অমিত সরকার
যেদিন সংবাদমাধ্যমকে সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবত বললেন, ভাষা দিয়েই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে হবে, ঠিক সেইদিনই মুসলিমদের দিকে তাক করে আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার রাইফেল ধরার ছবি প্রকাশিত হলো সোশাল মিডিয়ায় ও সংবাদমাধ্যমে। এতেই স্পষ্ট হয়ে গেল, আরএসএস এবং বিজেপি কত নিবিড় পারস্পরিক হিন্দুত্বের বন্ধনে বাঁধা। ঠিক তার আগের দিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, আমেরিকার স্বার্থে বশ্যতার বাণিজ্যচুক্তিতে সই করেছে মোদী সরকার। অথচ তার পরদিন অনুপ্রবেশের কথা তুলছেন ভাগবত কিংবা রাইফেল তাক করছেন হিমন্ত, তখন এই বশ্যতার চুক্তি নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না মোহন ভাগবত কিংবা হিমন্ত বিশ্বশর্মা, বলার কথাও অবশ্য নয়। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে আরও প্রমাণিত হলো বিজেপি ও আরএসএস’র সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বোঝাপড়া কত গভীর। অর্থাৎ ভাগবত ও হিমন্ত, মোদী, যোগী, অমিত শাহের মতোই ফ্যাসিবাদী ধরনের হিন্দুত্ব এবং দেশি-বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের জোটের এক একটা বিশ্বস্ত মুখ।
এরই মধ্যে ইদানীং নগ্ন ও হিংস্র সাম্প্রদায়িকতার প্রচারে এমনকী যোগীকেও পিছনে ফেলে দিচ্ছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী। কারণ, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। এবং ভোটে জিততে হিমন্তের হাতে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া আর কোনও হাতিয়ার নেই। আসামে শহুরে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারির হার চলতি অর্থ বর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ছিল ২৭.৫ শতাংশ। ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী, ওই মাস পর্যন্ত রাজ্যে কর্মপ্রার্থী শিক্ষিত যুবকের সংখ্যা ছিল ২১ লক্ষ ৩১ হাজার। রাজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ কৃষি পড়েছে রয়েছে সেই বৃষ্টি নির্ভর চাষের যুগে। পরিকাঠামো বেহাল। তাই শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নেই। সে কারণে রাজ্যে চাকরি নেই। বাড়ছে পরিযায়ীদের সংখ্যা। সরকারের অযোগ্যতা ও অপদার্থতা তো আছেই। এর ওপর নিজের স্ত্রী ও পরিবারের নামে জমি কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হিমন্ত। বিরোধীদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত। সব মিলিয়ে হিমন্তের ওপর ক্ষুব্ধ আসামের মানুষ। হিমন্তের শাসনে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে আসাম। এইপরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ইস্যুতে ভোট হলে আসন টলমলো হবে বিজেপি’র। আসাম হাতছাড়া হলে আলগা হয়ে পড়বে উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে বিজেপি’র মুঠো। সুতরাং যে কোনও উপায়ে ভোটে জেতার লক্ষ্য নিয়ে আরএসএস’র মদতে উগ্র এবং নগ্ন সাম্প্রদায়িকতাকেই হাতিয়ার করেছেন হিমন্ত। হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের আগুনে আসামকে ছারখার করে দিতে চাইছেন তিনি। এর প্রমাণ এখন প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে। আসলে আরএসএস’র মদতে উগ্র ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও অসমীয়া জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে আসামে নির্বাচনে জয়ী হতে চায় বিজেপি। তাই প্রধান শত্রু বা ‘অপর’ বানাতে হবে বাংলাভাষী ও মুসলিমদের।
ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, সারা দেশে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিজেপি’র অন্যতম হাতিয়ার হলো ভোট চুরি। সেই ফর্মুলাই আসামে কাজে লাগাচ্ছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এবং তিনি এতটাই বেপরোয়া যে,সংবিধান ও আদালতের তোয়াক্কা না করে সরাসরি বলছেন যে তিনি মিঞাদের ভোট চুরি করছেন এবং করবেন। এ বছরের ২৫ জানুয়ারি হিমন্ত বলেন, অসমে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে কোনও গোলমাল হয়নি। তাঁর কথায়, ‘কোন হিন্দু নোটিস পেয়েছেন? কোন অসমীয়া মুসলিম নোটিস পেয়েছেন? নোটিস গেছে শুধু মিঞাদের কাছে, এই ধরনের আরও লোকের কাছে। না হলে ওরা আমাদের মাথায় চেপে বসবে। আমরা ওদের ওপর কিছু উৎপাত করব, তবে আইনের চৌহদ্দিতে থেকে।’ ২৭ জানুয়ারি হিমন্ত আরও বলেছেন, ‘আসামে এসআইআর যখন হবে তখন চার থেকে পাঁচ লক্ষ মিঞার নাম বাদ দেওয়া হবে।’ তাঁর খোলাখুলি হুঁশিয়ারি, ‘ভোট চুরি মানে আমরা মিঞাদের কিছু ভোট চুরির চেষ্টা করছি। ওদের আসামে ভোট দিতে দেওয়া উচিত নয়। ওদের বাংলাদেশ পাঠিয়ে দিতে হবে।’ ২৮ জানুয়ারি তিনি আবার বলেন, ‘কেউ কোনও ভাবে মিঞাদের হেনস্থা করলে করতে পারে। যদি রিকশাভাড়া ৫ টাকা হয় তাহলে ৪টাকা দিতে হবে ওদের। ঝামেলায় পড়লেই ওরা আসাম ছাড়বে।’ (সূত্র: Himanta Sarma’s hate speech is more divisive than the UGC regulation. Will the Supreme Court stop him? Feb 02, Ajaj Ashraf, 2026, Frontline) ।
ওপরে উদ্ধৃত করা হিমন্তের বক্তব্যগুলি থেকে স্পষ্ট, হিন্দু ও অসমীয়া জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে এবং বিভাজনের রাজনীতির সাহায্যে বাংলাভাষী ও সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্ন করে বিধানসভা নির্বাচন জেতার ভাষ্য তৈরি করেছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা।
তবে হিমন্ত ও বিজেপি শুধু ভাষ্য তৈরিতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। সত্যি সত্যিই ভোটার তালিকা থেকে যাতে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়া যায় সেই পরিকল্পনাও রচনা করেছেন তাঁরা। ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর আসামের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়। ততদিন পর্যন্ত বিজেপি নীরব ছিল। খসড়া তালিকা প্রকাশিত হওয়া মাত্র এই দলের নেতারা লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আপত্তি জানাতে শুরু করেন। বিজেপি’র একজন বিএলএ কয়েকশো ভোটারের নাম বাতিলের লক্ষ্যে আপত্তি জানান। অভিযোগ, তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার কাজে বিজেপি’র লোকেদের সঙ্গে আঁতাত তৈরি করছে নির্বাচনী আধিকারিকদের একাংশ। বিজেপি বিশেষভাবে টার্গেট করছে সেই সব বিধানসভা কেন্দ্রকে যেগুলিতে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৭০ শতাংশ। এ জন্য তারা সব ধরনের অবৈধ ও গোপন পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে। বিভিন্ন লোকের এপিক ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তাদের অজ্ঞাতেই হাজার হাজার আপত্তি নথিভুক্ত করেছে বিজেপি। এরপর যখন সংশ্লিষ্ট লোকেরা জানতে পারেন যে বিজেপি কায়দা করে তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য অবৈধভাবে তাদের নাম ব্যবহার করেছে, তখন তারা প্রকাশ্যে আপত্তি জানান এবং কমিশনকে লিখিতভাবে বলেন যে আপত্তি জানানোর জন্য তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বিনা অনুমতিতেই। এক জায়গায় মৃত জানিয়ে এক বিএলও’র নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়। অথচ পরে কমিশন সেই বিএলও-কেই শুনানির জন্য ডেকে পাঠায়। তার মানে পেশ হওয়া আপত্তির নথি যাচাই না করেই কমিশন লোকজনকে শুনানিতে ডাকছে। এবং তার ফলে সংখ্যালঘু ভোটারদের রাত পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। এবং অভিযোগ, সবটাই হচ্ছে কমিশনের একাংশ আধিকারিক ও বিজেপি’র যোগসাজশে। করিমগঞ্জ জেলার কয়েকজন বিএলও ভোটচুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আনায় সুমনা চৌধুরি নামে একজন বিএলও-কে চাকরি থেকে বরখাস্ত করছেন জেলাশাসক। ইতিমধ্যে ডি ভোটারদের বাদ রেখে আসামে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন। তালিকা থেকে নাম বাদ গেছে আড়াই লক্ষ ভোটারের। আশঙ্কামতো মুসলিম নিবিড় জেলাগুলিতেই সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
হিমন্তের নেতৃত্বে বিজেপি’র এই বিভাজনের রাজনীতি প্রয়োগর ফল হয়েছে মারাত্মক। এ বছরের জানুয়ারিতে ইন্ডিয়া টুডে -সি ভোটার যৌথভাবে একটি মুড অব দ্য নেশন সমীক্ষা করে। তাতে উঠে এসেছে, আসামের ৪৯.৩ হিন্দু উত্তরদাতা মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে গোলমাল কিছু হয়নি। মুসলিমদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ এমনটা মনে করছেন। ৪৫.৭ শতাংশ মুসলিম মনে করছেন ভোটার তালিকা সংশোধন স্বচ্ছভাবে করা হয়নি। হিন্দুদের মাত্র ২৬.৭ শতাংশ মনে করছেন তালিকা সংশোধন ঠিকভাবে করা হয়নি।
মনে রাখা দরকার, আসামের জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ মুসলমান। এঁরা মূলত ছড়িয়ে রয়েছেন নিম্ন আসামের জেলাগুলিতে। এদেরই ৪৫.৭ শতাংশ মনে করছেন ভোটার তালিকা সংশোধন ঠিকভাবে করা হয়নি। হিন্দু ভোটাররা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬১ শতাংশ। এরা মূলত বিজেপি’র সমর্থক। এদের ৪৯.৩ শতাংশই মনে করছেন ভোটার তালিকা সংশোধনে কোনও ভুল হয়নি। এর মানে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই আসামের জনমানস আড়াআড়ি দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এবং সেটাই আরএসএস ও হিমন্ত চাইছেন। তালিকা সংশোধন নিয়ে মত দিতে চাননি হিন্দু জনসংখ্যার ২৪.৫ শতাংশ এবং মুসলিম জনসংখ্যার ২৪.৩ শতাংশ। এর মানে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বিতর্কিত ইস্যুতে অবস্থান নিতে চাইছেন না। সব মিলিয়ে আরএসএস’র রাজনীতির প্রভাবে আসামে সামাজিক ঐকমত্যের অভাব ঘটছে এবং আসাম হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরিচিতি সত্তার রাজনীতির আরেকটা যুদ্ধক্ষেত্র।
তবে বিষয়টা একতরফা ঘটছে না। হিমন্তের বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বামেরা। বিরোধিতায় নেমেছে রাজ্যের বিরোধী দলগুলিও। সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক মন্তব্য করার জন্য হিমন্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছেন সিপিআইএম ও সিপিআই নেতৃত্ব। এবিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সিপিআইএম (এম)’র সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি ভিডিও বার্তায় বলেছেন, আসামে তীব্র মুসলিম বিরোধী প্রচার চালাচ্ছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এর সর্বশেষ নিদর্শন মুসলিমদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার ভিডিও। বেবি অভিযোগ করেছেন, গুজরাট মডেলে আসামে অশান্তি বাধানোর চেষ্টা করছেন হিমন্ত। গোলমাল বাধার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা উচিত। আসামের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হীরেন গোঁহাই সহ ২৪ জন ব্যক্তিত্ব হিমন্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। এছাড়াও হিমন্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জং, জন দয়াল, রূপরেখা ভার্মা সহ ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। ফলে হিমন্তের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে বাম সহ দেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিও প্রবল বিরোধিতা গড়ে তুলছে। এই চাপের মুখে পিছু হটে হিমন্তের ভিডিও প্রচারের জন্য দলেরই কয়েকজন নেতাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হয়েছে বিজেপি। এর অর্থ, জনমতের চাপে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে হচ্ছে হিমন্তকে।
আসলে হিমন্ত বিশ্বশর্মা এত প্রবলভাবে হিন্দুত্বের ইস্যুতে ভোট করাতে চাইছেন কারণ তাঁর হাতে অন্য কোনও ইস্যু নেই। এটা যেমন বিজেপি’র চূড়ান্ত রাজনৈতিক দুর্বলতা, একইসঙ্গে চূড়ান্ত রাজনৈতিক অবস্থানও। কিন্তু আসামের সচেতন, গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন ভোটদাতারা এই ষড়যন্ত্রের পা দেবেন সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারছেন না হিমন্ত। সে কারণেই তাঁর অবস্থান এতটা লাগামছাড়া।
Comments :0