আব্দুল কাফি
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রথামাফিক নিবন্ধ লিখতে গিয়ে গম্ভীর কথার বদলে চোখে ভাসে ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া ভ্যাবাচেকা মজুরের মুখ— কাজের অনিশ্চয়তার মাঝখানে সে কি তার মাতৃভাষা নিয়ে ভাবে? তার হাত কথা বলে, আর ঠোঁটে লেপ্টে থাকে ভাষা তার, যে ভঙ্গিতে কথা বলে এসেছে সে এতকাল, সেই ঠাঁট, পরিচিত শব্দেরা তার আত্মীয়সমান, সুদূর প্রবাসে সেই ভাষাই তার আত্মজন, সখা; পল্লী ছিঁড়ে এসেছে সে অচেনা প্রদেশে। এ তো বিদেশ, বিভুঁই। কিন্তু এমনকি মারের মুখেও সে নিজের ভাষাকে ছাড়ে কী করে? তার সব চিন্তা-কল্পনা-উদ্বেগ-- সমস্তই গড়ে তোলার কারিগর তার মাতৃভাষা, শিশুকাল থেকে এই-ই তার আপনার ঘরদোর— সেই মাতৃভাষাই কি এহেন বিদেশে শত্রু হয়ে ওঠে তার? তারই ভাষার ঢঙ নিজের দেশে প্রবাসী বানিয়ে তোলে তাকে?
পণ্ডিতেরা কেউ কেউ হয়তো এমন কথায় শিউরে উঠবেন, হা-হা রবে ধিক্কার জানাবেন। বলবেন, এ কেমন অবিদ্যা? নিচু ক্লাসে শেখোনি কি, বাংলার ক’খানি উপভাষা? কেউ কেউ সাজানো গাম্ভীর্যে দুলে দুলে বলবেন, ডায়ালেক্ট, ডায়ালেক্ট... পড়োনি সুকুমার সেন? ভাষা আর উপভাষা এক হলো? ও যে পৃথক। রাড়ী, বঙ্গালী, বরেন্দ্রী— তাদের আলাদা সব রকম-তরিকা একেবারে পাকাপোক্ত বেঁধে দেওয়া আছে। ওর মধ্যে থেকে কোনও একটা বেছে নিয়ে বললেই পারে— ভদ্র বাবুরা যে-রকম বাংলা বলে তেমন করে কেন কথা বলে না ওরা? করজোড়ে জানাবো তাঁদের, উপ, শাখা, অনু— যে নামেই ডাকুন না কেন, ওরাও ভাষাই। ভাষার বাইরে নয়, যুগ যুগ ধরে ওরা বাংলা ভাষা হয়েই আছে। ওরা পৃথগন্ন নয়। শুনছি এখন, কোনও এক সরকারি প্রতিনিধি বলেছেন, আইআইটি-বিশেষজ্ঞরা নাকি গভীর গবেষণায় অচিরেই এক যন্ত্র আনতে চলেছেন। লোকমুখে কথা শুনে শুধু, চিহ্নিত করা যাবে কে বাঙালি এপারের, আর কে ব্যাটা বিদেশি, বাংলাদেশি। শোনামাত্র এক লহমায় টের পাওয়া যাবে কোন বাংলাভাষাটি যথেষ্ট বাংলা নয়। নতুন করে কি মুখের বুলি তাহলে পালটে ফেলতে হবে?
