ঘড়িতে রাত বারোটা। ধূপগুড়ি মহকুমা হাসপাতালের বহিঃবিভাগের অন্ধকার বারান্দায় মশার কামড় আর কনকনে হাওয়ার মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন এক প্রৌঢ়। পাশেই সিমেন্টের চাতালে জবুথবু হয়ে শুয়ে এক যুবক। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ছবি নয়, উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের প্রাত্যহিক দৃশ্য। উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরির আড়ালে ধূপগুড়ি মহকুমা হাসপাতালে এখন রোগীর পরিজনদের জন্য এক চরম নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।
১৯৫৭ সালে স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৯০ সালে বামফ্রন্ট আমলে এটি গ্রামীণ হাসপাতালে উন্নীত হয়। দীর্ঘ বামপন্থী আন্দোলন, বিশেষ করে ডিওয়াইএফআই’র লাগাতার লড়াইয়ের চাপে এবং গত ২০২৩ সালের উপনির্বাচনের সমীকরণ মেলাতে ২০২৪’র লোকসভা ভোটের আগে ১৪ মার্চ ময়নাগুড়ির সভা থেকে তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জি ঘোষণা করেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে এটি মহকুমা হাসপাতাল হবে। নাম বদলে মহকুমা হাসপাতাল হলেও, ন্যূনতম মানবিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ বর্তমান সরকার।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, বর্তমানে ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগীর চাপ আকাশছোঁয়া। গরমে বহির্বিভাগে দৈনিক ১৫০০-১৬০০ জন রোগী আসেন। অথচ তাঁদের সঙ্গে আসা পরিজনদের বসার বা শোওয়ার জায়গা নেই। অভিযোগ, বামফ্রন্ট আমলে পরিজনদের বিশ্রামের জন্য যে আবাসনগুলি ছিল, তৃণমূল জমানায় সেগুলি অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০০৬ সালে তৎকালীন সিপিআই(এম) বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত রায়ের বিধায়ক তহবিল থেকে তৈরি প্রতীক্ষালয়টি বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত ছোট এবং সেটি বহিঃবিভাগের বারান্দা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
দুরামারির মানিক রায়ের দিদি কাবেরী রায় বুধবার থেকে প্রসূতি বিভাগে ভর্তি। মানিকবাবুর ক্ষোভ, ‘‘চারদিক খোলা বিশ্রামাগারে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে গাদাগাদি করে বসে থাকতে হচ্ছে। সরকার শুধু বড় বড় কথা বলে, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কষ্টের দিকে নজর নেই।’’ একই সুর ফুলবাড়ীর সুব্রত দাসের কণ্ঠেও। সদ্যজাত সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে খুশির আবহের মাঝেও হাসপাতালের অব্যবস্থা তাঁকে বিঁধছে। মশার উপদ্রব আর শৌচাগারের দুরবস্থায় অতিষ্ঠ সুব্রত বলেন, ‘‘রোগীর সাথে সাথে এবার আমাদেরও অসুস্থ হওয়ার জোগাড়।’’
খগেনহাটের রমেন রায় বা বারোঘরিয়ার সফিউল ইসলামদের মতো সাধারণ মানুষ আজ প্রশ্ন তুলছেন— কেবল ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়াই কি সরকারের কাজ? ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুমন নিয়োগী দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকও। তাঁর দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতদিন ধূপগুড়ির মানুষকে কেবল ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ দোহাই শুনে রাত জাগতে হবে? আন্দোলনের চাপে নামবদল হলেও, পরিকাঠামোর কঙ্কালসার দশা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই সরকারের অন্তঃসারশূন্য ‘উন্নয়ন’কে।
Dhupguri Sub-Divisional Hospital
উন্নয়নের বিজ্ঞাপনী চমক, ধূপগুড়ি মহকুমা হাসপাতালে পরিজনদের রাত কাটছে বিনিদ্র যন্ত্রণায়
×
Comments :0