আমেরিকা-ইরান আলোচনাকে সামনে রেখে তলে তলে ট্রাম্প-নেতানেয়াহু যখন ইরাকে হামলার ছক ও প্রস্তুতি মোটামুটি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন তখন গত মাসের ২৫ ও ২৬ তারিখ ইজরায়েল সফর করে বাণিজ্য, সামরিক সহ এক গুচ্ছ চুক্তির পাশাপাশি ভারত-ইজরায়েল স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় তুলে নেবার কাজ সেরে ফেলেন। দুনিয়া জানে যেকোনও মুহুর্তে মার্কিন-ইজরায়েলের যৌথ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে ইরানের ওপর। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী সব জেনে বুঝেও ইজরায়েলী সংসদে ভাষণ দিতে এবং দু’দেশের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন ইজরায়েলের নীতি ও পদক্ষেপের প্রতি ভারত পরিপূর্ণ সমর্থন থাকবে। চার বছর ধরে গণহত্যার সংগঠন দেশের প্রতি এভাবে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়ে মোদী ট্রাম্প-নেতানেয়াহুকে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?
অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর এবং সমর্থন করার অঙ্গীকার করে মোদী দেশে ফেরার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইজরায়েল-আমেরিকা ইরানে সামরিক হামলা শুরু করে দেয়। বোমা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খামেনিই। পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে পুরানো বন্ধু ইরান। অথচ খামেনেইর মৃত্যুতে প্রতিবাদ-নিন্দা তো দূরের কথা ন্যূনতম শোক প্রকাশও করেনি ভারত। স্বঘোষিত বিশ্বগুরু মৌনিবাবা হয়ে মুখে কুলুপ আঁটলেন।
ইরানে সামরিক আগ্রাসন, খামেইনের হত্যাকাণ্ডে মোদী নীবরতা পালন করলেও পালটা আক্রমণে ইরান যখন সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালায় তার নিন্দা করতে কালক্ষেপ করেননি। এই মোদীই আবার কয়েকদিন আগে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বোমা বর্ষণের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। ইজরায়েলে গিয়ে সন্ত্রাসবাদের একসাথে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করে এলেও আফগানিস্তানে কিন্তু মৌলবাদী-সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষেই অবস্থান নেন। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে স্বঘোষিত ‘শান্তির দূত’ সেজে দু’দেশ সফর করে যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বগুরুকে কেউ পাত্তা দেয়নি। এবার ইরানে মার্কিন-ইজরায়েল হামলার কয়েকদিন পর নেতানেয়াহুকে ফোন করে মোদী যুদ্ধ বন্ধের কথা বলেছিলেন। ইজরায়েলও যথারীতি পাত্তা দেয়নি। বোঝাই যাচ্ছে এসব লোক দেখানো কথার কথা, মনের কথা নয়।
দু’দিন আগে ভারতের উপকূল থেকে ২৮০ মাইল দূরে এবং শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে ৮০ মাইল দূরে ভারত মহাসাগরের বুকে একটি ইরানি যুদ্ধ জাহাজকে মার্কিন ডুবো জাহাজ থেকে টর্পোডো হানায় ধ্বংস করা হয়। খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এবং জীবিত ও মৃত অবস্থায় অধিকাংশ ইরানি সেনাকে উদ্ধার করে শ্রীলঙ্কা ঘোষণা করে তারা যুদ্ধে কারও পক্ষে নেই। তারা মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। ইরানের আর একটি যুদ্ধ জাহাজ বিপদে পড়ার পর শ্রীলঙ্কা নিজেদের বন্দরে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরাপদ জায়গায় এইভাবে বিনা প্ররোচনায় ইরানের যুদ্ধ জাহাজকে ধ্বংসের পরও ভারত ২৪ ঘণ্টা নীরব ছিল। অথচ এই ইরানি জাহাজটি ছিল ভারতের অতিথি। ভারতের আমন্ত্রণে এসেছিল বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশ নিতে। ফিরে যাবার পথে আমেরিকা ভারতের অতিথিকে ধ্বংস করে। ঘটনা পরম্পরা প্রমাণ করে দিচ্ছে ভারত শুধু যুদ্ধের পক্ষে নয়, স্পষ্টত আমেরিকা-ইজরায়েল অক্ষের পক্ষে। আমেরিকাকে চটিয়ে বিরাগভাজন হতে চান না বলেই মোদী নীরব থাকছেন। ভারতের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানকে বদলে যুদ্ধবাজ, ধ্বংসবাজদের পক্ষ নিচ্ছেন নীরবে।
Editorial
ট্রাম্পের ভয়ে নীরব মোদী
×
Comments :0