Editorial

চুক্তি বাতিল করো

সম্পাদকীয় বিভাগ

গত প্রায় এক বছর ধরে বাণিজ্য নীতি বা শুল্কনীতি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হম্বিতম্বিতে বিশ্ববাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা নেমে এসেছিল মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তা নিমেষেই যেন কেমন ওলটপালট হয়ে গেল। ট্রাম্পের অতি উচ্চ শুল্কের চাপে এবং বাণিজ্য বন্ধের হুমকিতে অনেক দেশই কার্যত ট্রাম্পের কাছে মাথানত করে আমেরিকার সঙ্গে অসম শর্তে চুক্তি করেছে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতও দেশের স্বার্থকে ট্রাম্পের পায়ে নৈবেদ্য দিয়ে চটজলদি চুক্তি করে আহ্লাদে আটখানা হয়ে নজিরবিহীন বিরাট সাফল্য বলে জোর প্রচার শুরু করে। ইতিমধ্যে চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হবার আগেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে স্পষ্ট করে দিয়েছে এভাবে শুল্ক বৃদ্ধির অধিকারই নেই রাষ্ট্রপতির। একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসেরই সেই অধিকার আছে। বস্তুত আমদানি পণ্যে ট্রাম্পের যথেচ্ছ হারে শুল্ক বসানোকে কংগ্রেস অনুমোদন দেয়নি।
প্রসঙ্গত যে শুল্ক নীতির উপর ভিত্তি করে মোদী সরকার ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে সেই শুল্কনীতিই অবৈধ হয় তাহলে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা থাকে না। তাই বিরোধী মহল থেকে জোরালো দাবি উঠেছে অবিলম্বে এই আত্মসমর্পণকারী, দেশের স্বার্থ বিনাশকারী চুক্তি থেকে সরকার বেরিয়ে আসুক। ট্রাম্পের সামনে মাথা নিচু করে জো হুজুর হবার বদলে মাথা উঁচু করে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে চুক্তি করুক। ভারত আমেরিকার খাস তালুকের প্রজা নয়। ভারত আত্মমর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে চলা দেশ। কারও চোখ রাঙানিতে ভয় পেয়ে করুণা চায় না। চীন যদি নিজের জায়গায় দৃঢ় থেকে দে‍‌শের স্বার্থকে সুরক্ষিত রেখে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করতে পারে, ভারত পারবে না কেন? কেন ট্রাম্পের হুকুম তামিল করে সস্তায় রুশ তেল কেনা বন্ধ করে আমেরিকা থেকে বেশি দামে তেল কিনতে সম্মত হয়েছে। চীন তো ট্রাম্পের চাপ অস্বীকার করে রাশিয়া থেকে ‍‌তেল কেনায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। শী জিনপিঙ যা পারল ‘বিশ্বগুরু’ তা পারল না কেন? ট্রাম্পের ভয়ে কি ৫৬ ইঞ্চির ছাতি চুপসে গেছে?
ভারতীয় পণ্যে প্রথমে ২৫ শতাংশ চাপানোর পর রাশিয়া থেকে তেল কেনার জরিমানা হিসাবে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়। পরে ভারতকে চাপ দিয়ে এবং হুমকি দিয়ে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করে আমেরিকা থেকে তেল, গ্যাস, সমরাস্ত্র ইত্যাদি কিনতে বাধ্য করে। সেই শর্তে শুল্ক কমিয়ে করা হয় ১৮ শতাংশ। পাশাপাশি মোদী সরকারকে বাধ্য করা হয় আমেরিকার সস্তার কৃষিপণ্য ও পশুজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজার খুলে দিতে। অর্থাৎ যে সব পণ্যে একদা ভারত ৩০-৩৫ শতাংশ শুল্ক চাপাতো সেই সব মার্কিন পণ্যে মোদীরা শুল্ক তুলে দিয়েছেন। বিপরীতে যে সব ভারতীয় পণ্যে আমেরিকা ৩-৫ শতাংশ শুল্ক চাপাতো সেগুলিতে ১৮ শতাংশ চাপায়। এই অসম চুক্তিকে মোদীরা বিরাট জয় বলে প্রচার করে। এখন মার্কিন শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষিত হবার ফলে মোদীদের চুক্তিও অবৈধ ও অকার্যকর হয়ে যাবার কথা। যদিও মোদীরা তা সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে মোদীরা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে তড়িঘড়ি ট্রাম্পের কাছে দে‍‌শের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন। এটা কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যাবে না। চুক্তি বাতিল করে আত্মসম্মান ও দেশের স্বার্থ বজায় রেখে নতুন চুক্তি করতে হবে।
 

Comments :0

Login to leave a comment