post editorial

‘ডবল ইঞ্জিনে’ পৌষ মাস— হকারের সর্বনাশ

সম্পাদকীয় বিভাগ

পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
সালটা ২০২০। কোভিডের আগে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরে আমেদাবাদের ‘সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল’ বিমানবন্দর থেকে ‘মোতেরা’ স্টেডিয়াম পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তার দু’পাশে বস্তির দৃশ্য লুকিয়ে রাখতে রাস্তার দু’ধারে লম্বা উঁচু পাঁচিল তুলে দিয়েছিল গুজরাটের প্রশাসন। ভাবখানা ছিল বিদেশি অতিথির  যাত্রাপথে বস্তি ঢেকে রাখতে পারলে যেন দেশের দারিদ্র ঢাকা পড়ে যাবে। আজ ঠিক একই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটছে রাজ্যের রেলস্টেশনগুলিতে হকার উচ্ছেদ অভিযান ঘিরেও। শহরকে স্মার্ট করে তুলতে নাকি রেলস্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড সর্বত্র হকার মুক্ত করতে হবে। এই ধারণায় মশগুল হয়েই ছুটছে গেরুয়া শাসকের দল এদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে সিন্দুকে তুলে রেখে। কিন্তু স্মার্ট শহর গড়ে তুলতে গেলে প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন আয়ের মানুষের একই শহরে সহাবস্থানের পরিকল্পনা প্রযুক্তি নির্ভর উপায়ে। শহর থেকে গরিব খেদিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব।  
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাজ্যে ভোট প্রচারে এসে এক হকারের দোকান থেকে দশ টাকার ঝালমুড়ি খেয়েই প্রচারে বাজিমাত করেছিলেন। গত দশবছরে এদেশের সংঘটিত কাজের সঙ্কটের বাজারে প্রধানমন্ত্রী থেকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রত্যেকেই এক নিঃশ্বাসে বিকল্প জীবন-জীবিকা বোঝাতে পকোড়া থেকে শুরু করে চপ-তেলেভাজার যে উদাহরণ দিয়েছেন সে সবই হকারের পেশায়। ফলে পেশা হিসাবে হকারি অবৈধ নয়। বরং হকারি এদেশে দশকের পর দশক ধরে চলে এসেছে সমাজসিদ্ধ হয়ে যেটা স্বাধীন ভারতে ২০১৪ সালে আইনসিদ্ধ ঘোষিত হয়। ফলে হকার মানেই অবৈধ দখলদার কিংবা ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ অনুপ্রবেশকারী এমনটা নয়। অথচ এই হকার উচ্ছেদ নিয়েই এখন সরগরম রাজ্যের রাজনীতি। ইতিমধ্যে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী রাজ্যের গেরুয়া শাসক উচ্ছেদের উৎসবে নেমেছে অবৈধ হকার তোলার নামে।  
রাজ্যে ভোটের আগে গেরুয়া নেতাদের প্রচারের ‘ক্যাচলাইন’ ছিল ‘ভয় আউট ভরসা ইন’। আর ভোট শেষেই উলট পুরান। সন্দেহ নেই যে ঘাসফুলের দুঃশাসনের ভয় থেকে রেহাই পেতে রাজ্যের বহু মানুষ পদ্মফুলকে ভরসা করে ক্ষমতায় এনেছে। কারণ রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ধাক্কায় আইনের শাসন উঠে গিয়ে শাসকের আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, জনজীবনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয় নেমে এসেছিল। কিন্তু আজ সরকার পরিবর্তনের পর বুলডোজার রাজের আবহে আবার সেই ভয় নতুন করে ফিরে এলে প্রশ্ন ওঠে ঐ পরিবর্তনের গুণগত চরিত্র নিয়েই। কারণ সরকারের প্রথম ইনিংসের স্লগ ওভারেই রাজ্য জুড়ে বুলডোজার নিয়ে শুরু হয়েছে হকার উচ্ছেদ অভিযান। প্রতিদিন নিয়ম করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের রেলস্টেশনে রাজ্য ও রেল পুলিশের ডবল ইঞ্জিন আক্রমণে ভেঙে পড়ছে সমাজের প্রান্তিক ঐ শ্রমজীবী মানুষ, হকারদের আস্তানা। ফলে রাজ্যজুড়ে এমন অসহায় মানুষদের মধ্যে সংক্রামিত হচ্ছে ভয়ের বাতাবরণ, জীবন-জীবিকা হারানোর ভয় রাজরোষের কোপে।
