ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের তৃণমূল আর মানুষ বলে গণ্য করছে না, স্রেফ ভোটের সংখ্যা হিসাবে তাদের ব্লক হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন। মঙ্গলবার বহরমপুরে সিপিআই(এম) কর্মীদের একটি সভায় পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই মন্তব্য করে বলেছেন, বিজেপি’র সঙ্গে সেটিং করেই তৃণমূলও ধর্মের নামে মানুষকে ভাগাভাগি করে মেরুকরণ করতে চাইছে। এই মেরুকরণ ভাঙতেই হবে। হিন্দু-মুসলিম সবাইকে একজোট করে তৃণমূল-বিজেপি’কে পরাস্ত করতে না পারলে মুসলিম সহ কোনও অংশের মানুষের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
এদিন বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে নির্বাচনী সংগ্রামের প্রস্তুতিতে পার্টিকর্মীদের সভায় ভাষণ দেন মহম্মদ সেলিম, সিপিআই(এম) নেতা সোমনাথ ভট্টাচার্য ও জামির মোল্লা। এবারের নির্বাচনে তৃণমূল-বিজেপি বিরোধী সবাইকে একজোট করতে পারলে মুর্শিদাবাদ জেলায় বিরাট সাফল্যর সম্ভাবনা উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, জনজীবনের যে বিষয়গুলি নিয়ে মানুষ দুর্দশায় রয়েছেন ও স্থানীয় যে দাবিগুলি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলি নিয়ে সোচ্চার হয়েই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াই করতে হবে।
নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের ব্লক হিসাবে ব্যবহার করতে মরিয়া মমতা ব্যানার্জি সাম্প্রদায়িক উসকানির আড়ালে কীভাবে সংখ্যালঘুদেরই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন তার উল্লেখ করে সেলিম এদিন বলেছেন, ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখলের জন্য নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের আইন এরাজ্যের প্রশাসনকে দিয়ে চুপিসারে প্রয়োগ করিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিই। তিনিই ওয়াকফ আইনের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে বাধা দিয়ে বলেছিলেন দিল্লিতে গিয়ে প্রতিবাদ করতে। অনগ্রসর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষণের যে সুপারিশ রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন করেছিল বামফ্রন্ট সরকার তার ভিত্তিতে ওবিসি তালিকায় মুসলিমদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। মমতা ব্যানার্জি সরকারে বসেই আরএসএস’র নির্দেশে সেই তালিকা চৌপাট করে দিয়েছেন, ফলে ওবিসি সংরক্ষণের সুবিধা থেকে মুসলিমরা বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজ্যজুড়ে ধর্ম ভাষা জাতি নির্বিশেষে সমস্ত প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য সবাইকে একজোট করতে হবে।
এসআইআর নিয়ে আরএসএস-বিজেপি’র সঙ্গে তৃণমূলের সেটিং নিয়ে অভিযোগ করে সেলিম বলেছেন, আরএসএস’র অ্যাজেন্ডা পূরণের জন্য নির্বাচন কমিশন এসআইআর নামিয়ে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। ৬১ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ রেখে রাজ্যে কোনও নির্বাচন হতে পারে না। রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক আধিকারিকরাও দায়ী এই পরিস্থিতির জন্য। জেলা, ব্লকস্তরে এই আধিকারিকরাই ইচ্ছাকৃতভাবেই সব তথ্য আপলোড করেননি। যাঁদের নাম ডিলিট করেছে তাঁদের অনেকেই প্রকৃত ভোটার। ভোটার তালিকায় এখনও অনেক মৃত ও ভুয়ো ভোটারের নাম আছে। অথচ নতুন ভোটারদের, বংশ পরম্পরায় এখানে বসবাস করেন এমন ভোটারদের নাম নেই। বিজেপি আর তৃণমূল মিলেমিশে এমন তালিকা তৈরি করেছে। আরএসএস’র বই থেকে শব্দ তুলে এনে নির্বাচন কমিশন এসআইআর করেছে। রোহিঙ্গা জেহাদী বাংলাদেশি বলে চিৎকার করেছিল বিজেপি। এখন সেগুলিকেই বৈধতা দিতে নেমেছে নির্বাচন কমিশন। আমরা জ্ঞানেশকুমারকে জানিয়ে দিয়ে এসেছি ৬১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ রেখে নির্বাচন করা যাবে না।
সেলিম আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ‘বিচারাধীন’ বলে রাখা হয়েছে, ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও কাজে নাম নথিভূক্তকরণে তাঁদের কারো কারো আবেদন খারিজ করা হয়েছে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। কেন, কোন আইনে রাজ্য সরকারের প্রশাসন এই স্পর্ধা দেখিয়েছে? মানুষকে অধিকারহীন করার চক্রান্তে এভাবেই কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল মিলিতভাবে কাজ করছে।
শুধু বামফ্রন্ট নয়, বিজেপি-তৃণমূল বিরোধী সব দল, গোষ্ঠী, ব্যক্তিকে একজোট করতেই যে সিপিআই(এম) সচেষ্ট সেকথাও জানিয়েছেন সেলিম। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কংগ্রেসের একলা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেছেন, ওদের নেতাদের কেউ কেউ একলা চলার নামে তৃণমূলকেই সাহায্য করতে চান। কিন্তু আমরা সব জেলার সব পার্টি কর্মীদের বলছি, যেখানে যেখানে কংগ্রেস কর্মীরা আছেন, বুথে বুথে তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন। আমরা কারো দল ভাঙাতে যাচ্ছি না। কিন্তু বিজেপি-তৃণমূল বিরোধী সবাইকে একজোট করাই যে আমাদের লক্ষ্য, সেকথা জানিয়ে বুথে বুথে কংগ্রেস কর্মীরা কোন দিকে থাকতে চান, বিজেপি-তৃণমূল বিরোধী শক্তির পাশে থাকতে চান, নাকি তৃণমূলের সঙ্গে যেতে চান, সেকথা একেবারে তলা থেকে জেনে নিন।
বাস্তবিকই এদিন একেবারে তলা থেকে কংগ্রেস কর্মীদের মনোভাবের একটি প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বহরমপুরে। এদিন বহরমপুর শহরের রবীন্দ্রসদন থেকে লালদিঘি, বাসস্ট্যান্ড হয়ে পার্টির জেলা দপ্তর পর্যন্ত একটি মিছিল করেন সিপিআই(এম) কর্মীরা। মিছিলে অংশ নেন মহম্মদ সেলিম এবং জামির মোল্লা সহ পার্টি নেতৃবৃন্দ। মিছিল এগনোর সময় উলটো দিক থেকে আসা কংগ্রেসের একটি মিছিলের কর্মীরা হাত মিলিয়ে গিয়েছেন সেলিম এবং সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। মিছিল থেকে তখন স্লোগান উঠছিল, ‘বিজেপি-তৃণমূলের বিরুদ্ধে/লড়াই হবে একসাথে’।
CPI-M Baharampur
বহরমপুরে সেলিম: হিন্দু-মুসলিমকে একজোট করে হারাতে হবে তৃণমূল-বিজেপি’কে
×
Comments :0