ভোটের বাজারে আবারও প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে ‘বিকশিত ভারত’ শিরোনামে বিজ্ঞাপনে ভেসে উঠছে। কর্মসংস্থানে তরুণ প্রজন্মের ঝকঝকে ছবির বার্তায় দাবি করা হচ্ছে, সকলের নাকি উন্নত মানের চাকরি মিলেছে। বছরে ২ কোটি চাকরির স্বপ্ন ফেরির হাঁকডাক ঘুরে এসেছে ভোট টানতে। তবে সরকারি তথ্যে চাকরির ছবি একেবারে বিবর্ণ। ভারত হোক বা পশ্চিমবঙ্গ— সর্বত্রই চাকরির যে বেহাল দশা, তা প্রকাশ্যে এসেছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে ভোটের বাজারে মোদী সরকার বারবার নানা প্রকল্প ঘোষণা করেছে। প্রচারে বোঝানো হয়েছে, এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে হাতে গরম চাকরি তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভোট মিটলেই চাকরির বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলে। পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) হারের পরিবর্তন কিংবা ‘আত্মনির্ভর ভারত’ প্রকল্প— সব ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, তাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। কেন্দ্রের শ্রম মন্ত্রক ও জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর (এনএসও)-র প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থানের গতি ধীর এবং কমার প্রবণতাও স্পষ্ট। শ্রম মন্ত্রকের ইএসআই রিপোর্ট বলছে, ২৫ বছরের নিচে যুব শ্রমিকদের নতুন নিয়োগ গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ৯.৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ২২.৫ লক্ষ যুবক নতুন নিয়োগ পেয়েছিলেন, চলতি জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০.০৩ লক্ষে। নতুন নিয়োগের মোট হারও নেমে এসেছে ৪৮.৩৭ শতাংশে। একই সময়ে ইএসআইতে ৩১,১৪৬টি নতুন সংস্থা নথিভুক্ত হলেও কর্মী নিয়োগের হার বাড়েনি।
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পেও নিয়োগের হার ক্রমশ কমছে। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিতে মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল ১৭.৩ লক্ষ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.৬৬ লক্ষে। অর্থাৎ মোদীর এক দশকে প্রায় আড়াই লক্ষ কর্মী কমেছে। সিএমআইই-র তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী নিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে এক দশকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ৪২.৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৭.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের এনএসও রিপোর্টেও দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিকে অসংগঠিত শিল্পে কর্মসংস্থানের সংখ্যা ছিল ১৩.১ কোটি, যা এপ্রিল-জুনে কমে হয়েছে ১২.৯ কোটি। অর্থাৎ মাত্র এক ত্রৈমাসিকেই প্রায় এক কোটি শ্রমিকের কাজ কমেছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে স্থায়ী কর্মীর হার অত্যন্ত কম এবং সামাজিক সুরক্ষাও প্রায় নেই।
কর্মসংস্থানের আরেক বড় প্রতিশ্রুতি ছিল ছোট ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করার জন্য ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) সহ নানা নীতির ফলে বহু ছোট ও মাঝারি শিল্প মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে। সংসদে কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প মন্ত্রী শোভা করণডালজে জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে দেশে লক্ষাধিক ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৭ লক্ষ ৮০ হাজার ৮৩৩ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। সংসদে প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে দেশে ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হওয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭৫টি। পাঁচ বছরে তা দ্রুত বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ২০ হাজার ৯৩৩টিতে। কাজ হারানো শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে কি না— সে বিষয়ে অবশ্য স্পষ্ট কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, শিল্প বন্ধ হওয়ার ঘটনা বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যে তুলনামূলক বেশি। যেমন মহারাষ্ট্রে বন্ধ হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার শিল্প, রাজস্থানে ৯ হাজার, উত্তরপ্রদেশে ৬ হাজার, গুজরাটে ১০ হাজার এবং মধ্যপ্রদেশে প্রায় ৫ হাজার। অর্থাৎ দেশে মোট বন্ধ শিল্পের অর্ধেকেরও বেশি বিজেপি-শাসিত রাজ্যেই। অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে বন্ধ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার শিল্প, কর্নাটকে ৬ হাজার এবং তেলেঙ্গানায় ১৪ হাজার।
পশ্চিমবঙ্গেও ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সরকারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে রাজ্যে বন্ধ শিল্পের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭টি। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে হয় ১৫৩টি, ২০২২-২৩ সালে ৩৬৩টি, ২০২৩-২৪ সালে ৬৮৬টি এবং ২০২৪-২৫ সালে ১,৫৭৮টি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৯৫৪টিতে। ফলে পাঁচ বছরে রাজ্যে মোট ৪,৭৫১টি ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার ৭৬৯ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় নিয়োগের ছবিও বদলে গেছে। আগে নিয়মিত শূন্যপদ ঘোষণা করে নিয়োগের প্রক্রিয়া থাকলেও এখন সেই পদ্ধতি প্রায় উঠে গিয়েছে। সম্প্রতি সংসদে কেন্দ্রীয় ভারী শিল্প মন্ত্রী ভূপতি রাজু শ্রীনিবাস ভার্মা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় নিয়োগ এখন মূলত ব্যবসার পরিমাণের উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ শূন্যপদের ভিত্তিতে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা আর নেই। ফলে কত শূন্যপদ রয়েছে বা কত নিয়োগ হবে— তার নির্দিষ্ট কোনও হিসাবও দেওয়া হয় না। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মী সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। এর ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে পার্থক্য প্রায় উঠে গেছে।
সমীক্ষা বলছে, ২০১৩ সালে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মী সংখ্যা ছিল ১৭.৩ লক্ষ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪.২ লক্ষে। অর্থাৎ এক দশকে প্রায় ২.৭ লক্ষ কর্মী কমেছে। দেশের মোট ৩৮৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ২৪৮টি। একই সঙ্গে স্থায়ী চাকরির হারও দ্রুত কমেছে। মোদী ক্ষমতায় আসার সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় স্থায়ী কর্মীর হার ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, যা এখন কমে প্রায় ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তার জায়গায় কম মজুরির চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে।
অর্থনীতির বাস্তব চিত্রের আরেক দিক ধরা পড়েছে প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনার তথ্যেও। সরকার এই প্রকল্পে নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার সংখ্যাকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও সংসদে পেশ করা তথ্য অন্য কথা বলছে। অর্থ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, মোট জনধন অ্যাকাউন্টের প্রায় ৩০ শতাংশে কোনও লেনদেন না থাকায় সেগুলি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। আরও প্রায় ১০ শতাংশ অ্যাকাউন্টে কোনও টাকাই নেই। অর্থাৎ মোট অ্যাকাউন্টের প্রায় ৪০ শতাংশই নিষ্ক্রিয়।
মন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৫৬ কোটি ৯৮ লক্ষ জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ কোটি অ্যাকাউন্টের ৮৫ শতাংশের সঙ্গে আধার সংযোগ রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ সরাসরি এই অ্যাকাউন্টে পৌঁছানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রভাব সীমিত। বর্তমানে জনধন অ্যাকাউন্টে গড় জমার পরিমাণ মাত্র ৪,৫৪২ টাকা। ফলে এই প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র দূরীকরণ বা সঞ্চয় বৃদ্ধির যে বড় দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রভাব খুব একটা স্পষ্ট নয়।
Unemployment
বিকশিত ভারতের ঝকঝকে বিজ্ঞাপনই সার, বাস্তবে মিলছে না কর্মসংস্থান
×
Comments :0