মোদী জমানায় ভারতের বিদেশনীতি যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত তা এখন প্রতিদিনই নানা প্রেক্ষিতে প্রকটভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার ফলে বিশ্বে ভারতের অবস্থান শুধু নড়বড়ে হয়নি, অনেক দেশই ভারতের উপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে। সর্বোপরি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যকলাপ ও আচরণ ভারত তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কার্যত হাসির খোরাকে পরিণত করেছে। দেশের মান-মর্যাদা রীতিমতো ধুলায় গড়াগড়ি খাবার জোগাড়। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী যে মোদী সরকারের অদূরদর্শী অবাস্তব বিদেশনীতি, কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং অতিমাত্রায় নিজেদের জাহির করার লোভ সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকার কথা নয়।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দফায় সুষমা স্বরাজকে বিদেশ মন্ত্রী করা হলেও বকলমে বিদেশ মন্ত্রক চালাতেন মোদী নিজেই। পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক যে কোনও বিষয়েই কথা বলতেন মোদী। সুষমার ভূমিকা ছিল অনেকটা দম দেওয়া পুতুলের মতো। ঐ সময় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের বিষয় ছিল বিদেশ সফর। এমন কোনও মাস প্রায় ছিল না যে মাসে তিনি এক বা একাধিক দেশ সফর করেননি। কখনও কখনও এক যাত্রায় পাঁচ-সাতটা দেশও ঘুরে আসতেন। যে দেশেই যেতেন সেখানকার রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে কোলাকুলি ছিল পরিচিত ছবি। যেন অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু। তিনি নিজেও বেশিরভাগ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে দাবি করতেন। তাঁর এই কীর্তিকলাপে অন্ধ ভক্তরা প্রচারের ঢাক পিটিয়ে বলতে থাকেন আগে বেশিরভাগ দেশের মানুষ নাকি ভারতের নামই জানত না। মোদী বিশ্ব ভ্রমণ করে ভারতকে বিশ্বের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আগে নাকি ভারতকে কেউ পাত্তাই দিত না। মোদীর দৌলতে বিশ্বে ভারতের নাকি মান মর্যাদা বেড়েছে। ভারতের শক্তি ও প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে এখন নাকি সব দেশই প্রায় ভারতকে সমীহ করে। মোদী নাকি বিশ্বগুরু হয়ে উঠেছেন।
চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন চতুর্দেশীয় জোট কোয়াডে অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে আমেরিকার ছত্রছায়ায় থাকার জন্য। আমেরিকার সঙ্গে সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে ভারতকে মার্কিন আলোয় আলোকিত করতে চাইলেন। জি-২০ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে দেখাতে চাইলেন ভারত আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। বাস্তবে এসব যে নিতান্তই ফাঁকা আওয়াজ তা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায় পহেলগাম জঙ্গি হানা পরবর্তী পাক-ভারত সামরিক সংঘাত পর্বে। রীতিমতো ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে আমেরিকা। ট্রাম্প অন্তত ৪০বার দাবি করেছেন তাঁর হুমকিতে ভয় পেয়ে মোদীরা যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। এই সংঘাতে কার্যত পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প। হাজার চেষ্টা করেও মোদীর ভারতের বক্তব্যকে বিশ্বে বিশ্বাসযোগ্য করতে পারেননি। বিদেশ মন্ত্রকের কূটনৈতিক ব্যর্থতা কদর্যভাবে ধরা পড়ে। ইজরায়েল এবং দু’-একটি দেশ ছাড়া ভারতের হয়ে বিবৃতি দেয়নি। বাধ্য হয়ে ৩০টি দেশে সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়। তাতেও কাজ হয়নি। ট্রাম্পের শুল্ক আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ ভারতের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক ঘটনাক্রম চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে মোদী সরকার নতুন বন্ধু পাননি। উলটে পুরানো বন্ধুরাও দূরে সরে গেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে। একটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক নেই। ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে বিশ্বগুরু সাজতে গিয়ে এবং চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার বড় হয়ে দেশের বিদেশনীতিকে বিপজ্জনক জায়গায় নামিয়েছেন। আমেরিকার অধস্তন সঙ্গী হতে গিয়ে আম ও ছালা দু’টোই হারাতে বসেছেন।
Editorial
বিদেশনীতির বিপর্যয়

×
Comments :0