কৌশিক দাম
ফাল্গুনের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করেই উত্তরবঙ্গের কৃষি মানচিত্রে এখন ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ছবি। জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি ব্লকের দোমোহনী এবং নবগঠিত ক্রান্তি ব্লকের দিগন্তজোড়া মাঠে এখন বোরো ধান চাষের চূড়ান্ত ব্যস্ততা। দুই এলাকার কয়েক হাজার কৃষক পরিবারের কাছে এই মরসুমের অন্নসংস্থানের মূল চাবিকাঠি এখন তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রধান ক্যানাল ও তার শাখা নালাগুলো। সরকারি সেচ ব্যবস্থার এই জলের ওপর ভিত্তি করেই সোনালী ফসলের স্বপ্ন বুনছেন প্রান্তিক চাষিরা।
ময়নাগুড়ির দোমোহনী গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ক্রান্তি ব্লকের রাজডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর মাঝগ্রাম সহ পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকাগুলোতে এখন সাজ সাজ রব। বিঘার পর বিঘা জমিতে কোথাও চলছে পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টরের গর্জন, কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে চলছে ধানের চারা রোপণের কাজ। ভোরের আলো ফুটতেই আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নেমে পড়ছেন চাষিরা। এই কর্মব্যস্ততা চলছে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। মূলত সেচ খালের জলের সুষম বণ্টনের দিকেই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন তারা।
এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো চাষ সম্পূর্ণভাবে সেচনির্ভর। যেহেতু চৈত্র মাস পর্যন্ত বৃষ্টির দেখা মেলা ভার, তাই তিস্তা ক্যানালের জলই তাদের একমাত্র গতি। কৃষকদের দাবি, সঠিক সময়ে ক্যানালে জল ছাড়লে চাষের খরচ অনেকটাই কমে যায়। অন্যথায়, আকাশছোঁয়া ডিজেলের দামে পাম্প চালিয়ে ভূগর্ভস্থ জল তুলে চাষ করা সাধারণ ও প্রান্তিক চাষিদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। জল সময়মতো পেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব ফেরার আশা করা হচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে চলতি মরসুমে ধানের ফলন ভাল হবে বলে আত্মবিশ্বাসী স্থানীয় কৃষি মহল।
মাঠের কাজ সামলাতে সামলাতেই প্রবীণ কৃষক মোমিনুল হক জানালেন, "আমাদের এই তল্লাটের অধিকাংশ মানুষই তিস্তা ক্যানালের জলের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা কোমর বেঁধে নেমেছি। ঠিকমতো সার আর জল পেলে ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে না।" তবে কৃষকদের একাংশের উদ্বেগ, ক্যানালের জল বণ্টন যদি সুষম না হয়, তবে খালের লেজ প্রান্তের জমিগুলো বঞ্চিত হতে পারে। তাই সেচ দপ্তরের কড়া নজরদারির দাবিও তুলেছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে, উত্তরের জনপদে এখন কাদা-জলে মাখা এক লড়াকু জীবনযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেই তিস্তার জল।
Comments :0