বানভাসি মানুষের সাহায্য তো হলোই না উল্টে পড়তে হলো সমস্যায়। ঘর তৈরির ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে জমিতে ঘর উঠবে, সেই ভিটেমাটির চিহ্নটুকুও মুছে দিয়েছে গত বছরের অক্টোবরের বিধ্বংসী বন্যা। কোথাও বিঘার পর বিঘা বালির স্তূপ, কোথাও জমি ধুয়ে নিশ্চিহ্ন। অথচ সেই ভিটে সংস্কার বা বিকল্প জমির কোনও ব্যবস্থাই করেনি সরকার। নাগরাকাটা ব্লকের ঝাড়তন্ডু এলাকার প্রায় ২০টি পরিবার এখন সরকারি টাকা প্রথম ধাপের ৬০ হাজার হাতে পেয়েও চরম বিপাকে। প্রশাসনিক এই অদূরদর্শিতা ও উদাসীনতার মাশুল গুনছেন নিঃস্ব মানুষগুলো।
ভয়াবহ বন্যার পর চার মাস অতিক্রান্ত। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালেও ঝাড়তন্ডুর পরিস্থিতি একচুলও বদলায়নি। মঙরু ওঁরাও, বুদ্ধিমান ওঁরাও, শিলা মাঝি, সুস্মিতা ওঁরাও, অজিত ওঁরাওদের মতো প্রায় ২০টি পরিবারের বাসিন্দারা আজও ভাঙা ঘর বা অস্থায়ী ত্রিপলের নিচে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ঘর তৈরির টাকা সরকারি খাতায় বরাদ্দ হলেও বাস্তুভিটে বাসযোগ্য না হওয়ায় সেই টাকা কার্যত কোনও কাজেই আসছে না। ভিটে জুড়ে শুধু বালি আর বালি। দুর্গত বাসিন্দা সুস্মিতা ওঁরাও-এর কথায়, "সরকার টাকা দিয়েছে ঠিক, কিন্তু ঘরটা গাঁথব কোথায়? বালি না সরালে কি ভিত গড়া যায়? না আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, না আছে ভিটে পরিষ্কার করার সামর্থ্য।"
বাগান সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় ঘর তুলতে চাইলেও চা বাগান বন্ধ থাকায় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। অনুমতি ছাড়া ঘর তুললে পরবর্তীতে চা বাগান কর্তৃপক্ষ বা কোম্পানি তা ভেঙে দিতে পারে, এই আশঙ্কায় ঘর তৈরি করতে পারছেন না তারা।
প্রশাসনের এই হঠকারী ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিপিআই(এম) জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক পীযুষ মিশ্র। দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সাফ জানান, "ভিটে নেই তো ঘর কোথায়? এই মৌলিক প্রশ্নটাই এড়িয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। আগে ওই এলাকার বাঁধ এবং বালিতে ঢাকা জমি সংস্কার করা প্রয়োজন ছিল। বালি না সরিয়ে ঘর তোলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সরকার ক্ষতির গভীরতা না বুঝেই দায়সারাভাবে কিছু টাকা দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।" শুধু তাই নয়, বর্তমান বাজারে নির্মাণ সামগ্রীর যে আকাশছোঁয়া দাম, তাতে এই সামান্য টাকায় ভিটে সংস্কার করে ঘর তোলা যে কার্যত অসম্ভব, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রশাসনের এই অমানবিক টালবাহানার প্রতিবাদে সরব হয়েছে সিপিআই (এম)। সিপিআই(এম) নাগরাকাটা এরিয়া কমিটির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে নাগরাকাটা বিডিও এবং সুলকাপাড়ার প্রধানের কাছে ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়েছে। দুর্গত পরিবারগুলোর দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলনে রয়েছে তারা। নাগরাকাটা এরিয়া কমিটির সম্পাদক শের বাহাদুর লিম্বু সাফ দাবি করেন যে অবিলম্বে জেসিবি লাগিয়ে বালি সরিয়ে জমি বাসযোগ্য করতে হবে। পাশাপাশি, ক্ষয়ক্ষতির গুরুত্ব অনুযায়ী বর্ধিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, শাসকদলের ঘনিষ্ঠরা অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা পেলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হচ্ছেন অথবা প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে আটকে পড়ছেন।
Comments :0