Mamata Banarjee

শংসাপত্র নিয়ে মিথ্যা আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর, ক্ষোভ মানিকচকে

রাজ্য

 শনিবার মালদহে মানিকচকের এনায়েতপুরে সভা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তবে সেখানে ‘কিষান জাতির শংসাপত্র’ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি তিনি। এই ঘটনায় মানিকচক, রতুয়া সহ গোটা জেলার একটি বড় অংশের মানুষ এদিন রীতিমতো ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
এর আগে ২০১১ সালে এই এনায়েতপুরে এসেই মুখ্যমন্ত্রী বলে গিয়েছিলেন, ‘‘তৃণমূল সরকারে এলে ‘কিষান জাতি’র মানুষদের শংসাপত্র দিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ শুধু তাই নয়, এরপর মালদহে গত কয়েক বছরে একাধিক প্রশাসনিক বৈঠকেও বারবার এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এমনকি গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ‘নবজোয়ার যাত্রা’য় অভিষেক ব্যানার্জিও এসে একই কথা বলে যান। 
মালদহ জেলায় প্রায় দু’লক্ষ মানুষ কিষান জাতির অন্তর্গত। শুধু মানিকচকের ভুতনির চরের উত্তর চণ্ডীপুর, দক্ষিণ চণ্ডীপুর, হীরানন্দপুর সহ বিস্তীর্ণ তল্লাটেই ৪০ হাজারের বেশি মানুষ কিষান জাতির অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি এসটি শংসাপত্র। ঝাড়খণ্ড, বিহারে এই কিষান জাতির মানুষজন আদিবাসী হিসাবে গণ্য হন। মালদহ ছাড়াও মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের একাংশে রয়েছেন কিষান জাতির মানুষজন। আগে মালদহ জেলার সিপিআই(এম) বিধায়করা একাধিকবার এই বিষয়ে বিধানসভায় আলোচনা করেছিলেন। ২০১১’র সময় মুখ্যমন্ত্রী ‘বামপন্থীরা কিষান জাতির বিরুদ্ধে’ বলে ঘৃণ্য প্রচারও উসকে দিয়েছিলেন। 
সিপিআই(এম) মালদহ জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দেবজ্যোতি সিনহার কথায়, এই মানিকচকে, রতুয়ার একটি ব্লকে, কালিয়াচক ২ নম্বর ও বৈষ্ণবনগরে, হরিশচন্দ্রপুরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বসবাস করছেন তাঁরা। আদিবাসীর স্বীকৃতি তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি। মোদীর মতো মমতার প্রতিশ্রুতিও এদের কাছে ‘জুমলা’ এখন। বারেবারে ভোটের সময় এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কাজের কাজ কিছু হয়নি। যেমন গত বছর প্রশাসনিক সভায় এসে বলে গেলেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের শংসাপত্র দেওয়া হবে। আমাদের পরিযায়ী শ্রমিক ইউনিয়নের চাপে রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গ মাইগ্রেন্ট ওয়েলফেয়ার বোর্ড তৈরি করেছে। বোর্ড ক্ষতিপূরণের টাকা ঘোষণা করলেও একটি পরিবারও তা পায়নি। এসবই জুমলা। বিজেপি’র মতো কিষান জাতির মানুষদের নিয়ে ভোটের রাজনীতি করছেন মমতা ব্যানার্জিও। 
উত্তর চণ্ডীপুরের বাসিন্দা বঙ্কিম মণ্ডলের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী আমাদের শুধু ভোটব্যাঙ্ক মনে করেন। আমরাও এবার ভোটেই জবাব দেব। আমাদের দুর্বল ভাবা হচ্ছে। কিষান জাতির মানুষজন মূলত কৃষিকাজে যুক্ত, নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। আমাদের আত্মীয়স্বজন যাঁরা বিহারে আছেন তাঁদের আদিবাসী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা এসটি শংসাপত্র পেয়েছেন। এখানে গত ১৩ বছর ধরে প্রতারণা করা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে।’’
ভূতনির চরেরই বাসিন্দা আনন্দ মণ্ডলের কথায়, ‘‘কিষান জাতির নিজেদের সংস্কৃতি আছে। কিছুদিন আগেই আমাদের হমভীরা পুজো হলো। আমরা তো অনুদান বা ভিক্ষা চাইনি। গ্রামে কাজ নেই। নদী ভাঙনের এলাকায় আশঙ্কার মধ্যে সারা বছর থাকি। আমাদের তো গণ্যই করছে না এই সরকার।’’
গত বিধানসভা ভোটের আগে ২০২০ সালে বামফ্রন্টের তৎকালীন পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেও কিষান জাতির মানুষদের দাবির কথা তুলে ধরেছিলেন। সেখানে চক্রবর্তী বলেছিলেন, কিষান জাতি সেবা সমিতির প্রতিনিধিরা আমাদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। ভারত সরকারের গেজেট নম্বর ৩১৩এ, ২৯ অক্টোবর, ১৯৫৬ এবং ক্যালকাটা গেজেট এক্সট্রা-অর্ডিনারি, ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৫৬- এই দুই গেজেটেই সরকার কিষান জাতিকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ঘোষণা করেছিল। একাধিকবার আশ্বাস দিলেও রাজ্য সরকারের তরফে কিষাণ জাতিকে এই শংসাপত্র দেওয়ার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এদিন খোদ এনায়েতপুরের মানুষজনই মুখ্যমন্ত্রীর সভার পরে নদী ভাঙন থেকে পরিযায়ী, কিষান জাতি নিয়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। নদী ভাঙন নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের ভূমিকা একই। অথচ এই মানিকচকের ভূতনির চরের একাধিক গ্রাম ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে গঙ্গার গ্রাসে।
 

Comments :0

Login to leave a comment