এত সব কথা উঠছে কারণ, এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছে কিছু কুণ্ঠিত পায়ে। চোখে তার থমকে আছে জল। এবারের একুশে ফেব্রুয়ারির কোলে জমা হয়েছে আরও কয়েকটি শব। এদের ভাষা শহীদ বলা যাবে কি না তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক এখনও ফুরোয়নি। ঠিকই, সালাম বরকত রফিক জাব্বার কিংবা শফিউরের মতো ভাষার দাবিতে এরা মিছিল করেনি— রাষ্ট্রের বেহুদা বুলেট এসে এদের বুক ফাটিয়ে দেয়নি, কিন্তু এদের অনেকেই মরে গেছে মাতৃভাষায় কথা বলেছিল বলে, মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনও ভাষা শিক্ষার মুরোদ এবং সুযোগ এদের ছিল না বলে, মাতৃভাষাতেই এরা মরার আগে আর্তনাদ করে উঠেছিল। ভাবা হয়েছিল বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে, এরা যে ভাষায় বা উপভাষায় কথা চালাচ্ছিল, সেটি মুসলমানের ভাষা। পশ্চিমবঙ্গের যে শ্রমিক মহারাষ্ট্রে মারা গেলেন দিন কয়েক আগে, কিংবা ওডিশায় যে বাঙালি মজুর নিহত হলেন— তাঁরা ব্যক্তিগত ধর্মপরিচয়ে কিন্তু মুসলমান ছিলেন না— কিন্তু তাতে কী? তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন নিশ্চয়, নিজেদের দেশ-ঘরের বুলিতে, ভঙ্গিতে নিশ্চয় তাঁরা বারবার বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তাঁরা বাংলা ভাষার বাইরের লোক নন, বিদেশি নন। উপভাষাও আসলে ভাষারই অংশ— তা অন্য ভাষা নয়। কিন্তু হত্যাকারীরা তা শোনেনি। তাদের হয়তো মনে হয়েছে, এই বাংলা ভাষা কেবল বাংলাদেশেই চলে। হিন্দু বাঙালিও যে ওই সব উপভাষায় কথা বলে তা তাঁদের জানা ছিল না নির্ঘাৎ। নাকি ছিল? বাংলাদেশি মুসলমানের প্রতি উগ্র দক্ষিণপন্থী অবাঙালিদের রাগ ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়ে গেছে যে-কোনও বাংলাভাষীর দিকে? হোক সে হিন্দু, বাংলা ভাষায় কথা কইবে কেন? এই কি ছিল ভাবনা?
ওরা বোঝেইনি, আমার ভাষা আমার দেশেরই তুল্য। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া আর দেশের জন্য প্রাণত্যাগ আসলে একই গোত্রের।
বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে কত কী হয়েছে আমাদের কবিতায়— বাংলা ভাষার উঠোনে মুসলমানের ‘দিদিমা’ কিংবা নানি বড় আদরে জায়গা পেয়েছিলেন কত আগে। রমজান মাসের সন্ধ্যাবেলায় বিষাদসিন্ধুর বেদনা, মায়ের ঘুমপাড়ানি গান একুশে ফেব্রুয়ারির গায়ে সৌরভের মতো লেগে ছিল। শামসুর রাহমান লিখেছিলেন আমাদের খুব চেনা এক কবিতায়--
বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে চোখে ভেসে ওঠে কত
চেনা ছবি: মা আমার দোলনা দুলিয়ে কাটছেন
ঘুমপাড়ানিয়া ছড়া কোন্ সে সুদূরে; সত্তা তাঁর
আশাবরী। নানি বিষাদসিন্ধুর স্পন্দে দুলে দুলে
রমজানি সাঁঝে ভাজেন ডালের বড়া আর
একুশের প্রথম প্রভাতফেরি-- অলৌকিক ভোর।
এই বছর, এই দু’হাজার ছাব্বিশে এসে, এতদিনের পরিচিত এই কবিতা কি ভুলতে হবে? আমাদের যে আজ দেখতে হচ্ছে-- বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে, এ দেশের আনাচে-কানাচে... জমে উঠছে লাশ।
২
