গল্প | বিসর্জন
রাহুল চট্টোপাধ্যায়
মুক্তধারা | ৪র্থ বর্ষ | ১৭ মে ২০২৬ | রাজা রামমোহন রায় ২৫৪
সেদিন ছিল বিসর্জন। দুর্গা প্রতিমা শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাবেন। চারিদিকে ঢাকা ঢোল বাদ্যি। মানুষের মনে ভক্তি আর উল্লাসের উদ্দামতা। আবার বেদনাও আছে -মা চলে যাচ্ছেন একবছরের মতো। আজ মা-ও কাঁদবেন।মায়ের চোখের জল খূঁজে পেতে ভক্তগণ একমনে তাকিয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে।
এমন উৎসবের দিনে ও পাড়ার বাঁড়ুজ্যেকুলীন পরলোকে চললেন। বয়স অবশ্য হয়েছিল বিরানব্বই। তবু কুলীন ব্রাহ্মণ, তাঁর বেঁচে থাকার দাম অনেক। বাড়ির সবাই তাই ভেঙ্গে পড়েছে, চারিদিকে কান্নার রোল। শুধু চুপচাপ বসে আছে ছোট্ট মেয়েটি।কপাল জুড়ে সিঁদুর লেপে দিয়েছে কারা।লাল শাড়িতে উজ্জ্বল চেহারা। চোখে জল নেই। আজ তার কান্না নয় , আনন্দের দিন,সতী হবে সে। মা দুর্গা যাবেন,সেও যাবে।
লোকজন জুটতে সন্ধ্যা হয়ে এল। চারিদিকে মায়ের বিসর্জনের আয়োজন। কতো মানুষ,কতো বাজনা,দেবীবরণ চলছে। তারই মাঝখান দিয়ে সরলা চলেছে মৃত স্বামীর সঙ্গে।সতী হবে।দাউদাউ আগুনে হাসতে হাসতে স্বর্গের পথে পাড়ি দেবে।
চলছে তো চলছে। গ্ৰামের মেঠো পথ। সরলার চারিদিকে
জয় জয় ধ্বনি, বাজনা বাদ্যি।সতী চলছে শ্মশান ঘাটে।
কিন্তু হঠাৎ রামরতন চিৎকার করতে করতে এসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে উঠল।
'বন্ধ করো,বন্ধ করো, হবে না সতী'
রে রে করে উঠল মানুষ। কেউ কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বললো-'ঘোর অমঙ্গল,আজ প্রতিমা বিসর্জনের লগ্নে এ কি বিপত্তি!'
রামরতন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বললো -'শোন নি তোমরা রামমোহনের কথা? ওসব সতীটতি বন্ধ হয়ে গেছে '
বলেই হ্যাঁচকা মেরে সরলার হাত ধরে তুলে দৌড়ে বেরিয়ে গ্মেঠো পথ দিয়ে। পেছনে পেছনে ছুটল ধার্মিকের দল,কেউ বা বসে পড়ল। মরদেহ মাটির রাস্তায় পড়ে রইল।
আশ্বিনের সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টি নামলো। জোর বৃষ্টি। ভিজে গেল মাঠ,ঘাট, বাদ্যি বাজনা, মরদেহ সব।
Comments :0