পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্ত থেকে প্রাথমিক যে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে তাতে পরিষ্কার বারুইপুরের কিশোরী শুধু দলবদ্ধ ধর্ষণেরই শিকার হয়নি তাকে খুন করা হয়েছে চরম নৃশংসতায় ও বর্বরতায়। যৌনাঙ্গ সহ সর্বাঙ্গে প্রায় চল্লিশটি আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। রাতভর চার-পাঁচজন ধর্ষণের পর অচেতন মৃতপ্রায় মেয়েটির গলায় পা দিয়ে চেপে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। অতপর বস্তায় ভরে ফেলা হয়েছিল পুকুরের জলে। পেটে বিস্তর জল থাকায় এটা নিশ্চিত জলে ফেলার সময়ও বেঁচেছিল। বিকেলে অপহরণের পর থেকে রাতে ধর্ষণ-নির্যাতনের পর জলে ফেলা হয়েছে। পুলিশে খবর দেবার পর পুলিশ যদি তৎপরতার সঙ্গে অনুসন্ধান শুরু করত তাহলে মেয়েটিকে জীবিত উদ্ধার করা যেত। কিন্তু পুলিশ তা করেনি। এমনকি প্রথমে অভিযোগ নথিভুক্ত করতেই চায়নি। তাচ্ছিল্যের সুরে বাড়ির লোকদের বলেছিল খোঁজ নিন হয়তো বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গেছে। পরে অবশ্য বিক্ষোভের চাপে এফআইআর নিয়েছিল তবে তদন্তে কোনও সক্রিয়তা দেখায়নি। প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সক্রিয় হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ আসার পর থেকে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ এলেই পুলিশ সক্রিয় হবে নচেৎ থানায় বসে হাওয়া মাপবে।
এই মুখ্যমন্ত্রীই বলেছিলেন পুলিশকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে আইনের শাসন চলবে। এটাই কি আইনের শাসনের নমুনা? কাকদ্বীপের সিপিআই(এম) দম্পতিকে পুড়িয়ে মারা, নদীয়ায় তামান্না খুনের মামলাতেও দেখা গেছে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেবার পর খুনিরা গ্রেপ্তার হয়েছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে পুলিশ তৎপর হবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য মাফিক। তিনি হুকুম দিলে পুলিশ কাজে নামবে।
বারুইপুরের ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী দু’টি বিষয় স্পষ্ট করে বলেছেন, ধর্ষিতার বাবা যেমন চাইবেন তেমনই সাজার ব্যবস্থা হবে। আর বলেছেন বিক্ষোভের ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য ছিল। তাদের তিনি ছেড়ে কথা বলবেন না। অর্থাৎ সচেতনভাবে তিনি এক নৃশংস ও বর্বর খুন-ধর্ষণের ঘটনায় আমজনতার স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক রং চড়িয়ে নিজেই সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছেন। এটা কোনও মুখ্যমন্ত্রী করতে পারেন না। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান টার্গেট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তিনি হুমকি দিয়ে রাখলেন। অথচ ঘটনার পর থেকে টানা যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে তাতে অংশ নিচ্ছেন সব অংশের মানুষ। বাংলার জাগ্রত জনতা ধর্ষিতার ধর্ম, ধর্ষকেরও ধর্ম খোঁজে না। সেটা খোঁজে বিজেপি’র দল এবং তাদের নেতারা।
মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়াল করে গেছেন। তার একটি পুলিশের ভূমিকা। পুলিশ সক্রিয় হলে মেয়েটাকে হয়তো বাঁচানো যেত। তাহলে তার খুনের দায় পরোক্ষে পুলিশের ওপরও বর্তায়। সেই দায় তো মুখ্যমন্ত্রীর নিজেরও, কারণ তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও। অপরটি দলের নেতার ভয়ঙ্কর অপরাধ আড়াল করা। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় স্থানীয় মানুষ যখন নিজেরাই অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে এবং ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় তখন মুখ্যমন্ত্রীর দলের স্থানীয় নেতা সেই অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে নেবার ব্যবস্থা করে। পুলিশ আইনের শাসন শিকেয় তুলে শাসক নেতাদের নির্দেশকে মান্যতা দেয়। এই দু’টি ঘটনার কথা এবং তাতে সরকারের অবস্থান মুখ্যমন্ত্রী সোচ্চারে বললেন না কেন? তাতে দল ও সরকার বেকায়দায় পড়বে বলে? সেজন্যই কি খুন-ধর্ষণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙাতে চাইলেন? এটা আইনের শাসনের নতুন নয়। হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসনের নামান্তর।
editorial
এটা কি আইনের শাসন?
×
Comments :0