কেন স্মরণ করি এই দিন? কেন সকালে পথে নেমে পড়ি? শুধু কি কয়েকজন অদম্য যুবকের কথা আমাদের ভাবায়? তাঁদের মৃত্যু আর আত্মত্যাগই কি শুধু মনে রাখি? অন্তত আরও দুটো কারণ আছে। বাহান্ন সালের যে আন্দোলনের মাঝখানে পাকিস্তানের শাসক গুলি করে হত্যা করেছিল কয়েকজন যুবককে, সেই আন্দোলনটি ভাষা আন্দোলন হিসাবেই সবাই চিনি। কিন্তু তা কেবল ভাষার আন্দোলন ছিল কি? তার ভিতরে তো ছিল স্বৈরাচার বিরোধিতা, ছিল স্বাধীনতার কিছু আকাঙ্ক্ষাও। অনেকেই মনে করেছেন পরে, বাহান্ন-র ফেব্রুয়ারিই একাত্তর সালে স্বাধীনতার সংগ্রামে বুনেছিল ‘মার্চের স্বপ্ন’। মাতৃভাষার সম্মান কেউ খর্ব করতে চাইলে বুঝতে হবে, এর পরের ধাপে স্বাধীনতার উপর আঘাত আসতে চলেছে। মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধ তাই স্বাধীনতা-যুদ্ধই বটে। দ্বিতীয়ত, এই দিনে মিছিলে, গানে, কবিতায়, স্মারকে বারবার টের পাই কতদূর অব্দি আমাদের ঠিকানা। কতদূর অব্দি আমার স্বজনের বাস।
সকলেই জানেন হয়তো, তবুও একুশে ফেব্রুয়ারির পিছনে কী ছিল, কারা ছিল সংক্ষেপে দেখে নিই একবার। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং স্বাধীনতার সময় গোটা পাকিস্তানের জনসংখ্যার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ ছিলেন বাংলাভাষী। অথচ স্বাধীনতা পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা গেল প্রায় সমস্ত সরকারি কাজে পাকা আসন তৈরি পেয়েছে ইংরেজি এবং উর্দু। পাকিস্তানে অতি অল্প সংখ্যক মানুষের— পাঁচ শতাংশেরও কম— মাতৃভাষা ছিল উর্দু। তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল পাঞ্জাবী, এমনকি সিন্ধিভাষী মানুষ। বোঝাই গেল সোজাসাপটা, ক্ষুদ্র একাংশের মাতৃভাষা চেপে বসতে চলেছে সকলের উপর। উর্দু ভাষার প্রতি কোনও বিরাগ ছিল না— বরং ভালোবাসাই তো ছিল— পূর্ববঙ্গে উর্দুর চর্চাও হয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু আদরের সেই ভাষা যদি মাতৃভাষাকে হটিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন সেই ভালোবাসাও কিছু কুণ্ঠিত হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান মহম্মদ আলি জিন্না একাধিক সভায় সরাসরি ঘোষণা করে দেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। যারা তা মানবে না, তারা রাষ্টের শত্রু। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে এই বে-লাগাম দম্ভের প্রকাশ বহু মানুষকে স্তম্ভিত করে দেয়। এক বছর আগে থেকেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি কাজে ব্যবহার করার দাবি তুলছিলেন যাঁরা, এই ঘোষণায় তাঁরা শঙ্কিত হন, ক্ষুব্ধ এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য যে লড়াই চলছিল তা ঝলসে ওঠে। এই সবের প্রায় চার বছর বাদে তা তীব্র আকার নেয়— জিন্না ততদিনে প্রয়াত, কিন্তু তাঁর মনোভাব পাকিস্তানের প্রশাসকগণ বহন করেই চলেছেন তখনও। কখনো অত্যাচার, কখনো অবহেলা চলেছে ভাষা-সৈনিকদের উপর। একের পর এক নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, ভাষা-সৈনিকেরা একের পর এক স্মারকলিপি দিয়েছেন, প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বারবার। এমতাবস্থায় ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার এক জনসভায় ফের