দেবাশিস মিথিয়া
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ১৫ বছর পূর্তিতে সরকারি উদ্যোগে শুরু হয়েছে উন্নয়নের প্রচার। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমন কী রাস্তার হোর্ডিং— সর্বত্র উন্নয়নের ফিরিস্তি। সেই ফিরিস্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’। নামী শিল্পীদের দিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালির সুরে সেই খতিয়ান গাওয়ানো হয়েছে, যা রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইক বাজিয়ে জনগণকে কার্যত জোর করে শোনানো হচ্ছে। এমনকি প্রথম সারির দৈনিকগুলোতেও প্রকাশিত হয়েছে চোখ ধাঁধানো পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন। এই ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ পাঠ করলে বা শুনলে মনে হবে রাজ্যের মানুষের হাতে কাজ, পেটে ভাত আর মাথার উপর ছাদ— কোনো কিছুরই আজ আর অভাব নেই। সরকারের দাবি অনুযায়ী, রাজ্য এখন দারিদ্র ও অশিক্ষার অন্ধকার কাটিয়ে এক অভাবনীয় সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। কোটি কোটি উপভোক্তার পরিসংখ্যান আর হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের খতিয়ানে এক উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ বাংলার ছবি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞাপনের এই ঝকঝকে পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির লম্বা তালিকা। যখন সাফল্যের দাবি কেবল সংখ্যাতত্ত্বের ফ্রেমে বন্দি হয় এবং প্রকৃত উপভোক্তার বদলে এক শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘সিন্ডিকেট’ চক্রের পকেটে জনহিতকর প্রকল্পের সুফল পৌঁছাতে থাকে, তখন সেই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কাছে এক নিষ্ঠুর প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা স্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে যেভাবে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে,তা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। একদিকে সরকারি বিজ্ঞাপনে উন্নয়নের ঢালাও প্রচার চলছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন-যন্ত্রণা প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। এই বৈপরীত্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার— উন্নয়নের সুফল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছে পৌঁছালেও, আমজনতার কাছে তা পৌঁছায়নি। ফলে তথাকথিত এই উন্নয়নের জোয়ার প্রান্তিক মানুষের জীবনে কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা বনাম রেশন বণ্টন কেলেঙ্কারি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রচারপত্রে ‘খাদ্য সাথী’ প্রকল্পকে এক অনন্য সাফল্য হিসাবে তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, রাজ্যের প্রায় ৯ কোটি মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় খাদ্য সুরক্ষা পাচ্ছেন এবং ‘দুয়ারে রেশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে ৭.৫ কোটি উপভোক্তার ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যানের সেই উজ্জ্বল খতিয়ান আজ রেশন কেলেঙ্কারির কালিমায় লিপ্ত। বাস্তবে এই বিভাগটিই রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি-র তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য সাথী প্রকল্পের আড়ালে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার রেশন বণ্টন কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছে। যেখানে গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ উন্নত মানের সরকারি চাল ও গম অসাধু মিল মালিকদের সহায়তায় খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। বিনিময়ে সাধারণ মানুষকে রেশনের দোকানে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এই দুর্নীতির গভীরতা এতটাই যে, রাজ্যের তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে এই মামলায় জেলে যেতে হয় । তাঁর ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে।
বিজ্ঞাপনে ৯ কোটি উপভোক্তার গাণিতিক সাফল্য দাবি করা হয়েছে, কিন্তু আধার কার্ডের সাথে রেশন কার্ড সংযোগ প্রক্রিয়া শুরু হতেই প্রকাশ্যে আসে— রাজ্যে প্রায় ১ কোটিরও বেশি ভুয়া রেশন কার্ড চালু আছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই বিপুল সংখ্যক কাল্পনিক গ্রাহকের নামে টন টন রেশন সামগ্রী তোলা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে সরাসরি চলে গেছে পাচারকারীদের হাতে।
অন্যদিকে, ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্পটিকে বিজ্ঞাপনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে প্রচার করা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ছিল বিশৃঙ্খলায় ভরা। উপযুক্ত পরিকাঠামো ও ডিলারদের সাথে সমন্বয়ের অভাবে এই প্রকল্প শুরু থেকেই আইনি জটিলতার মুখে পড়ে। রেশন ডিলারদের বড় একটি অংশ এই পরিকল্পনার অবাস্তবতার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ সময়মতো বা সঠিক ওজনে তাঁদের প্রাপ্য রেশন পাননি।
‘খাদ্য সাথী’ কাগজে-কলমে জনমুখী হলেও তা আজ সিন্ডিকেট রাজ আর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকার। ক্যাবিনেট পর্যায় থেকে নিচুতলা পর্যন্ত এই দুর্নীতি এতটা সংঘবদ্ধ যে সাধারণের প্রাপ্য আজ ব্যক্তিগত মুনাফার উৎসে পরিণত হয়েছে। তাই উন্নয়নের রঙিন বিজ্ঞাপন দিয়ে দুর্নীতির এই বিশাল পাহাড়কে আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
আবাস ও ১০০ দিনের কাজ: স্বজনপোষণ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞাপনে ‘আবাসে ভরসা’ এবং ১০০ দিনের কাজে বিপুল সাফল্যের দাবি করা হলেও, গ্রামীণ অর্থনীতির এই দুই মূল স্তম্ভ আজ কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ও দুর্নীতির গোলকধাঁধায় বন্দি। এই সঙ্কটের মূলে রয়েছে প্রকল্পের নাম ও লোগো নিয়ে চলা এক অদ্ভুত ‘ব্র্যান্ডিং যুদ্ধ’। কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘PMAY’-কে ‘বাংলা আবাস যোজনা’ এবং ‘MGNREGA’-কে নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ে প্রচার করার জেদ কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি বিবাদ উসকে দিয়েছে। একদিকে কেন্দ্রের দাবি— সিংহভাগ তহবিল তাদের হওয়ায় লোগো ব্যবহার বাধ্যতামূলক; অন্যদিকে রাজ্যের যুক্তি— পরিকাঠামোর দায়ভার তোতাদেরই। এই রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির চূড়ান্ত মাশুল দিচ্ছে গ্রামের গরিব মানুষ; বরাদ্দ বন্ধ হওয়ায় সরাসরি টান পড়েছে শ্রমিকের পকেটে।
আবাস যোজনার ক্ষেত্রে ১ কোটি পরিবারের বাসস্থানের দাবি করা হলেও বাস্তবের চিত্রটি বেশ করুণ। ২০২২-২৩ সালের তদন্তে দেখা গেছে, যোগ্য প্রাপকদের বঞ্চিত করে তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন পঞ্চায়েত স্তরের প্রভাবশালী নেতা ও তাঁদের আত্মীয়রা। বীরভূম, মালদা বা দুই ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, প্রকৃত গৃহহীনরা যখন ত্রিপল টাঙানো মাটির ঘরে ধুঁকছেন, তখন পাকা বাড়ির মালিকদের নাম উঠেছে তালিকায়। দুর্নীতির গভীরতা এতটাই যে, কেন্দ্রীয় নজরদারির চাপে সরকার প্রায় ১১ লক্ষ ভুয়া নাম বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে— যা গোটা প্রক্রিয়ার ব্যাপক জালিয়াতিকেই তুলে ধরে।
একইভাবে, ১০০ দিনের কাজের সাফল্যের দাবির পেছনেও লুকিয়ে আছে ‘ভুয়া মাস্টার রোল’ আর কাজ না করিয়েই কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাতিষ্ঠানিক কারচুপি। কেন্দ্রীয় রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েক হাজার কোটি টাকার হিসাব না মেলায় বরাদ্দ থমকে গেছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন প্রান্তিক শ্রমিকরা। পরিশেষে, এই ‘ক্রেডিট পলিটিক্স’ আর তৃণমূল স্তরের দুর্নীতির জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের উন্নয়ন আজ কার্যত স্থবির। বিজ্ঞাপনী সাফল্যের জেল্লা দিয়ে এই দুর্নীতির পাহাড় আর রাজ্যের ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝাকে কি আড়াল করা সম্ভব?
শিক্ষা: ‘সাফল্য’ বনাম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনে ঘটা করে প্রচার করা হয়েছে—গত ১৫ বছরে কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী ও মেধাশ্রীর মাধ্যমে প্রায় ৯.১১ কোটি শিক্ষার্থী আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া শিক্ষক নিয়োগের নজিরবিহীন জালিয়াতি। ওএমআর শিট বিকৃত করে মেধার বদলে টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রির এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ইতিহাসের বৃহত্তম কলঙ্ক। দুর্নীতির দায়ে প্রাক্তন শিক্ষা মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য—সবাইকে শ্রীঘরে যেতে হয়েছে। জেল খেটেছেন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব শীর্ষকর্তাই। প্রাক্তন শিক্ষা মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠর আবাসন থেকে উদ্ধার হওয়া পাহাড় প্রমাণ নগদ টাকা ও সোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—শিক্ষার আঙিনায় মেধা আজ ব্রাত্য। যখন অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে ক্লাসরুম তুলে দেওয়া হয় আর যোগ্য প্রার্থীরা বছরের পর বছর রাজপথে ধরনায় বসেন, তখন সেই সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষার গুণগত মান রসাতলে যেতে বাধ্য।
এই অব্যবস্থাপনারই আধুনিক সংস্করণ ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প। ট্যাব কেনার জন্য বরাদ্দ ১০,০০০ টাকা আজ সাইবার দুর্নীতির গ্রাসে। হাজার হাজার প্রকৃত পড়ুয়ার প্রাপ্য অর্থ প্রশাসনিক পোর্টাল থেকে পাচার হয়ে গেছে ভিনরাজ্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। সরকারি ডেটাবেসে ঢুকে তথ্য বদলানোর এই কারসাজি প্রশাসনিক যোগসাজশ ও পরিকাঠামোগত গাফিলতি ছাড়া অসম্ভব।
অন্যদিকে, মিড ডে মিলের চাল ও টাকা উৎসবের খাতে খরচ করার যে অভিযোগ‘সিএজি’ রিপোর্টে উঠে এসেছে, তা উন্নয়নের দাবিকে সরাসরি খারিজ করে দেয়। বহু বিদ্যালয়ে আজও ন্যূনতম শৌচাগার বা পানীয় জলের অভাব প্রকট। বিজ্ঞাপনে দেওয়া ৯.১১ কোটির সংখ্যাটি আসলে কিছু খণ্ডকালীন অনুদানের যোগফলমাত্র, যা দিয়ে নড়বড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত স্বাস্থ্যের বিচার চলে না । যোগ্য শিক্ষকহীন স্কুলে সাইকেল বা নগদ টাকা বিলি করে আর যাইহোক, ভবিষ্যৎ ‘মানবসম্পদ’ তৈরি করা সম্ভব নয়। শিক্ষক নিয়োগ যেখানে কলুষিত, সেখানে সাফল্যের এই ঢালাও প্রচার আসলে এক অন্তঃসার শূন্য রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন মাত্র।
স্বাস্থ্য: বিমা জালিয়াতি ও চিকিৎসা-বিপর্যয়
সরকারি প্রচারপত্রে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পকে বৈপ্লবিক সাফল্য হিসাবে দাবি করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৮.৭২ কোটি মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসার নিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু এই জনপ্রিয় প্রকল্পের আড়ালে আজ এক গভীর বিমা জালিয়াতির চক্র সক্রিয়। সরকারি এই ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য বেসরকারি নার্সিংহোম ও হাসপাতাল ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারিতে লিপ্ত। ‘ঘোস্ট পেশেন্ট’ বা কাল্পনিক রোগী সাজিয়ে, সামান্য উপসর্গকে জটিল অস্ত্রোপচার দেখিয়ে কার্ড সোয়াইপ করিয়ে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। একই ব্যক্তির শরীরে একই সময়ে একাধিক কাল্পনিক অপারেশনের বিল জমা দেওয়ার মতো বিচিত্র জালিয়াতিও আজ নজরে আসছে। ফলে একদিকে যেমন সরকারি তহবিলে টান পড়ছে, অন্যদিকে বকেয়া না পেয়ে নামী হাসপাতালগুলো এই কার্ড নিতে অস্বীকার করছে— যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে অসহায় রোগীদের। এমনকি মেডিক্যাাল কলেজের সংখ্যা বাড়লেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যের মান বদলায়নি; বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে গ্রাম থেকে শহরে ‘রেফার’ করে দেওয়ার এই সংস্কৃতি আজও সাধারণ মানুষের কাছে এক অভিশাপ।
পরিকাঠামো: সিন্ডিকেট রাজ ও কাটমানি সংস্কৃতি
রাজ্যের পরিকাঠামো নির্মাণের সাফল্যের দাবিটিও আজ ‘সিন্ডিকেট রাজ’ ও দুর্নীতির ছায়ায় ম্লান। নতুন রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণের দীর্ঘ খতিয়ান বিজ্ঞাপনে থাকলেও মাঠপর্যায়ে কাজের গুণগত মান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নির্মাণের প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘কাটমানি’ এবং প্রিয়ভাজন ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোর স্থায়িত্ব—দুই-ই আজ তলানিতে।
উন্নয়নের এই বিশাল ছবি আসলে এক ভঙ্গুর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক ইমারত। যেখানে সিন্ডিকেট রাজের জেরে নির্মাণের মান বজায় থাকে না এবং প্রতিটি ইটের ওপর দুর্নীতির ছায়া থাকে, সেখানে কেবল সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন বিচার করা সম্ভব নয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তদারকির অভাবই সরকারের দাবি করা সাফল্যকে সাধারণ মানুষের কাছে অধরা করে রেখেছে।
দুর্নীতি ও অপুষ্টির সমীকরণ: পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে একটি বিশ্লেষণ
দুর্নীতির সঙ্গে ক্ষুধার তীব্রতা বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক আজ গবেষণায় প্রমাণিত। কোনও দেশ বা রাজ্যের‘কোরাপশন পারসেপশন ইনডেক্স’ বা দুর্নীতি সূচকের নিম্নমান যেমন সেখানে চরম দুর্নীতির পরিচায়ক, ঠিক তেমনই ক্ষুধা সূচকের উচ্চমান সেখানে ক্ষুধার ভয়াবহ তীব্রতাকে নির্দেশ করে। ‘কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড’ ও ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্নীতি সূচক এবং ক্ষুধা সূচকের মধ্যে সহপরিবর্তন গুণাঙ্কের সাংখ্যমান মাইনাস ০.৭৩। অর্থাৎ, গাণিতিকভাবে এটি স্পষ্ট যে যে দেশ বা রাজ্যে দুর্নীতি কম, সেখানে ক্ষুধার তীব্রতাও কম। ভারতে বর্তমানে দুর্নীতি সূচকের মান উদ্বেগজনকভাবে কম এবং ক্ষুধা সূচকের মান অনেকটাই বেশি, যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে ‘ক্ষুধা ও অপুষ্টি’ দূরীকরণ কর্মসূচিতে দুর্নীতিই ভারতের ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমার পথে সব থেকে বড় অন্তরায়।
পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সূচকেও এই বিপরীতমুখী সহ-সম্পর্ক এক ভয়ঙ্কর সত্য হিসাবে ফুটে উঠেছে। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস – ৫) অনুযায়ী, রাজ্যে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টিরহার ২০.৩%, যা জাতীয় গড় (১৯.৩%)-কেও ছাড়িয়ে গেছে। জাতীয় স্তরে পুষ্টির সামান্য উন্নতি হলেও পশ্চিমবঙ্গের এই পিছিয়ে পড়ার মূলে রয়েছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব। বিশেষ করে রেশন ব্যবস্থাও মিড ডে মিলের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের থালা থেকে ন্যায্য পুষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। যখন সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় ‘লিকেজ’ বা অর্থের অপচয় ঘটে, তার সরাসরি বিষময় প্রতিফলন ঘটে রাজ্যের ৭১.৪% শিশুর রক্তাল্পতার ভয়াবহ পরিসংখ্যানে। সুতরাং, দুর্নীতির সূচকে রাজ্যের অবনমন কেবল কোনো আর্থিক অপরাধ নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথে এক দুর্ভেদ্য বাধা। যতক্ষণ না এই প্রশাসনিক দুর্নীতি দমন করা যাচ্ছে, ততক্ষণ কেবল বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুধার তীব্রতা কমানো সম্ভব নয়।
গবেষণার শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকল্পগুলো পরিকল্পনার দিক থেকে সময়োপযোগী হলেও, তার ‘বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া’ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত। বিজ্ঞাপনে যে সংখ্যাতত্ত্বকে সাফল্য হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা আসলে একটি সুসংগঠিত ‘রাজনৈতিক সিন্ডিকেট’ এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির’ বিশাল পর্বতকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। সরকারের নীতি যখন যোগ্যতার বদলে দলীয় আনুগত্য ও টাকার দ্বারা চালিত হয়, তখন জনকল্যাণের উদ্দেশ্যটি গৌণ হয়ে দাঁড়ায়।
Highlights
প্রকৃত উন্নয়ন কেবল সাইকেল প্রদান, নগদ অর্থ বিলি কিংবা কতটা পিচ-ঢালা রাস্তা হয়েছে তা নয়। তা নির্ভর করে একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর। পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন তাই কেবল বিজ্ঞাপনের রঙিন পাতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম ও বঞ্চনার বাস্তবতার সাথে বিশাল ব্যবধান তৈরি করেছে।
Post Editorial
দুর্নীতি ঢাকতেই কি উন্নয়নের পাঁচালি
×
Comments :0