editorial

নি‍‌জের পায়ে কুড়োল

সম্পাদকীয় বিভাগ

ব্রিগেডে নির্বাচনী জনসভা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাগাড়ম্বরের ফোয়ারা ছুটিয়েছেন। সাফল্যের সীমাহীন ফিরিস্তি দিয়েছেন। সর্বোপরি ভোটে জিতলে এরাজ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার উন্নয়নের এমন জোয়ার বইয়ে দেবেন যে বাংলার মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। এমন অতিরঞ্জন ও অতিকথনের নাটকীয়তা মোদী স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। ভঙ্গিতে মানুষ ভোলাতে তিনি ওস্তাদ। এতে দোষের কিছু নেই। ভোটের সময় এমন প্রলাপ না বকলে চলে না। তাছাড়া ঘরে বাইরে তিনি মোটেই স্বস্তিতে নেই। বিশেষ করে বৈদেশিক নীতিতে তাঁর এমন ল্যাজেগোবরে অবস্থা আগে কখনও হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন দেশে ধর্মান্ধ-গোভক্তদের যেভাবে প্রভাবিত করা যায় বিদেশেও সেই ফরমুলায় নিজেকে জাহির করবে। স্বঘোষিত বিশ্বগুরু হবার বাসনার উৎস এই ভাবনাই। কিন্তু বিদেশনীতির জটিলতা ও কূটনীতির প্যাঁচ যে সব সময় দু’য়ে দু’য়ে চার হয় না সেটা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। হাত ধরে বুকে জড়িয়ে গলাগলি আর কোলাকুলি দিয়ে যে কূটনীতির চিড়ে ভেজে না সেটা এখন তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
মোদী সরকার ভেবেছিল উন্নত, পরাক্রমশালী বিশ্বশক্তি হতে হলে নেহরু জমানার প্রতিষ্ঠিত বিদেশনীতি বর্জন করতে হবে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বশান্তির পক্ষে জোট নিরপেক্ষ নীতিতে দুনিয়ার সমীহ আদায় করা যাবে না, বিশ্বগুরু হওয়া যাবে না। শক্তিশালী হতে গেলে বুকের ছাতি আর পেশিশক্তির আস্ফালন চাই। অতএব অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে। সমর সজ্জার বাহাদুরি দেখাতে হবে। আমেরিকার পাশে থাকলে, আমেরিকার মন জুগিয়ে চলতে পারলে আমেরিকার দয়ায় ভারতকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে তৈরি করা যাবে। চীনকে তখন চ্যালেঞ্জ করা যাবে।
এমন ভাবনা থেকেই শান্তির জোট নিরপেক্ষতা থেকে মোদী যুদ্ধবাজ ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। যে কোনও স্বাধীন সার্বভৌম দেশ তাদের নাগরিকদের সর্বোচ্চ স্বার্থকে সামনে রেখে তাদের বিদেশনীতির রূপরেখা তৈরি করে এবং সেই মতো কূটনীতির দক্ষতা অর্জন করে। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু ঐতিহাসিক নয়, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। তেমনি ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম গন্তব্য এই অঞ্চল। সর্বোপরি প্রায় এক কোটি ভারতীয় এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। এই অভিবাসী ভারতীয়দের পাঠানো ডলার ভারতের বিদেশি মুদ্রার বৃহত্তম উৎস। জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনায় থাকলে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকুক এটাই চাইবে ভারত।
ইজরায়েলের জন্মের পর থেকে ইজরায়েলের পক্ষে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আজ পর্যন্ত একটি প্রস্তাবও পাশ হয়নি। প্রতিটি প্রস্তাব ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ দেশের সমর্থন প্যালেস্তাইনের পক্ষে পাশ হয়েছে। ভারত বরাবর প্যালেস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মোদী সরকার আমেরিকাকে খুশি করতে সেই অবস্থান বদলে ইজরায়েলের পক্ষ নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ইরানের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জুনিয়র পার্টনার হতে গিয়ে গাজায়, লেবাননে গণহত্যায় ইজরায়েলকে পরোক্ষ মদত দিতে হয়েছে ভারতকে। এমনকি আমেরিকা-ইজরায়েলের ইরান আক্রমণকেও নিন্দা করার সাহস হারিয়েছে। আমেরিকা-ইজরায়েলের আগ্রাসনের ফলে আমেরিকার থেকে অনেক বেশি বিপদে পড়েছে ভারত। তেল-গ্যাস ছাড়াও বাণিজ্য সঙ্কট, লগ্নি সঙ্কট ঘণীভূত। ভারতের অতিরিক্ত মার্কিন প্রীতি এবং যুদ্ধের পক্ষে অবস্থানই জনগণের এই বিপদ অনিবার্য হয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment