রাজ্য সরকারের সেবা সেতু অভিযান কর্মসুচির প্রথম দিনেই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা, বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অবরোধে উত্তপ্ত হয়ে উঠলো জেলায় জেলায়। শুক্রবার থেকে কলকাতা সহ রাজ্যের সমস্ত ব্লকে ‘সেবা সেতু ক্যাম্প শুরু করেছে রাজ্য সরকার। ২ অক্টোবর থেকে ৪ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ‘সেবা সেতু ক্যাম্পে’ বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা মিলবে বলে জানা নো হয়েছিল। কোচবিহার রবীন্দ্র ভবনে শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয় সেবা সেতু অভিযান। তবে সেখানে অন্নপূর্ণা যোজনার কোন রকম কাজ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলে শিবিরের কাজ রীতিমত বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভে শামিল হন বড় অংশের মহিলারা। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিতে দেখা যায় তাদের। বলেন, যদি ৩ হাজার টাকা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে, ১ হাজার টাকা করে দিক। কিন্তু সকল যোগ্য মহিলাকে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতাভুক্ত করুন। তীব্র ক্ষোভের সাথে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে এই পরামর্শই দিলেন অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বঞ্চিত কোচবিহার শহরের মহিলারা। আন্দোলনরত মহিলারা বলেন, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলছেন যোগ্যরা অবশ্যই এই যোজনার অন্তর্ভুক্ত হবেন। কিন্তু কারা যোগ্য, এ ব্যাপারে সঠিক কোন দিক নির্দেশ করতে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী। আর তাই যাদের প্রয়োজন, তারা এই যোজনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজ্যের বর্তমান সরকার রীতিমতো তাদের সাথে প্রতারণা করছেন।
উলুবেড়িয়ার রবীন্দ্র ভবনে ক্যাম্পেও বিক্ষোভ দেখিয়েছেন মহিলারা। সেখানে অন্নপূর্ণার জন্য বহু মহিলা এসেছিলেন। সকাল থেকেই তাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎই প্রশাসনের তরফে জানানো হয় অভিযোগ, অন্নপূর্ণা এবং আয়ুষ্মান ভারত সংক্রান্ত পরিষেবা দেওয়া হবে না এই ক্যাম্প থেকে। এই পরেই পরস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বারাসতের সেবা সেতু ক্যাম্পে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের কাজ না হওয়ার অভিযোগ তুলে টাকি রোড অবরোধ করেন মহিলারা।
‘কবে ঢুকবে অন্নপূর্ণার টাকা?’ এই প্রশ্নেই মহিলাদের বিক্ষোভ উত্তাল হল মাদারিহাট। শুক্রবার মাদারিহাট বিডিও অফিস সংলগ্ন ৪৮ নম্বর এশিয়ান হাইওয়ে ও রাজ্য সড়কে অবরোধে সামিল হলেন একদল মহিলা। তাঁদের অভিযোগ, গত চার মাস ধরে অপেক্ষা করেও অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি। তাদের প্রশ্ন কবে ঢুকবে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা। দূরদূরান্ত থেকে বিডিও অফিসে ক্যাম্পে আসার পরও সেখানে কোনও ক্যাম্প না পেয়ে ক্ষোভ আরও চরমে ওঠে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলে রাস্তার উপর বসে পড়েন বিক্ষোভকারীরা।
এদিন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া এবং আবেদন সংক্রান্ত হয়রানির অভিযোগে বানারহাটে বিক্ষোভে সামিল হন শতাধিক মহিলা। প্রথমে সেবা সেতু ক্যাম্পে বিক্ষোভ দেখানোর পর বানারহাট-চামুর্চি সার্ক রোড অবরোধ করে। পরে বানারহাট বিডিও অফিসে গিয়ে বিডিওকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখানো হয়। ঘটনাকে ঘিরে দিনভর বানারহাট এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
মহিলাদের বিক্ষোভে উত্তাল বানারহাট।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য বহু মহিলা আগেই আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের আবেদনের বর্তমান স্ট্যাটাস ‘আন্ডার প্রসেস’ দেখাচ্ছে। শুক্রবার প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে সেবা সেতু ক্যাম্পে গেলে কয়েকজনকে ফের নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়। বারবার আবেদন করা এবং টাকা না পাওয়ার জেরে বঞ্চিত মহিলারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। প্রথমে ক্যাম্পেই বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে প্রায় শতাধিক মহিলা বানারহাট বিডিও অফিসের সামনে জড়ো হন। প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট উত্তর না পেয়ে তাঁরা চামুর্চি মোড়ে বানারহাট-চামুর্চি সার্ক রোড অবরোধ করেন।
কোচবিহারে বিক্ষোভ মহিলাদের।
