রণদীপ মিত্র
ঠকেছেন জমিদাতারা। ঠকেছেন রাতের পর লাঠি হাতে রাতজাগারাও। ‘দেউচা-পাঁচামী কয়লা খনি প্রকল্প’ ঘিরে বিবর্ণ বাস্তবতা এমনটাই।
আন্দোলন বাড়তে দেওয়া যাবে না। লাগাতার ‘রাতপাহাড়া’য় দিয়েছিলেন নিশ্চিন্তপুরের শক্তিপদ বাগদি ও তাঁর দলবল। একরাশ হতাশা আছড়ে পড়েছে তাঁর গলায়, ‘‘আমরা লেঠেলবাহিনী হয়ে কী পেলাম ? আজ তো খাদানই খাঁ খাঁ করছে।’’ একই গ্রামের রফিকুল অবশ্য চাকরি পেয়েছেন জমির বিনিময়ে। ক্ষোভ তাঁরও। মুরারই ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগ দিয়েছেন গ্রু-ডি কর্মী হিসাবে। তাঁর অসন্তোষ, ‘‘বাড়ি থেকে আসা যাওয়াতেই লেগে যায় ছ-ঘন্টা। হাসপাতালের এমন কাজ করতে হবে বলেছে যা কোনও দিন ভাবিনি। এই চাকরির জন্য তো জমি দিই নি।’’
যে প্রকল্প ঘিরে এত প্রচার তার হাল কী? জাতীয় সড়ক ধরে দেউচা ব্যারেজ পেরিয়ে বাঁদিকে নেমে যাচ্ছে ঢালাই রাস্তা। কিছুদূর গিয়ে মথুরাপাহাড়ি। গ্রাম পেরিয়েই মুথুরাপাহাড়ি ও চান্দা গ্রামের মাঝে পেল্লাই প্রবেশদ্বার। মুখ্যমন্ত্রীর ছবি সহ প্রকল্পের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে আছে গোটা চত্বর। কিন্তু খনন করার বিরাট গহ্বর থেকে আজ আর বের হচ্ছে না মাটি কাটার মেশিনের আওয়াজ। দেখা নেই কোনও ডাম্পারের। খাঁ খাঁ করছে গোটা চত্বর। শ্রমিক, কর্মচারী, গাড়ি, যন্ত্রপাতির আনাগোনা কমে শূন্যে পৌছোলেও বেড়েছে পুলিশের সংখ্যা। শূন্য গহ্বরে (খাদান) থেকে প্রতিস্থাপিত হাজার অর্জুন, শালগাছের নয় জঙ্গলেও যাওয়া মানা। যেতে গেলেই প্রহরী পুলিশের হাত উঠে আটকাবে পথ। আসবে নিদান, ‘‘উপরতলার অনুমতি লাগবে।’’ উদ্দেশ্য, স্তব্ধ খাদানের ছবি যেন কেউ না দেখে।
থমকে যাওয়া সেই প্রকল্পকে উদ্দেশ্য করেই গজরাতে গজরাতে নিশ্চিন্তগুরের শক্তিপদর কথা, ‘‘প্রকল্পের ঘোষনার পর থেকে এলাকার মানুষ খেপে উঠেছিল। মানুষের আন্দোলন সবার চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই আন্দোলন থামাতে আমরা হয়েছিলাম লেঠেলবাহিনী। তখন বলেছিল, আমাদেরও কিছু একটা ব্যবস্থা হবে। কী ব্যবস্থা হবে আমরা বেশ বুঝেছি।’’
একইভাবে প্রকল্প এলাকায় জমি ছিল রফিকুলের। জমি দিয়েছেন। দিন পাঁচেক হল চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। যোগ দিয়েই তিনি বীতশ্রদ্ধ। যোগ দিয়েছেন মুরারই হাসপাতালে। হাসপাতালের কী কী কাজ করতে হবে তার আভাস পেয়ে বেশ উদ্বিগ্ন সে। বলেছেন, ‘‘যা বুঝছি খুব কষ্টের কাজই জুটেছে। এমনটা হবে তা তো বুঝিনি।’’ এখনও পর্যন্ত চাকরি মিলেছে দু-হাজারের মত জমিদাতার। মোটের সিকিভাগ। যারা প্রকল্পের ‘পক্ষে’ তারাই নিজেদের ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ সংশয়ে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঘটা করে শুরু হয়েছিল খনন। বলা বাহুল্য, কয়লা প্রকল্পের নামে আগামী পনেরো বছরে সরকারের লক্ষ্য ‘পাহাড়ের সোনা’ কালো পাথরই। বিপুল মুনাফার ভরকেন্দ্র এই ব্যাসল্ট। সেই ব্যাসল্ট তোলার জন্যই প্রথমে ১২ একর জমি চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় চারশো একর জমি সরকার কিনেছে এখনও। লক্ষ্য ৩৪০০ একর জমি। যা মিলবে খাসজমি এবং রায়তি জমি থেকেই। এলাকার ৩০১০টি দিতে হবে উচ্ছেদের খেসারত যার মধ্যে আদিবাসী ১০৮৩। পরিবারগুলির বসবাস ষোলোটি গ্রামজুড়ে।
মাস তিনেক হতে চলল চান্দা মৌজার মুখ্যমন্ত্রীর সাধের প্রকল্পে বন্ধ রয়েছে কাজ। পিডিসিএলর এই প্রকল্পের হাল-হকিকত কী? সরকারী কর্তাদের মুখে তালা তবে প্রশাসনের অন্দরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, মাটির স্তর সরিয়ে ব্যাসল্ট তোলার বরাত পেয়েছিল ‘পাঁচামী ব্যাসল্ট মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড’। যার মালিক অন্য জেলায় বালি লুটের কারবারের অভিযোগে ইডি’র হাতে ধরা পড়েছেন।
স্তব্ধ দেউচা-পাঁচামী কয়লা প্রকল্পের কাজ।
Comments :0