Budget 2026

কাদের প্রতি কর্তব্য পালন করলেন অর্থ মন্ত্রী

উত্তর সম্পাদকীয়​

ঈশিতা মুখার্জি
২০২৬ সালের বাজেট পেশ করার সময়ে তাঁর এক ঘণ্টা অতিক্রান্ত বক্তৃতায় অর্থ মন্ত্রী কয়েকটি “কর্তব্য” পালনের কথা বলেছেন। সেই কর্তব্যগুলি একটি একটি করে দেখলে বোঝা যায় এই কর্তব্যগুলি ঠিক কি দিক নির্দেশ করছে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে। অর্থ মন্ত্রী যাকে কর্তব্য বলে মনে করেন, নিশ্চয়ই তা দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, অন্তত দেশের সরকার সেই ক্ষেত্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। বাজেট পেশের ঠিক আগেই পেশ হয়েছে আর্থিক সমীক্ষা। সেই আর্থিক সমীক্ষায়ও দেশের কয়েকটি উদ্বেগের বিষয়ের কথা আছে। খটকা এখানেই লাগে যখন এই দুটি দলিলের উদ্বেগের বিষয়ের মধ্যে মিল থাকে না। আর্থিক সমীক্ষায় বলা রয়েছে যে দেশের মোট উৎপাদনে শিল্প কারখানার উৎপাদন ১৭-১৮%, প্রায় একই জায়গায় রয়েছে। যে কোনও উন্নত অর্থনীতির পক্ষে এই অবস্থা খুব সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়াও প্রাক-বাজেট অর্থনীতির খতিয়ান আমাদের দেখিয়েছে যে দেশে মোট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়নি। গত বাজেটে কর্পোরেটকে কর ছাড় দিয়েও দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হয়নি দেশের সরকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে কর্তব্য পালনের কথা বলেন অর্থ মন্ত্রী।
প্রথম তিনি বলেন দেশের বৃদ্ধির হার বাড়াতে হবে। দেশে রাজস্ব আয়ের মধ্যে কর বাবদ আয়ের ক্ষেত্রে কর্পোরেট করের থেকে আয়করের সংগ্রহ অনেক বেশি। দেশের সাধারণ মানুষ যে পরিমাণ কর দিয়ে থাকেন, কোটিপতি কর্পোরেট তার থেকে কম কর দিয়ে থাকেন। কেন এই ব্যবস্থা? তার কারণ সরকার আশা করে যে এই কর ছাড় তাঁদের আরও বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই বিনিয়োগ বাড়েনি। এই প্রবণতা চলে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এই বছরের পেশ করা বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহ সম্পর্কে কি বলা আছে? গত বছরের কর্পোরেট করের সংগ্রহ হয়েছিল ১১ লক্ষ কোটি টাকা আর আয় কর থেকে সংগ্রহ হয়েছিল ১৩.১ কোটি টাকা। এ বছরও পরিকল্পনায় তার ব্যতিক্রম নেই। কর্পোরেট কর ধার্য করা হয়েছে ১২.৩ কোটি টাকা, আর আয়কর ধার্য করা হয়েছে ১৪.৬ কোটি টাকা। জিডিপি’র অংশে করের সগ্রহ ১২%, যা সর্বোচ্চ। কিন্তু এই করের বেশির ভাগ দিয়ে চলেছেন দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ এবং জিএসটি সহ পরোক্ষ করের মাধ্যমে। অর্থাৎ মুনাফাকে ছাড় দিয়ে রোজগার থেকে রাজস্ব আয় বেশি। কোথায় কর্তব্য পালন করলেন অর্থ মন্ত্রী? যারা এই সরকারকে নির্বাচনী বন্ড দিয়ে ক্ষমতায় রাখতে সাহায্য করেছে, তাঁদের প্রতি কর্তব্যই পালন করলেন অর্থ মন্ত্রী।

দ্বিতীয় কর্তব্যের যে কথা তিনি বলেন তা হলো মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা যাতে দেশের বৃদ্ধির অংশীদার তাঁরা হতে পারেন। এর জন্য এই বাজেট কি করল? দেশে বহুদিন ধরেই কৃষক আন্দোলন চাষের খরচ কমানোর কথা বলেছিল। দেনার ভারে জর্জরিত কৃষক আত্মহত্যার কথা আমরা সকলে জানি। সেখানে সার এবং চাষের পরিকাঠামোয় বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হলো। বহুল বিজ্ঞাপিত প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় বরাদ্দ ছিল ১২২৪২.২৭ কোটি টাকা, তা এই বছর কমিয়ে দিয়ে করা হলো ১২২০০.০০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও গত বাজেটে ডাল, সবজি, ফল, শঙ্কর বীজ, মাখানা ইত্যাদি নানা প্রকল্প ঘোষণা করেছিল সরকার। সেই প্রকল্পগুলি একেবারেই শূন্য বরাদ্দ করেছে সরকার।
কৃষি পরিকাঠামো এবং উন্নয়ন ফান্ডে এ বছর কোনও বরাদ্দ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনায় বরাদ্দ ২০,৩০০ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে হয়েছে ২২,৭৪২৯ কোটি টাকা। সংখ্যাগুলি এই কারণেই উল্লেখ করা প্রয়োজন কারণ বরাদ্দ যৎসামান্য বাড়লেও যদি আর্থিক সমীক্ষায় ঘোষিত মুদ্রাস্ফীতির হার ১.৮% ধরি তাহলে আসল বরাদ্দ অনেকটাই কমে যায়। এই প্রকল্পগুলির উল্লেখ করা হলো কারণ এগুলি বারেবারে সরকারি বিজ্ঞাপনে ফলাও করে বলা হয়। অর্থ মন্ত্রীর ভাষণে শ্রমিকদের কথা একবারও উল্লেখ করা নেই। তাই বাধ্য হয়ে শ্রম দপ্তরের বাজেট বরাদ্দ দেখতে হয়। শ্রম এবং কর্মসংস্থান দপ্তরে গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩২৬০৬.৯২ কোটি টাকা। কিন্তু আসলে ব্যয় হয়েছে ১২৬৫৯.৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষদের দেশের বৃদ্ধির হারের অংশীদার করা হয়নি। এই বাজেটে এই দপ্তরের বাজেট বরাদ্দ টাকার অঙ্কে প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে হয়েছে ৩২৬২৫.৩৩ কোটি টাকা। এইভাবেই বাজেট বরাদ্দগুলি আগের বাজেটের অঙ্কেই প্রায় থমকে রয়েছে বা কমে গেছে। বাড়েনি আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিলের মতো প্রকল্পেও। তাহলে শ্রমিক কৃষকদের প্রতিও সরকার কর্তব্য পালন করল না।
তৃতীয় কর্তব্য ছিল সবকা সাথ সবকা বিকাশ। সবকার অর্থ কী তা গোটা বাজেটে খুব স্পষ্ট করে দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রী। তিনি তথ্য সংগ্রহের উপর খুব জোর দিয়েছেন এবং এই বিষয়ে এআই ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। তথ্য সংগ্রহের কথা বারে বারে এসেছে তাঁর বক্তৃতায়। এই তথ্য সংগ্রহ কাদের স্বার্থে? নিঃসন্দেহে বাজারের স্বার্থে। মৎস্যজীবী মহিলাদের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার কথা তিনি বলেছেন- এরকম অজস্র উদাহরণ রয়েছে যেখানে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে দেশের মানুষের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জেনে তা বেসরকারি বাজারের কাছে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করা হবে। দেশের রেশন ব্যবস্থা জোরদার করতে কেন তথ্য ব্যবহার করা হবে না, তার কোনও সদুত্তর নেই। রেশন ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য বাজেট বরাদ্দ নেই। গণবণ্টন ব্যবস্থার কোনও সংস্থান বৃদ্ধির কোনও সম্ভাবনা নেই এই বাজেটে যদিও বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। কাদের প্রতি কর্তব্য পালন করছে এই সরকার?

