প্রবন্ধ | বিলুপ্তপ্রায় নীরবদের আর্তনাদ
সৌম্যদীপ জানা
মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ৪ জুন ২০২৬
মানুষের ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমরা রাজাদের কথা লিখেছি, সাম্রাজ্যের কথা লিখেছি, যুদ্ধের কথা লিখেছি, বিপ্লবের কথা লিখেছি। কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা তাদের কথা লিখেছি, যাদের উপস্থিতি ছাড়া আমাদের সভ্যতার ইতিহাসই সম্ভব হত না। আমরা লিখিনি সেই বনভূমির কথা, যার ছায়ায় প্রথম মানবসমাজ আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা লিখিনি সেই নদীর কথা, যার জল সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। আমরা লিখিনি সেই অসংখ্য পাখি, প্রাণী, বৃক্ষ এবং অদৃশ্য জীবের কথা, যারা কোটি কোটি বছর ধরে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলেছে।
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে যখন আমরা পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমার মনে হয়—পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো জলবায়ু পরিবর্তন নয়, বন উজাড় নয়, দূষণও নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট হল মানুষের বিস্মৃতিবোধ। আমরা ভুলে গেছি যে আমরা প্রকৃতির মালিক নই; আমরা তারই একটি অংশ মাত্র।
একসময় বাংলার গ্রামে গ্রীষ্মের দুপুরে শোনা যেত অসংখ্য পাখির ডাক। বর্ষার আগমনে ব্যাঙের সমবেত সুর যেন প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত হয়ে উঠত। গ্রামের পুকুরে মাছ ছিল, ক্ষেতের ধারে প্রজাপতি ছিল, সন্ধ্যাবেলায় জোনাকি ছিল। আজও এসব আছে, কিন্তু আগের মতো নেই। অনেক কিছুই যেন নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে। এমনভাবে হারিয়ে যাচ্ছে যে আমরা টেরও পাচ্ছি না।
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান যুগের বিশেষত্ব হল, এই বিলুপ্তির প্রধান কারণ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয় নয়; এর প্রধান কারণ মানুষ নিজেই। আমাদের উন্নয়নের ধারণা এমন এক পথে এগিয়েছে, যেখানে একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য হাজার হাজার গাছ কাটা যায়, একটি কারখানা তৈরির জন্য একটি নদীকে দূষিত করা যায়, একটি শহর সম্প্রসারণের জন্য একটি বনভূমিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই পৃথিবীর কিছু মানুষ এখনও লড়াই করে চলেছেন। এখনও কিছু বিজ্ঞানী, গবেষক এবং পরিবেশকর্মী রয়েছেন, যারা বিশ্বাস করেন যে পৃথিবীকে বাঁচানো সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছিল International Union for Conservation of Nature (IUCN)।
IUCN কোনো সাধারণ সংস্থা নয়। পৃথিবীর অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের নীরব আর্তনাদকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম এটি। যখন কোনো প্রাণীর সংখ্যা এত কমে যায় যে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, যখন কোনো উদ্ভিদ তার নিজস্ব আবাসভূমি হারাতে থাকে, তখন IUCN সেই বিপদের কথা পৃথিবীকে জানায়।
তাদের তৈরি Red List of Threatened Species কেবল একটি তালিকা নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম দলিল। সেখানে লেখা থাকে কোন প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে, কে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং কাকে হয়তো আগামী প্রজন্ম আর কোনোদিন দেখতে পাবে না।
ভাবতে অবাক লাগে, পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে যাদের সংখ্যা এখন একটি ছোট গ্রামের জনসংখ্যার থেকেও কম। এমন কিছু উদ্ভিদ রয়েছে, যারা হয়তো কয়েকটি পাহাড় বা কয়েকটি অরণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাদের হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি প্রজাতির হারিয়ে যাওয়া নয়; তাদের সঙ্গে হারিয়ে যায় কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাস, প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি।
তবে প্রশ্ন হল, আমরা কেন উদ্বিগ্ন হব?
কারণ প্রকৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। একটি গাছ কাটা পড়লে শুধু একটি গাছ হারায় না। তার সঙ্গে হারায় পাখির বাসা, কীটপতঙ্গের আশ্রয়, মাটির আর্দ্রতা এবং ভবিষ্যতের অসংখ্য বীজ। একটি প্রাণী বিলুপ্ত হলে শুধু একটি প্রাণী হারায় না; তার সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কড়িও ভেঙে যায়।
আমরা প্রায়ই মনে করি মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাস্তবে প্রকৃতিই আমাদের জীবনকে ধারণ করে রেখেছে। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে জল পান করি, যে খাদ্য গ্রহণ করি—সবকিছুর উৎস প্রকৃতি। প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না।
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, দাবানল এবং খরা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো হঠাৎ করে ঘটেনি। এগুলো বহু বছরের অবহেলা, লোভ এবং অদূরদর্শিতার ফল।
তবুও আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
যখন কোনো গ্রামে মানুষ নিজের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ করে, যখন কোনো ছাত্র তার বিদ্যালয়ে পরিবেশ সচেতনতার প্রচার চালায়, যখন কোনো পরিবার প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করে, তখন পৃথিবী একটু হলেও নিরাপদ হয়। পরিবেশ রক্ষার কাজ শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত দায়িত্বও।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই। এটি আমাদের শেখায় যে পরিবেশ সংরক্ষণ কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি একটি জীবনদর্শন। প্রকৃতিকে ভালোবাসার, তাকে সম্মান করার এবং তার সঙ্গে সহাবস্থান করার শিক্ষা।
পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী হয়তো মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না, কিন্তু তাদেরও জীবন আছে, ভয় আছে, বাঁচার আকাঙ্ক্ষা আছে। একটি বাঘ, একটি হাতি, একটি শালগাছ কিংবা একটি ছোট্ট চড়ুই—প্রত্যেকেই এই পৃথিবীর সমান অধিকারসম্পন্ন বাসিন্দা।
হয়তো ভবিষ্যতের কোনো একদিন ইতিহাস আমাদের বিচার করবে। তখন প্রশ্ন করা হবে না আমরা কত বড় শহর নির্মাণ করেছি, কত উঁচু অট্টালিকা গড়েছি কিংবা কত সম্পদ অর্জন করেছি। প্রশ্ন করা হবে—আমরা কি সেই পৃথিবীটিকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম, যা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলাম?
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই মুহূর্তে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—পৃথিবীকে কেবল ব্যবহার করব না, তাকে রক্ষা করব। কারণ প্রকৃতিকে বাঁচানো কোনো দয়া নয়; এটি আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামে International Union for Conservation of Nature (IUCN) যেমন বিশ্বের সামনে পথ দেখাচ্ছে, তেমনি আমাদের প্রত্যেককেও নিজের অবস্থান থেকে সেই পথের সহযাত্রী হতে হবে। তখনই হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি আরও সবুজ, আরও সুন্দর এবং আরও জীবন্ত পৃথিবী রেখে যেতে পারব।
দশম শ্রেণী
কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা
ডাঙ্গাপাড়া রহড়া
Comments :0