Post Editorial

ইরান যুদ্ধ আমেরিকার প্যান্ডোরার বাক্স

উত্তর সম্পাদকীয়​

অমিত সরকার

উভয় সঙ্কটে ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধের পরিণামে ট্রাম্প কি সে দেশে শাসক বদলে সমর্থ হবেন? ‌ট্রাম্প নিজে অবশ্য সেটাই দাবি করছেন। তবে মার্কিন ও ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বলছে এর উল্টোটাই। সূত্রের খবর, একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ধারাবাহিক বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছে যে, ইরানের শাসকেরা আদৌ বিপদে নেই। এবং দেশের জনগণের ওপর তাদের ভালোরকম নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইজরায়েলের একটি গোয়েন্দা সংস্থাও জানিয়েছে, শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সঙ্ঘাতের জেরে ইরানের সরকার পড়ে যাবে এমন কোনও ইঙ্গিতও নেই। এর জেরে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের লক্ষ্য কি পূরণ হবে? এর ওপর ইরানের নতুন শীর্ষনেতা আয়াতোল্লা মোজতবা জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী অবরোধ চলবে। তার মানে, বিশ্বজুড়ে গ্যাস ও তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করে ইরান ট্রাম্পের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে যাবে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন, ট্রাম্প তার ইরান যুদ্ধ শেষ করবেন কীভাবে?
হরমুজ প্রণালীকে অবরোধ মুক্ত করা ট্রাম্পের সামনে একটি বিকল্প হতে পারে। সেটা শুধু আকাশপথে বোমাবর্ষণ করে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ইরানের মাটিতে নামাতে হবে মার্কিন সেনা যারা উপকূলের দু”ধারের জমির দখল নিয়ে হরমুজকে অবরোধ মুক্ত করতে পারে। তবে সেজন্য মার্কিন সেনাদের প্রাণের মূল্য যত দিতে হবে, সেটা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তারা দিতে রাজি হবেন কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন সেনাকর্তারা জানিয়ে দিয়েছেন, এখনই পাহারা দিয়ে তেলের জাহাজগুলিকে হরমুজ পার করার মতো প্রস্তুতি তাদের নেই। তার মানে এই দুই পথে এখনই যুদ্ধের নিরসন সম্ভব নয়। সে কারণে ট্রাম্প সম্ভবত এই ফাঁদ থেকে বেরোনোর সম্মানজনক পথ খুঁজছেন।
এদিকে গ্যাসের দাম বিশ্ববাজারে ব্যারেল পিছু ১০০ ডলার ছুঁয়েছে। খোদ মার্কিন মুলুকে গ্যাসের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস হুমকি দিয়েছে তাদের অবরোধের জেরে গ্যাসের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের অ্যাকিলিসের গোড়ালি।

রাশিয়ার সঙ্গে সাময়িক সমঝোতা
ট্রাম্পের চিরশত্রু রাশিয়া। এতদিন তেল বাণিজ্যে রাশিয়াকে একঘরে করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন ট্রাম্প। তেল বিক্রির টাকায় রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ চালাচ্ছে, এই অদ্ভূত যুক্তিতে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে বাধ্য করেন তিনি। সেই জায়গায় বেশি দামে আমেরিকার তেল কিনতে ভারতকে বাধ্য করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। রাশিয়াকে বিপাকে ফেলতে একইসঙ্গে ঢালাওভাবে রুশ তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ট্রাম্প।
কিন্তু হরমুজ অবরোধের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে স্থিতাবস্থা আনতে আর কোনও পথ খোলা নেই ট্রাম্পের সামনে। আপাতত রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধজ্ঞা তুলে নিয়েছেন তিনি। সারা বিশ্বে এখন তেল বিক্রি করতে পারবে রাশিয়া। এই ছাড় জারি থাকবে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাদের ধারণা এতে কয়েক লক্ষ ব্যারেল তেল বাজার আসবে এবং দাম কমবে। যদিও ১১ এপ্রিল এই ছাড় বন্ধ হবে এমন কোনও নিশ্চয়তাও নেই।
এখানে অবশ্য বিষয়টার গুরুত্ব অন্য। যে রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য এতদিন ‘শাস্তি’ দিচ্ছিলেন ট্রাম্প, সেই দেশকেই এখন তেল বিক্রির অনুমতি দিতে হচ্ছে ইরান যুদ্ধের চাপ সামলাতে। কোথায় গেল রাশিয়াকে একঘরে করার দম্ভ? কোথায় গেল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাশিয়াকে ধ্বংস করার হুমকি? ইরানের মতো ছোট্ট একটা দেশের গুঁতোয় শেষ পর্যন্ত চিরশত্রু রাশিয়ার সঙ্গেও সমঝোতা করতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। এই সুযোগে নিজেদের কোষাগারে কোটি কোটি ডলার গুছিয়ে তুলছে রাশিয়া। এ জন্যই বলে, পাগলা ষাঁড়ে তাড়া করলে কী করতে হবে তা ব্যাকরণে লেখা থাকে না। আপাতত ট্রাম্পকে তাড়া করে ফিরছে সেই ইরান যুদ্ধ। এখন তাই শত্রু রাশিয়াকেও তোয়াজ করতে হচ্ছে তাঁকে।

