বইকথা | নবজাগরণের যাত্রী রাজা রামমোহন রায়
সৌম্যদীপ জানা
নতুনপাতা | বর্ষ ৪ | ২৫ মে ২০২৬ | রাজা রামমোহন রায় ২৫৪
বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে যাঁদের ছাড়া আধুনিক ভারতের আত্মপরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রাজা রামমোহন রায় সেই বিরল মানুষদের অন্যতম, যিনি কেবল একজন সমাজসংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অদম্য পথিক, জ্ঞানসন্ধানী, যুক্তিবাদী এবং সভ্যতার এক সেতুবন্ধনকারী মানুষ। ২০২৬ সালে তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল সতীদাহ প্রথা রদ, নারীশিক্ষা বা ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠার কথা স্মরণ করা নয়; বরং স্মরণ করা সেই মানুষটিকে, যিনি নিজের জীবনকে এক দীর্ঘ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সমাজের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
রামমোহনের জীবনকে যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়, তবে দেখা যাবে তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সংস্কারচেতনার পেছনে ভ্রমণের একটি বিশাল ভূমিকা ছিল। বাংলার এক গ্রাম থেকে শুরু করে পাটনা, কাশী, তিব্বত, মুর্শিদাবাদ, রংপুর, কলকাতা এবং শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল — তাঁর জীবনের প্রতিটি সফর যেন ছিল নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সন্ধানে একেকটি অধ্যায়। তিনি কেবল ভ্রমণ করেননি, তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি ও মানুষের বাস্তব জীবনকে। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে পরিণত করেছিল ভারতের প্রথম আধুনিক মনীষীদের একজন হিসেবে।
১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রামমোহন রায়। তাঁর পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার মধ্যে আবদ্ধ। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত নানা বিষয় নিয়ে। সেই সময় বাংলার সমাজ ছিল কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামাজিক বৈষম্যে পূর্ণ। খুব অল্প বয়সেই তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল বই পড়ে নয়, সমাজকে বুঝতে হলে মানুষের মধ্যে যেতে হবে, পৃথিবীকে দেখতে হবে। এই উপলব্ধিই তাঁকে ভ্রমণের দিকে আকৃষ্ট করেছিল।
কৈশোরে তিনি পাটনায় যান আরবি ও ফারসি ভাষা শেখার জন্য। সেই সময় পাটনা ছিল ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে তিনি কোরআন, সুফি দর্শন, ইসলামি যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বীজ বপন করে। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা নয়, বরং মানবকল্যাণ। পরবর্তীকালে তাঁর ধর্মীয় চিন্তাভাবনায় এই অভিজ্ঞতার গভীর প্রভাব পড়ে।
পাটনার পর তিনি কাশীতে যান সংস্কৃত ও হিন্দু শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য। কাশী তখন ছিল হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। সেখানে তিনি বেদ, উপনিষদ, মীমাংসা ও বেদান্ত দর্শন নিয়ে গভীর অধ্যয়ন করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি দেখলেন ধর্মের নামে বহু কুসংস্কার ও অন্ধ আচার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে প্রশ্ন তোলার সাহস তৈরি করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ঈশ্বরের ধারণা হওয়া উচিত যুক্তিনির্ভর ও মানবিক।
রামমোহনের জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় ও আলোচিত ভ্রমণগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর তিব্বত যাত্রা। ইতিহাসবিদদের মতে, তরুণ বয়সে তিনি তিব্বতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে বৌদ্ধ ধর্ম ও লামাবাদ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। যদিও এই সফরের বহু তথ্য আজও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবু এটি নিশ্চিত যে এই ভ্রমণ তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথাকে কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন যে অন্ধ বিশ্বাস মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে। তিব্বত সফরের পর থেকেই তাঁর যুক্তিবাদী মনোভাব আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এরপর জীবিকার প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন সময় বাংলার নানা অঞ্চলে কাজ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কাজ করার সময় তিনি রংপুর, মুর্শিদাবাদসহ বহু জায়গায় ভ্রমণ করেন। এই সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন কৃষকদের দুর্দশা, জমিদারি শোষণ এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নির্মম বাস্তবতা। সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় গভীরতর হয়। সমাজসংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তিনি কেবল তাত্ত্বিকভাবে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছিলেন।
কলকাতায় এসে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের কলকাতা ছিল একদিকে ব্রিটিশ শাসনের প্রশাসনিক কেন্দ্র, অন্যদিকে নবজাগরণের সূতিকাগার। এখানেই তিনি ইউরোপীয় দর্শন, বিজ্ঞান ও আধুনিক চিন্তার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। তিনি ইংরেজি ভাষা শেখেন এবং পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক চিন্তাধারাকে ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। কলকাতায় তাঁর বাড়ি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও সংস্কারচিন্তার কেন্দ্র।
