শান্তনু চক্রবর্তী
মেয়েটি নামী কর্পোরেট সংস্থার দামি প্রযুক্তিবিদের লোভনীয় চাকরি হেলায় ছেড়ে দিয়ে স্কুলশিক্ষিকার পেশা বেছে নিয়েছিলেন ভালোবাসার টানে। সিলেবাসে বাঁধাধরা ছকের একটু বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান ও সমাজ-সচেতন করে তোলার পাশাপাশি এই প্রজন্মের সঙ্গে মন মেলানোর একটা তাগিদও কোথাও হয়তো কাজ করেছিল। সেদিন একাদশ শ্রেণির রসায়নের ক্লাসে ঢুকে সেই মেয়েটিকেই একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। রোজকার মতো আনুষ্ঠানিক কুশল বিনিময়ের পরেই সামনের বেঞ্চ থেকে একটি ছেলে হঠাৎ বলে উঠল ‘ম্যাম, আপনি সবুজ রং পরেছেন কেন?’ ঘটনাচক্রে শিক্ষিকা মেয়েটির পরনে সেদিন ছিল ময়ূরপঙ্খী রঙের একটি কুর্তি। স্কুলে বেরোনোর তাড়ায় রং-টং অত কিছু খেয়ালও করেননি। ছেলেটির কথা শুনে মনে হলো হ্যাঁ, সত্যিই সবুজ রঙা একটা পোশাকই গায়ে রয়েছে তাঁর। কিন্তু তাতে ছাত্রটির সমস্যা কোথায়? অবাক হয়েই তিনি জিজ্ঞেস করেন — ‘সবুজ পরেছি তো কী হয়েছে?’ ছেলেটির সপাট উত্তর — ‘ওটা তো পাকিস্তানের রং। আপনি একজন হিন্দুস্তানি হয়ে ওই রং পরতে পারেন না। জানেন তো পাকিস্তান আমাদের শত্রু দেশ।
ছেলেটি অবশ্য তক্ষুনি সরাসরি সবুজ রঙের সঙ্গে ইসলামকে বা ইসলামের সঙ্গে পাকিস্তানকে মেলানোর চেষ্টা করেনি— বঙ্গ বিজেপি’র মেজো-সেজো-খুচরো নেতারা প্রায়ই যেমন করে থাকেন। ছাত্রের শিক্ষয়িত্রী তখনও তাকে প্রাণপণে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন, পাকিস্তানের সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের যতই বিরোধিতা থাকুক পাকিস্তানি সাধারণ মানুষ আমাদের শত্রু নন। বোঝাতে বোঝাতেই তাঁর মনে পড়ছিল, ২০২৪-এর জানুয়ারি মাসে অযোধ্যার রামমন্দির উদ্বোধনের ক’দিন আগে যে ছাত্ররা বলতে এসেছিল, ২২ জানুয়ারি তারা কেউ স্কুলে আসবে না, বাড়িতে বসে টেলিভিশনে রামমন্দির উদ্বোধনের ‘লাইভ ইভেন্ট’ দেখবে, সেই দলে এই ছেলেটিও ছিল। এইসব ছাত্র এবং সম্ভবত তাদের অভিভাবকদের চাপেই হয়তো ওদের স্কুলও শেষ অবধি মন্দির উদ্বোধনের দিনে ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছিল। নতুন ‘হিন্দু ভারতের’ ‘নবীন স্বাধীনতা দিবস’ বলে কথা! শহর কলকাতার অনেক বেসরকারি স্কুলের মতো ওই শিক্ষিকা মেয়েটির স্কুলে অবশ্য এখন লাঞ্চ বা টিফিনে আমিষ খাবার আনা নিষিদ্ধ হয়নি। স্কুলের অন্দরে এখনও মহাত্মা গান্ধীর আবক্ষ মূর্তি সশ্রদ্ধ মহিমায় বিরাজমান। অ্যাসেম্বলি হলে সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশও বাঁধিয়ে সাজিয়ে রাখা সবার সচেতনতার জন্য। কিন্তু তারপরেও স্কুলের এই আপাত-ধর্মনিরপেক্ষতার বহুত্ববাদী চরিত্র কতদিন বজায় রাখা যাবে, তাই নিয়ে মাঝে মাঝেই এখন সংশয় হয় ওই তরুণী শিক্ষিকার। তার মনে হয় যে ছাত্রটি তাঁর পোশাকের সবুজ রং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তাদের বাড়িতে হয়তো এরকমই কথা বার্তা হয়ে থাকে। সেখানে হয়তো পাকিস্তানের প্রতি ‘নরম’ বা সহানুভূতি সম্পন্ন হিসাবে গড়পড়তাভাবেই চিহ্নিত হয়ে যান ভারতের সাধারণ সংখ্যালঘু জনগণ।