ঘোষণা করেন বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে না, উর্দুই চলবে। এর প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র হয়, সরকারি দমন-পীড়নও হয়ে ওঠে হিংস্র। একুশে ফেব্রুয়ারি যে ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল তা নির্মম ভাবে বানচাল করার চেষ্টা হয় সরকারের তরফে। গুলি চলে ছাত্রদের মিছিলে। ভাষা-শহিদ কয়েকজন ছাত্রের শবদেহকে সাক্ষী রেখে রুখে দাঁড়ায় গোটা বাংলাদেশ। মিছিলে মিছিলে পূর্ববাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শোক আর ক্রোধ আর শপথের বার্তা।
এর পরেও অবশ্য বাংলা ভাষার মর্যাদালাভ খুব সহজ হয়নি। বারবার শোনা গেছে শাসকের তরফে, বাংলাকে যারা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে দেখতে চায় তারা দেশদ্রোহী। কী চমৎকার! রাষ্ট্র এবং সরকারের স্বৈরাচার এবং দমনপীড়নের প্রতিবাদ করলে যুগে যুগে শাসকের ভাষা কেমন একই ধাঁচের হয়ে ওঠে, তাই না? কিন্তু সব ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, সব নিপীড়ন হার মানে। পাঁচটি মাত্র গ্রামের দাবি মেনে নিলে মহাভারত অন্যরকম হতো। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে যখন রাজি হলো না রাষ্ট্র, তখন ধীরে ধীরে শাসকের বিরুদ্ধে গড়ে উঠল মরণপণ ও মরণজয়ী সংগ্রাম। একাত্তরে জন্ম নিল নতুন যে দেশ,তার নাম হলো ভাষার নামেই। এ কথা নিশ্চয় সত্য ভাষা ছাড়াও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন দেশ গড়ার অন্য নানা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণও ছিল। কিন্তু ভাষার মর্যাদা-সংক্রান্ত প্রশ্নটি ছিল একেবারে সামনের দিকেই। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা হলো, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন পৃথিবীর যত জায়গায় হয়েছে এর পর, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রায় সব ক্ষেত্রেই নজির হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। যে-কোনও জনগোষ্ঠীর ভাষাকে অবহেলা ও লাঞ্ছনা করার মধ্যে আসলে যে লুকিয়ে থাকে সেই জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে দখল করার লোভ, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
৩
এই অব্দি কথা মোটের উপর আমাদের জানা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে একুশে ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতিলাভ— সেও প্রায় ত্রিশ বছর হতে চলল। ভাষার উপর দখলদারি, নানাবিধ আক্রমণ— কখনও চোরাগোপ্তা, কখনও সম্মুখযুদ্ধ চলছেই। এই ভূখণ্ডে আটচল্লিশ সালে যে মিছিল শুরু হয়েছিল, এখনও তা থামেনি। যতবার একুশে ফেব্রুয়ারির কথা স্মরণ করা হয় ততবার মনে পড়বে রাজপথ-গলি-আলপথ দিয়ে হেঁটে-চলা মিছিলের মুখ। মনে পড়বে অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতা— এসব কিছুই চায়নি সেদিনের সেই যুবকেরা, চেয়েছিল ভাষার মর্যাদা। ভাষাকে হাতিয়ার করে অচিরে যে সমস্ত অতীত কেড়ে নিতে চাইবে দস্যু রাষ্ট্র— তা বুঝেছিল বেশ। আর মনে পড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত এক বছর দশেকের বালকের কথা— সালাম কিংবা রফিকের আশেপাশে তারও স্মৃতি ঘোরাফেরা করে।