অ্যাডভান্টেজ চীন, উত্তর কোরিয়া
তবে এখানেই ট্রাম্পের উদ্বেগের শেষ হচ্ছে না। রাশিয়ার চেয়েও এখন আমেরিকার বড় শত্রু চীন। ট্রাম্পের দলবল তো বলেই বেড়াচ্ছেন, চীনের সঙ্গে চুক্তি করে যা ভুল করেছিলাম ভারতের ক্ষেত্রে তা আমরা করব না। চীন আমাদের সঙ্গে চুক্তি করে আমাদেরকেই ছাপিয়ে এগিয়ে গেছে। অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রেই এখন আমেরিকাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে চীন। চীনকে শায়েস্তা করতে ট্রাম্প তাই নতুন সামরিক জোট তৈরি করেছেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়।
মার্কিন সেনা অফিসারেরা ঘোষণাই করে দিয়েছিলেন, এখন কিছুদিন তারা জোর দেবেন ভারত‌–প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়। লক্ষ্য কোয়াডকে ব্যবহার করে চীনকে চাপে রাখা। আর এখন? উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন মিত্র দেশগুলির জন্য যে আকাশ নিরাপত্তা এতদিন গড়ে তুলেছিল আমেরিকা, সেই ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইরানের মিসাইল। ধ্বংস হয়েছে দুটি থাড মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা  যেগুলির দাম প্রায় ২৭০কোটি ডলার। এগুলো আবার বসাতে সময় লাগবে ছয় থেকে আট বছর। তাহলে এখন ইরানের মিসাইল হামলা সামলাবে কে? অতএব দক্ষিণ চীন সাগর থেকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে ইরানে নিয়ে যাচ্ছে পেন্টাগন। এর মানে চীনকে বাগে আনতে দক্ষিণ চীন সাগরে যে সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল পেন্টাগন, এখন তা সরে যাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায়। আমেরিকার শত্রু চীনের কাছে এর মানে কী তা বোধহয় বুঝিয়ে বলারা দরকার পড়বে না।
প্যাট্রিয়ট মিসাইল ও থাড মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেন্টাগন সরিয়ে নিচ্ছে এশিয়ায় আমেরিকার একমাত্র মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও। এগুলো বসানো হয়েছিল চীনের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার মিসাইল হামলার বিষয়টি মাথায় রেখে। এখন এই প্রথম ইন্টারসেপ্টার ও লঞ্চার, সবই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মার্কিন সামরিক কর্তারা বলছেন, এই ঘটনার ব্যাখ্যা দাঁড়াবে এরকম। আমেরিকা তাদের নির্ধারণ করা প্রায়োরিটি থিয়েটার ছেড়ে চলে যাচ্ছে ইরানকে সামাল দিতে। একইসঙ্গে চীনের এই ব্যাখ্যাও সমর্থন পাবে যে, বিশ্বজুড়েই মার্কিন প্রভাব কমছে। নিট ফল, ইরানকে ঠেকাতে আমেরিকার কৌশলে সুবিধে পেয়ে যাচ্ছে আমেরিকার এক নম্বর শত্রু চীন এবং সুবিধে পাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। মানে, এশিয়ার আরেক প্রান্তে চ্যালেঞ্জের মুখে মার্কিন খবরদারি।