মেয়েটির নেটফ্লিক্স-এ সদ্য দেখা ‘হোমবাউন্ড’ ছবিটার কথাও মনে পড়ছিল। সেখানে দুটি প্রোটাগনিস্ট যুবকের একজন শোয়েবকেও তো অফিসের এক ঘরোয়া পার্টির আসরে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচের উত্তেজক মুহূর্তে পদস্থ সহকর্মীদের নেশাগ্রস্ত অসংলগ্ন চপলতায় ওভাবেই পাকিস্তানের ‘সমর্থক’ বা ‘টার্গেট’ বনে যেতে হয়েছিল। আর পুরোটাই ঘটছিল তার নাম আর ধর্মীয় পরিচিতির কারণেই। ছবিতে শোয়েব আত্মসম্মান বাঁচাতে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু এই ভারতের বহু মুসলিম সংখ্যালঘু মানুষেরই নিজের পরিচিতি, অস্তিত্বের এই অসম্মান মেনে নিয়ে, সহ্য আর আপস করে, নিজেদের রুজি-রুটি-ব্যবসা-উপার্জন-অন্ন সংস্থানের সামান্যতম উপায়টুকু বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এরপরেও কোনও হিন্দুবাহিনীর লেঠেলরা এসে ‘‘রামপুরের ‘মিয়ারা’ কেন, কার হুকুমে গাজিয়াবাদে বিরিয়ানির দোকান দিয়েছে’’ বলে সাত-সকালে এসে হুজ্জুত করতে পারে। উত্তরাখণ্ডে মুসলিম দোকানদারের বিপণির নামে ‘বাবা’ শব্দটি কেন আছে, তার জেরে দোকানের ঝাঁপ ফেলে, ব্যবসাপত্তর গুটিয়ে চলে যাওয়ার হুকুম জারি হবে। অথচ এই ‘বাবা’ শব্দটিতে কোথাও সনাতনী হিন্দুত্বের কোনও ‘পৈতৃক’ অধিকার নেই। যে ফার্সি বা তুর্কী উৎস থেকে শব্দটি উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি ভাষায় আশ্রয় পেয়েছে, সেখানেও শব্দটি ‘পিতা’ বা পিতৃস্থানীয় কোনও সম্মানীয় মানুষকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সঙ্ঘ-বাড়ির হিন্দুত্ব-হনুমানদের এই ভারতের মহামানবের বহুত্ববাদী, মিশ্র সংস্কৃতি নিয়ে মাথা ঘামাতে ভারী বয়েই গেছে। আর উত্তরাখণ্ডের কোত্দুয়ারের মতো এদেশের সব জায়গায় তো ‘মহম্মদ দীপক’ ওরফে দীপককুমারের মতো সৎ-সাহসী, সাচ্চা দেশপ্রেমিক, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সন্তান, সত্যিকারের ৫৬ ইঞ্চি বুকের পাটা নিয়ে প্রতিবেশী মুসলিম দোকানির পাশে সুরক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন না! অসহায়, আক্রান্ত, বৃদ্ধ ওয়াকিল আহমেদদের তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের অন্যায্য অন্যায় আস্ফালনের মুখোমুখি মাথা নুইয়ে সরে যেতে হয়। আর এই ধরনের ছোট মাঝারি প্রতিটি ঘটনাতেই ওই সংখ্যালঘু মানুষটির মনের মতই ভারতবর্ষের ‘সনাতন’ সহিষ্ণু সংস্কৃতির আত্মা আরও কিছুটা কুণ্ঠিত, সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।
উত্তরাখণ্ডের ওয়াকিল আহমেদের বাচ্চাদের স্কুল-পোশাকের ছোট্ট দোকানে হামলা আর দীপকের দৃপ্ত প্রতিরোধের ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, সেটা ছিল ২৬ জানুয়ারি আমাদের সাধারণতন্ত্র দিবস। হয়তো তত কিছু হিসাব কষে নয়, নেহাত কাকতালীয়ভাবেই ওই দিনটাতেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির হাতে সংখ্যালঘু মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের চেষ্টা আর পাশাপাশি সচেতন, মানবিক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার পালটা সবল প্রতিবাদের আলোকিত ছবিটা আমাদের সামনে এসেছিল। কিন্তু ওই একই তারিখেই ওডিশার কোরাপুটের জেলাশাসক যখন কোনও নির্দিষ্ট কারণ না দর্শিয়েই, স্রেফ একটা হুকুমনামা জারি করে গোটা জেলায় আমিষ খাদ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা লাগু করে দেন, তখন সেটা আর স্রেফ ‘ঘটনাচক্র’ থাকে না। বোঝাই যায়, ওডিশার নব্য বিজেপি-শাসন, প্রজাতন্ত্রর দিবসের ‘পুণ্যলগ্নে’ রাজ্যের আদিবাসী অধ্যুষিত জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রোজকার খাদ্যাভ্যাসের ওপর উত্তরভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী অনুশাসন নামিয়ে এনে পূর্ব ভারতের আরণ্যক আদিম জনগোষ্ঠীকে অন্তত একদিনের জন্য যতদূর সম্ভব, ‘শুদ্ধ শাকাহারি’, পবিত্র, সনাতন ‘আর্য’ করে তুলতে চাইছে। অবশ্য জেলাশাসকের এহেন মনুবাদী আদেশ শেষ অবধি ধোপে টেকেনি। আদিবাসী সমাজ, বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের তরফে তীব্র প্রতিবাদে জানতে চাওয়া হয়েছিল, দেশের মানুষরে মৌলিক নাগরিক অধিকারের উদ্যাপন যে প্রজাতন্ত্র দিবস— সঙ্ঘ পরিবার কী সেটাকেও কাঁওয়ার যাত্রা, শিবরাত্রি, নবরাত্রি, দশেরা, গণেশ চতুর্থীর মতো ধর্মীয় উৎসব বানাতে চাইছে? আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে, বিজেপি সরকার বা বকলমে জেলাশাসকও তথাকথিত শুদ্ধিকরণ বা রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘আর্যামি’-র এই শয়তানি ফতোয়া মানে মানে তুলে নেয়!
তবে এ যাত্রায় পিছু হটতে বাধ্য হলেও সঙ্ঘ পরিবার ও হিন্দুবাদী রাজনীতির তরফে ভারতীয় মনের এই শুদ্ধিকরণ, দখলীকরণ ও প্রয়োজনমাফিক সন্ত্রস্তকরণের কাজগুলো চালিয়ে যাওয়া হয়। আর এই মন-দখল ও দূষণের প্রক্রিয়া বা কার্যক্রমগুলো চলে বিভিন্ন স্তরে বা পর্যায়ে। একেবারে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পাড়া-প্রতিবেশী, বৈঠকখানা, রোয়াক, চায়ের দোকান থেকে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় স্তর অবধি। অনেক সময়ই সেটাকে কোনও বড় কার্যক্রম বা ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’-এর অংশ হিসাবে বোঝাও যায় না। কিন্তু বাইরে সাদা-সরল, আপাত নিরীহ নির্দোষ-ছেলেমানুষির মোড়ক সরাতেই বিষের বড়িগুলো ঠিক দেখা যায়। যেমন আলোচনার শুরুতেই আমরা যে শিক্ষায়ত্রী মেয়েটির ক্লাসঘরের অভিজ্ঞতার কথা শুনছিলাম। আবার মাঝেমাঝে বড় ন্যারেটিভ-এর অঙ্গ হিসাবেই ঘরোয়া, অন্তঃরঙ্গ আড্ডার মেজাজেই কিছু কিছু আলোচনা শুরু হয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে এগোতে এগোতেই তার গোপন অ্যাজেন্ডাগুলো বাঘনখ, বিষদাঁত, লুকানো ছুরির মতই ক্রমশ বেরিয়ে আসতে থাকে। এই প্রতিবেদকেরই স্নেহভাজন এক যুবক সরকারি মাদ্রাসা স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। বর্ধমানের বাসিন্দা, পারিবারিকভাবে বামপন্থী এই যুবকটি এবিটিএ’র সক্রিয় সদস্য। তৃণমূলের ভোট-লুট আটকে, নিজেদের বুথ আগলে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে এলাকায় বামপন্থী জোটের পঞ্চায়েত গঠন করতে পেরেছিলেন। তাঁর মাদ্রাসার সহকর্মীরা অনেকেই সেই লড়াইয়ের গল্প জানেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও সেদিন যে হিন্দু সহকর্মীটির সঙ্গে ভিন রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণের প্রসঙ্গে তাঁর কথাবার্তা শুরু হয়েছিল, তিনিও জানতেন। তবুও খানিকক্ষণ পরেই তিনি মন্তব্য করে বসলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার চলছে, যেভাবে দীপু দাসকে খুন করা হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়াতেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন। অধিকাংশই তো মুসলিম। ওদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা ঘুষপেটিয়া তাই বা কে জানে! সব জায়গাতেই তো মুসলিমদের একই রকম দেখতে হয়।
এভাবেই ঘরোয়া, বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনাও স্বাভাবিক শালীনতা-রুচিবোধের সীমাটাকে ইচ্ছে করেই স্পর্শকাতর এলাকায় ঢুকে পড়ে। সঙ্ঘ-বাস্তুতন্ত্রের প্রিয় প্রতিক্রিয়ার তত্ত্ব’র পাশাপাশিই সেখানে বিজেপি’র সর্বভারতীয় বড় ন্যারেটিভ-এ দুটো বহু ব্যবহৃত লব্জ ‘ঘুসপেটিয়া’ আর ‘রোহিঙ্গা’-ও সেখানে জায়গা করে নেয়। এই প্রতিবেদকের পরিচিত যুবক শিক্ষকটি এরপরে সহকর্মীটির সঙ্গে খুব একটা তর্কে যাননি। কিন্তু একজন বাঙালি শিক্ষক, তাঁর নিজের রাজ্যের সহ-নাগরিকদের বাংলার বাইরে নির্যাতিত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহকে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের যথাযথ উপযুক্ত ‘বদলা’ বলে বৈধতা দিচ্ছেন এবং গর্বিতও হচ্ছেন, এতেই বোঝা যায়, ধর্মীয় মেরুকরণের বৃহত্তর জাতীয় আখ্যানটা, ‘মাইক্রো’ বা স্থানীয়-তৃণমূল স্তরেও শিবির-ভাগাভাগির কাজটা কতটা গভীরভাবে সেরে ফেলতে পেরেছে। আর ভাগাভাগির এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় হিন্দুত্ববাদী আখ্যানও তার ঘৃণার বয়ান বা মেটোদিককেও আরও তীব্র বিদ্বেষময়, আরও আঘাত-প্রবণ করে তুলেছে। যেমন খেয়াল করে দেখুন, হিন্দুত্বের বয়ান ‘সনাতনী আর ‘রোহিঙ্গা’ শব্দদুটি কিন্তু একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও তেমন শুনেছেন বলে মনে করতে পারবেন না। এমন কী ২০১৪ সালে কঙ্গনা রানাওয়াত-কথিত ভারতের ‘প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের’ প্রথম কয়েক বছরেও নয়। এই শব্দদুটো গত দুই-তিন বা জোর বছর পাঁচেকের আমদানি। হিন্দুত্বের বদলে ‘সনাতনী’ শব্দ ব্যবহার করলে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে যে সহজাত সঙ্কীর্নতার ধারণা আরএসএস’র গত ১০০ বছরের অস্তিত্বের সঙ্গেই লেপ্টে আছে, সেটাকে ঘুচিয়ে নিজেদের পরিসরটাকে আরও খানিকটা বাড়ানো যায়— যদি ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের সাংস্কৃতিক মতাদর্শগত যোগাযোগের দাবিটাকে আরও একটু জোরালো করা যায়—এমন কোনো ভাবনা কাজ করতে পারে।
