সমস্ত বিরোধী দল বারবার দাবি জানালেও ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলী সামরিক আগ্রাসন তথা পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি ভারতের উপর কতখানি প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে কোনোরকম আলোচনায় মোদী সরকার যে রাজি নয়। তাই সংসদে লিখিত বিবৃতি পাঠ করে তিনি দায় এড়িয়েছেন। বিবৃতিতে উল্লিখিত বিভিন্ন প্রসঙ্গে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রশ্ন তোলা হলেও জয়শঙ্কর নীরব থেকেছেন। কিছু বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা এবং কিছু বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দাবি করা হলেও সরকার জোর করে তা এড়িয়ে গেছে।
নির্বাচনী বন্ডে কাদের টাকা, কত কালো টাকা শাসক বিজেপি’র তহবিলে ঢুকছে তা জনগণের কাছে গোপন করার পেছনে গুরুতর রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল। তাই আইন করে সেটা গোপন রাখার ব্যবস্থা করেছিল মোদী সরকার। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই আইনকে সংবিধানবিরোধী বলে বাতিল করার পর এবং কে কাকে কত টাকা দিয়েছিল সেটা প্রকাশের পর সেই ভয়ঙ্কর সত্য উন্মোচিত হয় মানুষের সামনে। দেখা যায় বন্ডের প্রায় সব টাকাই গেছে মোদী-শাহদের ঘরে। যারা অকাতরে বিজেপি-কে দান করেছে তাদের নানাভাবে সুবিধা পাইয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ প্রতিদান দিয়েছে মোদী সরকার। পিএম কেয়ারকেও একইভাবে আইনি প্যাঁচে আড়াল করা হয়েছে। কারা কত টাকা এই তহবিলে দান করেছে এবং কোথায় সেই টাকা খরচ হচ্ছে সেটা জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য বারবার দাবি করা সত্ত্বেও সরকার অস্বীকার করছে। কিছুতেই সরকার দাতাদের নাম ও খরচের তথ্য প্রকাশ করতে রাজি নয়। ভবিষ্যতে যদি কোনোদিন এটা প্রকাশ পায় তাহলে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে এখানেও ঘোটালা ছিল। অনৈতিকভাবে দান সংগ্রহ হয়েছে বা অপাত্রে অর্থ অপচয় করা হয়েছে অথবা এক্ষেত্রেও গুরুতর রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছে।
এখন পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ নিয়ে সরকারের সচেতন নীরবতা এবং সবকিছু আড়াল করার মরিয়া চেষ্টা থেকে পুরানো অভিজ্ঞতাগুলি ভেসে উঠছে। এখানেও নিশ্চয় সরকারের বা শাসক দলের গুরুতর কিছু লুকোনো জরুরি হয়ে পড়ছে। আসলে গাজায় ইজরায়েলী গণহত্যার শুরু থেকে ইরানে আগ্রাসন পর্যন্ত বিগত কয়েক বছর ধরে মোদী সরকারের অবস্থান নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তুলে দিয়েছে। প্যালেস্তাইন সমস্যার সমাধানে ভারতের আদি ও অকৃত্রিম অবস্থান। দ্বিরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সেটা বারবার উচ্চারণ করতে মোদী সরকারের প্রবল অনীহা। ট্রাম্পকে খুশি রাখতে মোদীর প্রবল ইজরায়েল প্রীতি লজ্জাজনকভাবে দৃষ্টিকটু হয়ে গেছে। গাজায় গণহত্যার তীব্র নিন্দা বা তা বন্ধ করতে সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং নেতানেয়াহু যা করছে করুক ভারত নীরবে সমর্থন দিয়ে যাবে। ট্রাম্প-নেতানেয়াহু যৌথভাবে ইরানে যুদ্ধ শুরু করলেও ভারত কার্যত নীরব। মিনমিন করে দু’-একটা শব্দ উচ্চারণ করলেও ট্রাম্প বা আমেরিকার নাম উচ্চারণ করে না। স্কুলে বোমা মেরে ১৬৫ কিশোরীকে হত্যা করল ট্রাম্পের আমেরিকা, খুন করল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে। কোনও নিন্দা নেই, প্রতিবাদ নেই। ভারত মহাসাগরে, ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িয়ে আছে যেখানে, সেখানে মার্কিন ডুবো জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে বিনা কারণে বিনা প্ররোচনায় ধ্বংস করা হলো ইরানি যুদ্ধ জাহাজ। একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি ভারত। পশ্চিম এশিয়ায় ঘনীভূত যুদ্ধ পরিস্থিতি অন্য অনেক দেশের থেকে ভারতের উদ্বেগ বেশি। কারণ ভারতের বাণিজ্যের একটা বড় অংশ জ্বালানির জোগান এই অঞ্চল নির্ভর। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে ভারত নিজের স্বার্থে গর্জে ওঠা উচিত ছিল। তা না করে মোদীরা ট্রাম্পের মুখ চেয়ে বসে আছেন। ট্রাম্পের মরজির উপর সঁপে দিয়েছেন ভারতের ভবিষ্যৎ। এহেন নগ্নতা উন্মুক্ত হবার ভয়েই সংসদে আলোচনা এড়াতে সরকার এত মরিয়া।
Modi Parliament
ফাঁসার ভয়ে এত গোপনীয়তা
×
Comments :0