jadavpur
প্রতিবাদ-মুখর রাজ্য,‘এক রাতে লড়াই শেষ হয়নি’, বামপন্থীদের রক্ত ঝরিয়ে ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর বুলডোজার ভাঙল গরিবের ঘর, দোকান
×
Comments :0