গত পনেরো বছরে ভয়াবহ দুর্নীতিতে আক্রান্ত এই রাজ্যের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। মানব সম্পদ উন্নয়ন সুচকের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ এখন দেশের ২৭তম রাজ্য। ফলে এহেন রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার স্বাভাবিক অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হওয়া উচিত ছিল নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। কিন্তু হলো উল্টোটা। সিঙ্গুর অধ্যায়ের পর রাজ্যের শিল্পের যে খরা সৃষ্টি হয়েছিল তা আজও বহমান। ফলে হাল আমলের শিল্প পরিষেবা ভিত্তিক কাজের বাজারে শোচনীয় হাল হয়েছে অকৃষিক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষজনের। এই প্রেক্ষিতে সরকারি অনুদানের বাইরে দু’বেলা আত্মসম্মান নিয়ে সৎভাবে বাঁচার অন্যতম পেশা হয়ে উঠেছে ছোট খুচরো ব্যবসা। আর সেই খুচরো ব্যবসায়ীদের একাংশ রেলস্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড কিংবা পর্যটন ক্ষেত্র থেকে হাটে-বাজারে পণ্যের পশরা সাজিয়ে বিকল্প জীবিকার পথ ধরেছে হকার হয়ে। ফলে সরকারি অদক্ষতা এবং অপরিকল্পনায় রাজ্যে উন্নয়নের  তালাবন্ধ পথে অসংগঠিত ক্ষেত্রের খেটে খাওয়া মানুষেরা তাদের সততা, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই এই হকারির পেশায় পথে নেমেছেন। অথচ আজ রাতারাতি সরকারে রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যের নতুন শাসক অতীতের সরকারি  যাবতীয় ব্যর্থতার দায় ঝাড়তে তৎপর হয়েছে ঐ হকার উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে! তাই এই আর্থ-সামাজিক সঙ্কটের নিরিখে এমন বেহিসেবি, অবৈধ এবং অনৈতিক উচ্ছেদ অভিযান সামাজিক ন্যায় এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী। আজ শাসকের হকার উচ্ছেদের যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই অথচ কিল মারার গোঁসাই’! মনে রাখতে হবে যে রাজ্যে লক্ষ-লক্ষ এই হকারেরা এদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নয় বরং তারা এদেশের নাগরিক, যাঁদের ভোটেই রাজ্যে এই সরকার তৈরি হয়েছে।  
এদেশে হকারদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের আমলে পাশ করা প্রথম ‘Street Vending Act-2014’আইন  লাগু হয়েছে মোদী সাহেবের প্রথম ইনিংস থেকেই। সেই আইন বলে রাজপথের হকারদের শ্রেণিবিন্যাসের সমীক্ষা থেকে, শহরের কোনও কোনও স্থানে, কত সংখ্যায় হকারেরা, কি কি ধরনের পণ্য কেনাবেচা করবে কিংবা কোন কোন অঞ্চলে কেনাবেচায় নিষেধ সেসব চূড়ান্ত করার কথা স্থানীয় পৌরসভার vendingকমিটি  কিংবা রাজ্য প্রশাসনের। কিন্তু এক যুগ আগে পাশ করা সেই আইন বাস্তবায়িত না হওয়ায় অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে হকারের দায়িত্ব এবং অধিকার। সেই আইনে উল্লেখ রয়েছে শহরের কোন অংশে হকারদের উচ্ছেদ করতে  হলে তাদের বিকল্প পুনর্বাসন ব্যবস্থা করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। অথচ সে সবের কোনও তোয়াক্কা না করেই নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে হকার উচ্ছেদের পথে নেমেছে, শহর সাফাই অভিযানে। ফলে কেন্দ্রের আইনে হকারদের জীবন জীবন-জীবিকার সুরক্ষার মূল ভাবনাটাই আজ আক্রান্ত হচ্ছে রাজ্যে ‘ডবল-ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই। ফলে দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও চালু হতে চলেছে রাজ্যে নতুন শাসকের একুশে আইন। 
সম্প্রতি রাজ্য সফরে এসে কেন্দ্রের রেল মন্ত্রী রাজ্যের শতাধিক রেলস্টেশনে ‘অমৃত ভারত প্রকল্পের’ কাজ শুরু করার ঘোষণা করেছেন। মন্ত্রী মশাইয়ের সেই ঘোষণা  থেকেই স্পষ্ট যে ‘পিপিপি’ বাণিজ্যিক মডেলে রেলস্টেশন জুড়ে রেলের জমি ব্যবসায়িক কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রূপায়ণ করতেই ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার রাজ্যের বড় জনবহুল স্টেশনগুলিকে হকারমুক্ত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ফলে এমন উচ্ছেদে কর্পোরেট গোষ্ঠীর পৌষ মাস হলেও হকারের সর্বনাশ হয়ে চলেছে। আজ নগরায়নের যুগে বাড়তি জনসমাগমের কারণেই হকারদের পণ্য-পরিষেবা  বেচাকেনার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে রেলস্টেশন কিংবা বাসস্ট্যান্ড। এদেশের মেগাসিটিতে বাস করা মানুষজনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নিম্নবিত্ত, যাদের জীবনের  প্রাত্যহিক বেচাকেনার সাথে জড়িয়ে রয়েছে হকারের দোকান। যেমন যাদবপুরের সন্ধ্যাবাজারের মতো বাজারে পণ্যের দাম কলকাতা শহরের যেকোনও কর্পোরেশন  বাজারের সবজি অথবা মাছের দামের চেয়ে অন্তত ৩০-৩৫ শতাংশ কম। কারণ হকারের অর্থনীতিতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা এবং লাভের লক্ষ্যমাত্রা তুলনায় কম বলেই সস্তায় নগর জীবনের বহু পণ্য সামগ্রী সুলভ মূল্যে মেলে এই হকারদের থেকেই। ফলে রাতারাতি এমন হকার উচ্ছেদ অভিযান কেবল হকারদের জীবনকে সঙ্কটে ফেলছে না বরং তার সাথে শহরের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সিংহভাগ  মানুষকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এই দুর্মূল্যের বাজারে।