ভাষা-শহীদ-দিন, তুমি সেই চর্যাপদের কাল অব্দি, কিংবা তাকেও ছাপিয়ে কোন দূর অতীতে চারিয়ে যাওয়া শিকড়ের প্রতি আমাদের প্রণতি জানাবার উপায় করে দাও। সু প্রচুর ভাব সম্পদ আর ভালোবাসা নিয়ে অত্যাচারিত বৌদ্ধ সাধকেরা চলে যাচ্ছেন মূল ভূখণ্ড থেকে প্রান্তবর্তী পাহাড়ের দিকে— কাহ্ন পা, লুই পা, শবর পা— কোলে-কাঁখে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলা ভাষার প্রথম যুগের কবিতাবলি, মানুষের বেঁচে থাকার আহ্লাদ-বেদনা-- সেই দরিদ্র সাধকদের পল্লিতে আমাদের নিয়ে চলো তুমি। নিয়ে চলো মধ্যযুগের সেই কবির কাছে, বাংলাদেশ ছেড়ে ওডিশার সমুদ্র অভিমুখে চলে যাচ্ছেন শ্রীচৈতন্য— তাঁর সেই গমনদৃশ্য মনে রেখে বড় মমতায় যিনি লিখেছিলেন, হেদে রে নদীয়াবাসী কার মুখে চাও/ বাহু পসারিয়া গোরা চাঁদেরে ফেরাও…
রামপ্রসাদ, বিজয়গুপ্ত, জ্ঞানদাস কিংবা ঠাহর করি না এমন সব নাম-না-জানা কবিদের কাছে, কিংবা যাঁরা কবি নন, কেবলই ভিটে আগলে বেঁচেছিলেন নিতান্ত গড়পড়তা গেরস্তের মতো-- তাঁদের সবার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা পৌঁছে দিও তুমি। আমাদের আজকের প্রভাত ফেরিতে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের মতো বিখ্যাত ভাষাশিল্পীর পাশে এসে দাঁড়াক পরিযায়ী বিশেষণে লাঞ্ছিত বাঁকুড়া-পুরুল্যার মন-খারাপ প্রবাসী শ্রমিক। নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অপরাধে গত এক বছরে তাদের ‘বিদেশি’ খেতাব জুটেছে বারবার--এদেশেরই কোনও কোনও বিজেপি-অধ্যুষিত রাজ্যে। ভাষার জন্যই আবার শহীদ হয়েছে বাঙালি। ওরা সবাই কিন্তু কাহ্ন পা-র আত্নজন। ওরা সালাম-রফিকের ভাষার লোক। ভাষা-শহীদ-দিবস, তোমার তালিকায় বরকত-জাব্বারের পাশে ওদেরকেও ঠাঁই দিও।
ভালো করে কান পাতলে বাংলা ভাষায় বহু দূর থেকে ভেসে আসা শিস্ শুনতে পাওয়া যাবে— পাওয়া যাবে জনকোলাহল, গম্ভীরা, ভাটিয়ালি। কারবালাগীতি, বুক-চাপড়ানো কাতর মর্শিয়ার উপচে-পড়া বেদনাধারাও। শোনা যাবে, রামপ্রসাদ, লালনের সঙ্গে আলাপচারিতায় রত আলাওল, দৌলত কাজি। বৌদ্ধ, বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, মুসলিম, কাহার, কৈবর্ত সহ কত আজব কিসিমের মানুষ আপন আপন ভাব-ভালোবাসা-ব্যথা মেলে দিয়ে গেছে আমাদের ভাষার উপর।
আমাদের দেশে ঋতুপরিবর্তনের চক্র এমনই আশ্চর্য যে, প্রতি বছর নিয়ম করে একটি চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হতে হয়। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পৌঁছালেই দেখা যায়, এ আসলে তরুণ ফাল্গুন মাস। বুঝি, একুশ এলে ফাল্গুনও আসে। কিংবা ফাল্গুন না এলে একুশও এসে পৌঁছাতে পারে না। একুশের সঙ্গে নব-ফাল্গুনের এমনই এক চিরকালীন যোগ। আজ আটই ফাল্গুন। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারির একুশ, তোমার সঙ্গে ফাল্গুনের সখ্য জারি থাক। জারি থাক, তারুণ্যের অদম্য জেদ, প্রত্যয়ী মন। স্বৈরাচার-বিরোধিতা, ভাষার জন্য, ধর্ম-জাত নির্বিশেষে ভাষা ব্যবহারকারীদের জন্য ভালোবাসাও। এসবেরই সম্মিলিত নাম একুশের-চেতনা।
Comments :0