ইউরোপও এখন বেয়াড়া
সুযোগ বুঝে বেঁকে বসেছে আটলান্টিকের অপর পাড়ে থাকা আমেরিকার পশ্চিমী মিত্ররা। একে তো ইরানে হামলার জন্য ব্রিটেনের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেরিতে দিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। তাতে স্টারমারের ওপর বেজায় চটেছেন ট্রাম্প। খেপে গিয়ে বলেছেন, তোমাদের সাহায্য আমার দরকার নেই। এর ওপর হরমুজ নিয়ে বেসুরো হয়ে উঠেছে ফ্রান্স ও জার্মানি। তাদের তেল ও গ্যাসের ট্যাঙ্কার যাতে ইরান ছেড়ে দেয় সেজন্য আলাদা করে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ফ্রান্স। কারণ উপসাগরের পথে জ্বালানি ও গ্যাস না এলে ঝামেলায় পড়তে হবেই ইউকে। নিষেধাজ্ঞা তুলে ফের কিনতে হবে রাশিয়ার গ্যাস। তাতে ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে ঘাঁটানো বন্ধ হয়ে যাবে। আবার গ্যাস না পেলে দাম বাড়বে, লোকে পথে নামবে। তা সামাল দিতে বাড়তি ঝঞ্ঝাট পোহাতে হবে ম্যাঁক্রকে। 
ইরানের প্রশ্নে গোটা ইউরোপ দ্বিধা বিভক্ত। তাদের দশা শ্যাম রাখি না কূল রাখি। আমেরিকাকে চটানো যাবে না, তাহলে নেটোর সাহায্য বন্ধ করে দেবেন ট্রাম্প। তাতে আবার সুবিধা রাশিয়ার। আবার উপসাগরের তেল ও গ্যাস না এলে অর্থনীতি পড়বে সঙ্কটে। এই অবস্থায় ট্রাম্পের ইরান নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে নরওয়ে। সেখানে বোমা পড়েছে মার্কিন কনস্যুলেটে। স্পেনের বিদেশ মন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান ইস্যুতে তারা আমেরিকার সঙ্গে নেই। মার্কিন হানার জন্য স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করা যাবে না। এনিয়ে মিথ্যা বলেছেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিয়েভিট। ফ্রান্স ও ব্রিটেন রয়েছে মধ্যবর্তী অবস্থানে। তারা জানে উপসাগরের জ্বালানি না পেলে বিপদ। তাই কোনোক্রমে দু’দিক রাখার চেষ্টা করছে। একমাত্র জার্মানি সরাসরি রয়েছে ট্রাম্পের পক্ষে। একদিকে ইউরোপীয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, ইরানের শাসকদের জন্য চোখের জল ফেলার দরকার নেই। অন্যদিকে ইউরোপীয়ান কমিশনার ফর কম্পিটিশন টেরেসা রিবেরা বলেছেন লিয়েনের মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। নেটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করে বিবৃতি দিলেও আসলে তিনি সতর্কভাবে জল মাপছেন। সোজা কথায়, ইরান ইস্যুতে দ্বিধা বিভক্ত ট্রাম্পের পশ্চিমা মিত্ররা। 
প্যান্ডোরার বাক্স?
তাহলে কি ইরান যুদ্ধ হয়ে উঠল ট্রাম্পের প্যান্ডোরার বাক্স? এই যুদ্ধ সামলাতে গিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় খোলা মাঠ ছেড়ে দিতে হচ্ছে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে। আমেরিকার পশ্চিমা মিত্ররা দ্বিধা কিংবা ত্রিধাবিভক্ত। ওদিকে একা ইরান হরমুজ অবরোধ করে সঙ্কট ঘনিয়ে তুলেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতিতে কী করবেন ট্রাম্প? প্রতিদিন বলছেন আরও বড় আঘাত ইরানের ওপর হানা হবে। কিন্তু যতই তিনি আকাশ থেকে বোমা ফেলুন, দুই আঙুলে ইরানকে টিপে মারতে গিয়ে এখন তাঁকে দশ আঙুলে দশটা মাছি সামলাতে হচ্ছে। কোনও সেনানায়কের পক্ষে এমন পরিস্থিতি আদৌ সুখের সময় নয়। ভেনেজুয়েলার পর মনে হয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আবার আসর গুছিয়ে বসবে। ইরানের যুদ্ধ আসর এলোমেলো করে দিয়েছে। এখন দেখা যাকে, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।

 

Comments :0

Login to leave a comment