আসলে সবটাই নিজেদের পক্ষে একটা সুবিধাজনক রাজনৈতিক ‘অপটিকস’ নির্মাণের চেষ্টা। একইভাবেই ইতিহাস ভূগোল-সমাজ সংস্কৃতি-রাজনীতি কোনও কিছুইর ধার না ধেরে, সমস্ত তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ‘রোহিঙ্গা’ বলে দাগিয়ে দিলে ঋণাত্মক রাজনীতির উলটো আরেকটা ‘অপটিক’ তৈরি হয়। সেখানে সঙ্ঘ-রাজনীতির বিরোধীদের সনাতন-বিরোধী ও ‘রোহিঙ্গা’দের মদতদাতা হিসাবে চিহ্নিত করে দিতে সুবিধে হয়। আর ভারতের ভূমিপুত্র মুসলিম সংখ্যালঘুদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে আরও বেশি বিপন্ন করে তোলা যায়। এসআরআর’র মাধ্যমে দেশ জুড়ে সেই কাজটাই সঙ্ঘের বকলমে নির্বাচন কমিশন করে চলেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও কোনও রাখঢাক না করেই বলে দিয়েছেন, তাঁর রাজ্যের ভূমিপুত্র মিয়া মুসলিমদের হেনস্তা করে চাপে রাখার জন্যই বিজেপি কর্মীরা ফর্ম ৭-এ মিথ্যে অভিযোগ জমা দিচ্ছেন! এই হিমন্তই আসামের ইতিহাসকে ‘সনাতনী’ আর ‘রোহিঙ্গা’য় ভাগাভাগি করে দেওয়ার জন্যই ১৬৭১ সালে সরাইঘাটের নৌ-যুদ্ধের ইতিহাস থেকে অহোম-রাজ লাচিত বরফুকনের সহযোগী সেনাপতি ইসমাইল সিদ্দিকি ওরফে বাঘ হাজারিকার নাম বাদ দিতে চাইছেন। তিনি বলছেন, বাঘ হাজারিকা কাল্পনিক চরিত্র। আসলে ছাত্ররা যদি পড়ে, হিন্দুরাজা লাচিত ও তাঁর ভূমিপুত্র মুসলিম সেনাপতি ইসমাইল, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হিন্দু সেনাপতি রাজা রাম হিং-এর বিপুল বাহিনীকে রুখে দিয়েছিলেন, তাহলে তো আসামের মূল মুসলিম বাসিন্দাদের বেনাগরিক বানিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াতে একটা ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই ইতিহাসটাকেই বদলে দাও।
আসলে বিজেপি দেশজুড়ে এই রাজনীতিটাই করে চলে। সেজন্যেই বঙ্গে আগাম নির্বাচনী সভা করতে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডের নামে ঘটে যাওয়া কর্পোরেট-প্রশাসনিক গণহত্যায়, রাজ্যসরকারকে পরোক্ষে ‘এসকেপ রুট’ বানিয়ে দেন। দল হিসাবে তৃণমূল কংগ্রেস, আর নেতা-মন্ত্রী-বিধায়ক, তাদের পরিচালিত পঞ্চায়েত, পৌরসভা, সরকারের রাশি রাশি দুর্নীতি, প্রশাসনিক গাফিলতি, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, চূড়ান্ত অসংবেদনশীলতাকে আড়াল করে অমিত শাহ সেই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের ধর্মীয় পরিচিতির রাজনীতিকেই সামনে নিয়ে আসেন। তাতে মমতা-সরকারের সামগ্রিক শ্রমিক-বিরোধী অবস্থানের প্রশ্নটাই লঘু হয়ে যায়। আর আমাদেরও নতুন করে উপলব্ধি হয়। খাতায়-কলমে সঙ্ঘ-পরিবারের সদস্য না হলেও ‘অপটিকস’ নির্মাণের রাজনীতিতে আরএসএস’র মানস-কন্যাও কিছু কম যান না!
Highlights
সঙ্ঘ পরিবার ও হিন্দুবাদী রাজনীতির তরফে ভারতীয় মনের এই শুদ্ধিকরণ, দখলীকরণ ও প্রয়োজনমাফিক সন্ত্রস্তকরণের কাজগুলো চালিয়ে যাওয়া হয়। আর এই মন-দখল ও দূষণের প্রক্রিয়া বা কার্যক্রমগুলো চলে বিভিন্ন স্তরে বা পর্যায়ে। একেবারে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পাড়া-প্রতিবেশী, বৈঠকখানা, রোয়াক, চায়ের দোকান থেকে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় স্তর অবধি।
Comments :0