এই সময়েই তিনি শুরু করেন সংবাদপত্র প্রকাশ। ‘সম্বাদ কৌমুদী’ এবং ‘মিরাত-উল-আখবার’-এর মাধ্যমে তিনি সমাজসংস্কার, নারীশিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় উদারতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার পেছনে ছিল দীর্ঘ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। কারণ তিনি জানতেন, একটি সমাজকে বদলাতে গেলে পৃথিবীর অন্যান্য সমাজের অভিজ্ঞতাকেও বুঝতে হয়।
রামমোহনের জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ভ্রমণ নিঃসন্দেহে তাঁর ইংল্যান্ড যাত্রা। ১৮৩০ সালে তিনি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহের দূত হিসেবে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেই সময় কোনো ভারতীয় শিক্ষিত ব্যক্তির ইউরোপ যাত্রা ছিল অত্যন্ত বিরল এবং সামাজিকভাবে বিতর্কিত। বহু রক্ষণশীল মানুষ মনে করত সমুদ্রযাত্রা ধর্মবিরুদ্ধ। কিন্তু রামমোহন এসব কুসংস্কারকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। তাঁর কাছে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার চেয়ে বড় কোনো সামাজিক বাধা ছিল না।
কলকাতা থেকে জাহাজে চেপে তিনি দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে ইংল্যান্ডে পৌঁছান। সেই সময়ের সমুদ্রযাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও দীর্ঘ। মাসের পর মাস জাহাজে কাটাতে হতো। ঝড়, অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তা ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু রামমোহনের মনে ছিল এক গভীর আত্মবিশ্বাস। তিনি জানতেন, এই যাত্রা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সফর নয়; এটি ছিল ভারতীয় নবজাগরণের এক প্রতীকী পদক্ষেপ।
ইংল্যান্ডে পৌঁছে তিনি লন্ডন, ব্রাইটন ও ব্রিস্টলসহ নানা জায়গায় যান। ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও দার্শনিকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয়দের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি পাশ্চাত্যের মানুষদের কাছে ভারতীয় দর্শন ও উপনিষদের উদার চিন্তাকে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন ইউরোপীয় আধুনিকতার শক্তি ও সীমাবদ্ধতা।
ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি বহু সভা ও আলোচনায় অংশ নেন। তাঁকে ঘিরে ইউরোপীয় সমাজে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কারণ সেই সময় অধিকাংশ ইউরোপীয় ভারতকে কেবল একটি উপনিবেশ হিসেবেই চিনত। কিন্তু রামমোহন তাঁদের সামনে এমন এক ভারতের পরিচয় তুলে ধরেন, যে ভারত জ্ঞান, দর্শন ও মানবিকতার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। তাঁর ব্যক্তিত্ব, ভাষাজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মনোভাব ইংরেজ সমাজকে মুগ্ধ করেছিল।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই ভ্রমণই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা। ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেখানে আজও তাঁর সমাধি ভারতীয় নবজাগরণের এক নীরব স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর বিদেশের মাটিতে তাঁর মৃত্যু যেন এক গভীর প্রতীক — তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের দেশকে ভালোবেসে বিশ্বমানবতার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
রামমোহনের ভ্রমণকে যদি কেবল স্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়, তবে তাঁর জীবনের আসল তাৎপর্য ধরা যাবে না। তাঁর প্রতিটি সফর ছিল মানসিক ও বৌদ্ধিক অভিযাত্রা। পাটনায় তিনি শিখেছিলেন ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, কাশীতে অর্জন করেছিলেন শাস্ত্রজ্ঞানের গভীরতা, তিব্বতে দেখেছিলেন ভিন্ন সংস্কৃতির জগৎ, বাংলার গ্রামাঞ্চলে উপলব্ধি করেছিলেন সাধারণ মানুষের বেদনা, আর ইংল্যান্ডে গিয়ে বুঝেছিলেন আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার বাস্তবতা। এই সমস্ত অভিজ্ঞতা মিলেই গড়ে উঠেছিল তাঁর বিশ্বমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে রামমোহন রায়কে নতুনভাবে স্মরণ করার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সংকীর্ণতা ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজকে বারবার অস্থির করে তুলছে। রামমোহন আমাদের শিখিয়েছিলেন যে জ্ঞান কখনও সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের উচিত ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও চিন্তাকে জানার চেষ্টা করা। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিক্ষা কেবল বিদ্যালয়ের বই থেকে আসে না; আসে মানুষের সঙ্গে মিশে, পৃথিবীকে দেখে, প্রশ্ন করতে শিখে।
রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এক চলমান আলোকবর্তিকা। তাঁর ভ্রমণ ছিল কেবল এক ব্যক্তি মানুষের সফর নয়; ছিল ভারতীয় সমাজের অন্ধকার থেকে আধুনিকতার দিকে যাত্রা। ২০২৬ সালে তাঁর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায় — তিনি আজও আমাদের পথ দেখান। রাধানগর থেকে ব্রিস্টল পর্যন্ত তাঁর পদচিহ্ন কেবল ইতিহাসের স্মৃতি নয়, তা আজও ভারতীয় মননের জাগরণের এক চিরন্তন প্রতীক।
Comments :0