আজ সরকারের এই বুলডোজার অভিযানে বাস্তুচ্যুত হকারেরা আবারও পেটের দায়ে শহরের মধ্যে অন্য কোনও প্রান্তে ছুটবে জীবন-জীবিকার তাগিদে। ফলে উচ্ছেদের  আগে তাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রস্তুত না হলে ঐ হাজার হাজার অসহায়  মানুষেরা আবারও অন্যত্র হকারি করতে গিয়ে ‘ জিজিয়া করের’ মুখে পড়বেন যেমনটা পড়তো ঘাসফুল আমলে। ফলে সরকারি স্তরে তাঁদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা না থাকলে শহরের প্রান্তে প্রান্তে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাঁদের পুনর্বাসনের নতুন পথ উন্মুক্ত হবে কাটমানির বিনিময়ে। ফলে তারা আবার চিহ্নিত হবে অবৈধ হকার হিসাবে। এভাবেই সাম্প্রতিক অতীতে বহু হকারদের এমন অবৈধ লেনদেনের খপ্পরে পড়তে হয়েছে তাঁদের কষ্টার্জিত ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। ফলে নতুন সরকারের আমলে পুনর্বাসন ছাড়া লাগাতার এমন উচ্ছেদ চলতে থাকলে আখেরে সেই ‘নতুন বোতলে পুরানো মদ’-এর মতোই সিন্ডিকেট ও কাটমানিকালচার তৈরি হবে নতুন করে রাজ্যে। ফলে দুর্নীতির ক্ষেত্রে আপসহীন মনোভাব নিয়ে চলতে গেলে সরকারকেই এই অপরিকল্পিত হকার উচ্ছেদ অভিযান অবিলম্বে বন্ধ রাখা উচিত বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থেই। এমনকি পুলিশ দিয়ে স্টেশন কিংবা বাসস্ট্যান্ড হকার মুক্ত করা গেলেও সেই পেশাচ্যুত মানুষেরা পেটের দায়ে বিপথে চালিত হলে তার দায় কে নেবে? এটাও সরকারকে ভাবতে হবে বৃহত্তর জনস্বার্থে। 
পরিশেষে সরকারে আসার অব্যবহিত পরেই কেন এমন অভিযান এ নিয়ে জনমানসে চর্চা শুরু হয়েছে। সন্দেহ নেই দেশ তথা রাজ্যের গেরুয়া শাসক রাজনীতির ক্ষেত্রে হিন্দুত্ব এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে। ফলে শহরের উন্নয়ন তথা সৌন্দর্যায়নের অর্থ শহরের ‘অসুন্দর’ দরিদ্র মানুষকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা, শহর জুড়ে প্রসাধনী পরিবর্তনের আবহে। ফলে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকারে এসেই উচ্ছেদের মতো অপ্রিয় কাজ কর্পোরেট সংস্কারের স্বার্থে শাসক করতে চাইছে ‘লোহা গরম থাকতে থাকতেই’, দুর্বল মানুষগুলোর মেরুদণ্ড ঘা মেরে বেঁকিয়ে দিতে। আর সরকারের এমন জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে যে প্রধান বিরোধীদের রাস্তায় প্রতিবাদে প্রতিরোধে নামার কথা তাঁরা আজ শাসকের ‘গৃহে পালিত’ বিরোধীতে পরিণত হয়েছে। জেল যাত্রা কিংবা পচা ডিমের আক্রমণ ঠেকাতে তৎপর গোটা ঘাসফুল দলটা আঙুলের ভোটের কালি মোছার আগেই রাজ্যে মুছে যেতে চলেছে। ফলে কেন্দ্র কিংবা রাজ্যের শাসকের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূল ভোটের পর নিদ্রা যাওয়ায় রাজ্যে ‘ট্রিপল ইঞ্জিনের’ সরকার গড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে ‘দূরবীক্ষণ’ দিয়েও দেখতে না পাওয়া বামপন্থী মানুষেরাই আজ হকারদের অধিকার রক্ষার লড়াইতে সবচেয়ে কাছের মানুষে পরিণত হয়েছে। এটাও এক গুণগত পরিবর্তন, ভোট পরবর্তী রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে।  



গোটা ঘাসফুল দলটা আঙুলের ভোটের কালি মোছার আগেই রাজ্যে মুছে যেতে চলেছে। ফলে কেন্দ্র কিংবা রাজ্যের শাসকের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দলের বড় অংশ যেভাবে শাসকের বি-টিম হয়ে দাঁড়িয়েছে তাতে রাজ্যে ‘ট্রিপল ইঞ্জিনের’ সরকার গড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে বামপন্থী মানুষেরাই আজ অধিকার রক্ষার লড়াইতে সবচেয়ে কাছের মানুষে পরিণত হয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment