HIGH COURT PANDEMONIUM

হাইকোর্টে হামলা, মিল উন্মত্ত ভিড়তন্ত্রে

রাজ্য বিশেষ বিভাগ

প্রতীম দে

প্রবীণ আইনজ্ঞরাও কলকাতা হাইকোর্টে ঘটনা নজিরবিহীন। আদালতকে সন্ত্রস্ত করার এমন প্রবণতা পড়েছে প্রতিবাদের মুখেও। ঘটনাক্রম দেখাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের এমন সক্রিয়তা দেশ বা বিশ্বের নিরিখে বিচ্ছিন্ন নয়।   

২০০৭ সাল। রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে বিধানসভায় চললো ভাঙচুর। 

২০২২ সাল। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের মদতে বিচার ব্যবস্থার ওপর চলছে লাগাতার আক্রমণ।

২৪ নভেম্বর বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘আমি বিধানসভা মারফত আদালতকে অনুরোধ করব যাতে মানুষের সুবিধে হয় ... বিচারের বাণী যেন নীরবে নিভৃতে না কাঁদে’’। 

নভেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রী এই কথা বলেন। তার ঠিক দুই মাসের মধ্যে বিচারপতি রাজ শেখর মান্থার বাড়ির সামনে পড়লো পোস্টার। আদালতে তাঁর এজলাসের সামনে দেখানো হলো বিক্ষোভ। একটা গোটা দিন কাজ বন্ধ রইলো কলকাতা হাই কোর্টের। বিচার না পেয়ে বাড়ি ফিরলেন অনেক সাধারণ মানুষ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী এবং তার সরকার চুপ করে রইলেন। 

শুধু কি রাজশেখর মান্থা। না। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু কেন বার বার আক্রমণের শিকার হচ্ছে বিচার ব্যবস্থা? শাসক দলের একের পর দূর্নীতির বিরুদ্ধে যেই মামলা হয়েছে তার জন্য কি এই আক্রমণ? প্রশ্ন অনেক কিন্তু কোন উত্তর নেই।

গত বছর এপ্রিল মাসে রাস্তায় বসে থাকা চাকরি প্রার্থীদের মামলা যখন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে ওঠে তখনও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কলকাতা হাই কোর্টে চত্বরে। তারপর সেই মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিলে তদন্তে দেখা যায় এসএসসি নিয়োগ দূর্নীতির সাথে সরাসরি যুক্ত রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী। 

কেন বিচারপতি মান্থার ওপর এই আক্রমণ? বিচারপতি মান্থা অভিষেক ব্যানার্জির শ্যালিকাকে সুরক্ষা কবচ দেননি বলে? নাকি শুভেন্দুকে সুরক্ষা করচ দিয়েছেন বলে?

সোমবার তৃণমূলপন্থী আইনজীবীরা বিচারপতি মান্থার এজলাস বয়কটের ডাক দেন। একজন বিচারপতির এজলাস কি ভাবে বয়কট করা যেতে পারে তা এখনও পর্যন্ত ভারতীয় সংবিধানে উল্লেখিত নয়। তাদের হই হট্ট গোলের জেরে এজলাসে ঢুকতে বাঁধা পান বিচারপতি মান্থা এবং আইজীবীরা। পরে প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তবের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। উল্লেখ্য এজি সৌমেন্দ্রনাথ মুখার্জি বিক্ষোভে আপত্তি জানালেও বিক্ষোভ দেখান আইনজীবীদের একাংশ। 

আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘বিচার ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ সম্পূর্ন ভাবে ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ। গনতান্ত্রিক দেশে এই ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। আদালতের রায়কে মান্যতা দেওয়া দরকার। রায়ের বিরুদ্ধে তাকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিসন বেঞ্চ বা উচ্চ আদালতে যে কেউ যেতে পারে। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ, বিচারপতির ওপর আক্রমণ এই ধরনের নজির গোটা দেশে নেই।’’ 

আইনজীবী গঙ্গোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘‘বিভিন্ন জায়গায় শাসক দলের নেতা মন্ত্রীরা বলছে যে বামফ্রন্ট আমলে স্লোগান উঠেছিল বিচারপতি লালা বাংলা ছেড়ে পালা। আমাদের মনে রাখতে হবে বিমান বসু এই কথা কোথাও বলেননি। একটি মিছিলে এই স্লোগান ওঠে। তিনি মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন। পরে এই স্লোগানের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে এসে বসু ক্ষমাও চেয়ে যান।’’

আইনজীবী কৌস্তভ বাগচীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘রাজ্যের শাসক দল কখনই সংবিধানকে মান্যতা দেয়নি। বিচার ব্যবস্থার ওপর ভয়ের বাতাবরন তৈরি করতে চায় রাজ্যের শাসক দল। বিচারপতি মান্থা পুলিশ সংক্রান্ত আইনি মামলার শুনানির দায়িত্বে রয়েছেন। পঞ্চায়েত ভোটের আগে সাধারণ মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হবে তৃণমূলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। তার আগে আদালতের ওপর চাপ তৈরি করতে চাইছে শাসক দল।’’

বিচার ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ কি এই প্রথম? হ্যাঁ বিগত কয়েকদিন ধরে কলকাতা হাই কোর্টে যেই ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে আমাদের রাজ্যে প্রথম। কিন্তু গোটা দেশে প্রকাশ্যে এই ধরনরে কোন ঘটনা না ঘটলেও একাধিক মামলা যা শাসকের বিরুদ্ধে বা যার রায় শাসকের বিরুদ্ধে যেতে পারে সেখানে আইনজীবীদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। কাশ্মীরের কাঠুয়া ধর্ষণ মামলায় নির্য়াতীতার আইনজীবী দীপিকা সিং রাজাওয়াতকে উগ্র-দক্ষিণপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। 

বিচারপতিদের নাম মনের মতো না হওয়ায় গত বছর ২৫ নভেম্বর কলেজিয়ামের জন্য সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বিচারপতিদের যেই নামের তালিকা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল তা খারিজ করেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী। উল্লেখ্য সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম প্রথা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। কিন্তু যেই কলেজিয়াম প্রথা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন তা সংবিধান স্বীকৃত। 

কলেজিয়াম প্রথাকে মান্যতা না মানে সংবিধানকে মান্যতা না দেওয়া। 

ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রধান লক্ষ্য সব কিছুর ওপর নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করা। আর তাই লুলা রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ব্রাজিলে বলসেনারো সমর্থকদের যেই হামলা তাতে তারা হামলা চালিয়েছে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টে। কারণ লুলাকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। 

আবার আমাদের দেশে কোন বিচারপতি যদি রাম মন্দিরের পক্ষে রায় দেন তবে তাকে রাজ্যসভার সাংসদ করে কেন্দ্রের শাসক দল। 

আইনের চোখ বাঁধা। ন্যায় দণ্ডনিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। সংবিধান মেনে রায় দেয় বিচার ব্যবস্থা। আর সেই সংবিধান যদি শাসকের স্বার্থে আঘাত করে তখন তার ওপরেই নেমে আসে আক্রমণ। আক্রান্ত হয় বিচার ব্যবস্থা।

Comments :0

Login to leave a comment