শিল্পে যে ক্ষেত্রগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হলো তা হলো বায়োফার্মা, সেমিকন্ডাক্টর ইত্যাদি এমন কিছু ক্ষেত্র, যা ইতিমধ্যেই গুটিকয়েক কর্পোরেটের দখলে রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলি কোনোভাবেই শিল্প কারখানার উৎপাদনের মৌলিক ক্ষেত্র নয়। ঠিক সেইরকম আমরা দেখলাম কৃষিতে গুরুত্ব দেওয়া হলো নারকেল, বাদাম, চন্দনকাঠ এইরকম কয়েকটি উৎপাদনে। এগুলিও কোনোভাবেই কৃষির মুল উৎপাদনের মধ্যে পড়ে না। তাই এই বাজেটের পরিধি ক্ষুদ্র। দেশের উৎপাদনের মৌলিক ক্ষেত্রগুলি বাদ দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি ক্ষেত্রকে বাছাই করে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বাজেটে তাই দেশের বেশির ভাগ মানুষের কোনও কথাই নেই।

বাজেটে অধিকাংশ ব্যয় বরাদ্দ হয় গত বছরের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, নয়ত বরাদ্দ কমে গেছে। ১.৮% মুদ্রাস্ফীতি ধরলে বরাদ্দ কমে গেছে। তাই এই বাজেট সঙ্কীর্ণ বাজেট। দেশের বেশির ভাগ মানুষকে বাদ দিয়ে এই বাজেট লেখা হয়েছে। তফসিলি জাতি ও উপজাতি বাজেট বরাদ্দ কমেছে। মহিলাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ কমে গেছে। যে সব প্রকল্প শুধুমাত্র মহিলাদের তাতে বরাদ্দ গত বছরের চেয়ে কমে গেছে। জেন্ডার বাজেট যা নির্দিষ্ট করে মহিলাদের জন্য বরাদ্দ তা মোট জিডিপি’র ১.৬% থেকে ১.৩% এ নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশু ও মহিলাদের মন্ত্রকের বরাদ্দ মোট বাজেট বরাদ্দের ০.০৫% এ নেমেছে। মহিলাদের প্রতি নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে গেলেও বেটি পড়াও বেটি বাঁচাও সহ নারী আদালত, নির্ভয়া ফান্ড ইত্যাদিতে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইরকম ভাবে শিক্ষার বাজেটে প্রায় মন্ত্রক চালানো ছাড়া আর বিশেষ বরাদ্দ নেই।

সমস্ত ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিয়ে বাজেটকেই প্রায় অর্থহীন করে দিলেন অর্থ মন্ত্রী। প্রতি মন্ত্রকে, প্রতি প্রকল্পেই প্রকৃত বরাদ্দ কমে গেছে। এমনিতেই কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলিতে রাজ্য সরকারগুলিকে কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ অর্থ প্রদান করে না। এর উপর বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজেটের খতিয়ানে কয়েকটি প্রকল্প বাবদ অর্থ বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও দেখা যাচ্ছে তা গত বছরের না দেওয়া বরাদ্দ। অর্থাৎ আদৌ এই বছর বরাদ্দ বাড়েনি। এটি শুধুই এক অঙ্কের হিসাব। এই বাজেট দেশের মানুষের স্বার্থ দেখবে কি করে? এই বাজেট তো মুনাফা রক্ষা বেসরকারি সংস্থা ও কর্পোরেটের মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে তৈরি এক বাজেট। ঠিক সেই কারণেই কর্পোরেটের হাতের পুতুল এই সরকার নির্বাচনের আগেও মনোমোহিনী বাজেট করতে পারল না। এমনকি সাধারণ বিনিয়োগকারীকেও উৎসাহ দান করতে পারল না। তাই সেনসেক্সের পতন ঘটল। এই সরকার কিভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা অর্থাৎ গদিতে থাকবে তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। তাই ট্রাম্পের হুমকি থেকে দেশকে কিভাবে বাঁচাবে, সে নিয়েও বাজেটে কোনও দিক নির্দেশ নেই। এই বাজেট দিশাহীন নয়, নির্দিষ্ট দিশা রয়েছে। তা হলো মুনাফা বৃদ্ধি করা, রাষ্ট্রীয় ব্যয় বরাদ্দ যতটা সম্ভব কমিয়ে দিয়ে সরকারি দায় ঝেড়ে ফেলা। এই সরকার কি আদৌ দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ? বাজেট ২০২৬ কিন্তু এর বিপরীত কথাই বলছে।

Comments :0

Login to leave a comment