বিক্ষোভকারী নাজমা খাতুনের অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করার পরেও তাঁদের বারবার নতুন করে ফর্ম পূরণ করতে বলা হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে,অন্যদিকে প্রকল্পের টাকা কবে মিলবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারী পার্বতী ওঁরাও দাবি করেন, যাঁদের আবেদন ‘আন্ডার প্রসেস’ তাঁদের আবেদনের বর্তমান অবস্থা প্রশাসনকে স্পষ্ট করতে হবে। নতুন করে আবেদন করানোর নামে হয়রানি বন্ধ করে দ্রুত প্রকল্পের টাকা উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর দাবিও জানান তিনি।
এদিন বিষ্ণুপুরের রসপুঞ্জ এলাকায় পথ অবরোধ, বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারী মহিলারা অভিযোগ করে বলেন, অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পের টাকা না পাওয়ায় রসপুঞ্জ স্কুলে আয়োজিত সেবা সেতু অভিযান শিবিরে তাঁরা গেলে তাঁদেরকে বলা হয় এই শিবিরে এবিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে কিছু হবে না। শিবিরে কর্মরত সরকারি কর্মচারী, আধিকারিকদের কাছ থেকে এধরণের কথা শোনার পরেই মহিলারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। রসপুঞ্জ স্কুল মোড়ে বাখরাহাট- ঠাকুরপুকুর রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। এদিন ডায়মন্ডহারবার ১ ব্লকে অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পে টাকা না পাওয়া কয়েকশো মহিলা হয়রানির অভিযোগ তুলে শিবিরে ভাঙচুর করেন। চেয়ার ভেঙে ফেলে দেন। তাঁদের অভিযোগ, এই শিবিরে আসার জন্য এলাকায় মাইকে প্রচার করা হয়। সেবা সেতু অভিযান শিবিরে তাঁরা অভিযোগ জানাতে গেলে তাঁদেরকে বলা হয়, এই শিবিরে অন্নপূর্ণা ভান্ডার সংক্রান্ত কোন অভিযোগ জানানো যাবে না। এরপরই কয়েকশো মহিলা হয়রানির অভিযোগ তুলে তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে ভাঙচুর করেন। রাজপুর, সোনারপুর, বারুইপুর, বিষ্ণুপুর, মগরাহাট, উস্থি, ফলতা, মন্দিরবাজারসহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পের টাকা না পাওয়ায় ক্ষোভ আছড়ে পড়ে মহিলাদের। চার মাস ধরে টাকা না পাওয়ায় শিবিরে ক্ষোভ উগড়ে দেন তাঁরা। ফরম জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন মহিলারা। রাজপুর সোনারপুর পৌরসভার দাশুমতি ভবনে আয়োজিত শিবিরে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা হয়। যদিও এক আধিকারিকের কথায়, এই শিবিরে অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্প বিষয় নেই। তাসত্বেও মহিলারা তাঁদের অভিযোগ জানাতে শিবিরে ভীড় করেন।
হাওড়ায় মহিলাদের বিক্ষোভ।
শুক্রবার উলুবেড়িয়া মহকুমায় সেবা সেতু শিবিরে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা মিলবে, এমন প্রত্যাশায় ভোর থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বহু মহিলা। কিন্তু পরে শিবিরে এই প্রকল্পের সুবিধা বা আবেদন সংক্রান্ত পরিষেবা মিলবে না বলে জানতে পারেন তাঁরা। এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন মহিলাদের একাংশ।
এদিন উলুবেড়িয়ার রবীন্দ্র ভবনের সামনে সকাল থেকেই ছিল মহিলাদের দীর্ঘ লাইন। তাঁদের অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে সেবা সেতু শিবিরে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাওয়ার কথা প্রচার করা হলেও প্রশাসনের তরফে আগে থেকে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। ফলে দূরদূরান্ত থেকে এসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর পর তাঁরা জানতে পারেন, শিবিরে অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া হবে না। আগে বিষয়টি জানানো হলে তাঁরা আসতেন না বলেও অভিযোগ করেন মহিলারা।
উদয়নারায়ণপুরের গড়ভবানীপুরেও উত্তেজনা ছড়ায়। শিবিরে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা মিলবে না জানতে পেরে ক্ষুব্ধ মহিলাদের একাংশ চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ।
এদিন মেমারি বিডিও অফিসে ‘সেবা সেতু’ ক্যাম্প চলাকালীন হাজার হাজার বঞ্চিত মহিলার তুমুল বিক্ষোভে ছড়িয়ে পড়ল চরম উত্তেজনা। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েন কয়েক হাজার মহিলা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ।বিক্ষোভের জেরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে মেমারির বিধায়ক মানব গুহর গাড়ি, যার চারপাশ ঘিরে তীব্র স্লোগান ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন বঞ্চিত মহিলারা।
Comments :0