শীতলকুচিতে স্বঘোষিত গোরক্ষকদের আক্রমণে নৃশংসভাবে খুন হওয়া গরিব মজুর মন্টু মিঞার মৃতদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ সোমবার পর্যন্ত একজনকেও গ্রেপ্তার করেনি। গোটা গ্রামের মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রয়েছেন। ঘটনাটি সম্পর্কে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন হিংস্র গোরক্ষক বাহিনীর আতঙ্কে।
সিপিআই(এম)’র কোচবিহার জেলা নেতৃবৃন্দ নিহত মন্টু মিঞার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আইনজীবী দিয়ে তাঁদের সহায়তা করছেন। কিন্তু পুলিশের দিক থেকে তৎপরতার অভাবে খুনিরা অধরা থাকায় আতঙ্ক কাটছে না গ্রামে। পার্টির কোচবিহার জেলা সম্পাদক অনন্ত রায় এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি এদিন জানান, মঙ্গলবারই নিহত পার্টিকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ওই গ্রামে পার্টির প্রতিনিধিদল যাবে। প্রতিনিধিদলে থাকবেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি, রাজ্য কমিটির সদস্য অলকেশ দাস, অনন্ত রায়, জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অমিত দত্ত, মোকসেদুল আলম ও প্রসেনজিৎ সরকার।
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর গোরক্ষকদের হামলায় প্রথম শহীদ মন্টু মিঞা সিপিআই(এম)’র কর্মী ছিলেন। নির্বাচনের সময়েও তিনি সক্রিয়ভাবে পার্টির কাজ করেছেন। বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের দু’মাস পর গত শনিবারই প্রথম শীতলকুচির গোসাইয়ের হাটে গোরুর কেনাবেচা শুরু হয়। এখানেই গোরু কেনেন পাঠানটুলি গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব মিঞা। তাঁর কেনা গোরুটি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই শনিবার গোরু নিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন মন্টু মিঞা। গোরু কেনার পর সেই গোরু ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সামান্য উপার্জন করতেন তিনি, রাখাল হিসাবেই পরিচিত ছিলেন। তিনি গোরু নিয়ে রওনা দেওয়ার সময়ই সম্ভবত আততায়ীরা তার পিছু নিয়েছিল। পরে রবিবার সকালে তাঁর ক্ষতবিক্ষত অ্যাসিডে পোড়া মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে।
মাঝবয়সী মন্টু মিঞা শীতলকুচির গোলেনাওহাটির স্থায়ী বাসিন্দা হলেও বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। সোমবার সকালে খুন হয়ে যাওয়া মন্টু মিঞার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গোটা পরিবার শোকস্তব্ধ হয়ে আছে। প্রত্যেকেই ভীতসন্ত্রস্ত। মৃতের স্ত্রী আসেদা খাতুন বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তার মধ্যেই তিনি জানালেন, ‘‘শনিবার ভোরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় উনি বলে গিয়েছিলেন, রাতে বাড়িতে ফিরে মেয়েকে নিয়ে একসঙ্গে খাবেন। রাতে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সবাই তাঁকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। ৭ বছরের মেয়ে রিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আমিও প্রায় সারা রাত আশপাশের রাস্তায় স্বামীকে খুঁজেছি। বাড়ি থেকে এত দূরে স্বামীর মৃতদেহ পাওয়া যাবে, এটা কল্পনাও করতে পারিনি।’’
এদিকে ছোট্ট মেয়ে রিয়া পারভিন বুঝতেই পারছে না যে তার বাবা আর বেঁচে নেই। ক্লাস টু’র পড়ুয়া রিয়া জেদ করছিল স্কুলে যাওয়ার জন্য। নিহত মন্টু মিঞার শ্যালক আসিদুল মিঞা বললেন, ‘‘শনিবার সারারাত মন্টু মিঞা বাড়িতে না ফেরায় আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে ছিলাম। কিন্তু ও যে খুন হতে পারে, এটা কল্পনাতেও ছিল না।’’
নিহতের শ্বশুর তারিক মিঞা এবং শাশুড়ি জুলেখা বিবি বললেন, ‘‘মন্টু খুব কম কথা বলতো। সারাদিন উপার্জনের জন্য নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতো। আমরা ভেবেছিলাম শনিবারও কাজেই বেরিয়েছে, ফিরে আসবে।’’ তারিক মিঞা বললেন, ‘‘বিধানসভা ভোটের ফল বেরোনোর পরেই শীতলকুচি থানা এলাকায় বিভিন্ন হাটে গোরু বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর তাতেই পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছিল মন্টু। শনিবার প্রথম হাট বসবে জেনে ভোরবেলায় সে বের হয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। ওর গোটা শরীর যেভাবে সম্ভবত অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে ওর দিকে তাকানোই যাচ্ছিল না।’’
এই ঘটনায় শুধুমাত্র মন্টু মিঞার পরিবার আতঙ্কিত ও শোকগ্রস্ত নয়, শীতলকুচি ব্লকের গোলেনাওহাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের নগর শিঙিমারি এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলির প্রায় সবাই চরম আতঙ্কে রয়েছেন। মন্টু মিঞার প্রতিবেশী সমসের আলি বলেন, ‘‘ওর দেহের বিভিন্ন অংশে এত আঘাতেই স্পষ্ট একাধিক ব্যক্তি মন্টুর ওপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে অ্যাসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছে। এরপর মৃতদেহটি নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়। মন্টুর মতো সরল, সাদাসিধে মাঝবয়সি মানুষকে এভাবে নৃশংসতার সাথে যারা খুন করল, তাদের শাস্তি হোক এটাই আমরা চাই।’’
রবিবার সকালে শীতলকুচির খুটামারা নদীর যে চান ঘাটের নির্মীয়মাণ সেতুর নিচে মন্টু মিঞার দেহ উদ্ধার হয়, সেই এলাকায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না। গোটা এলাকা প্রায় জনমানবশূন্য। মুখ খুললেই ঘাতকদের রোষের শিকার হতে হবে, এটা ভেবেই সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাচ্ছিলেন এই এলাকার বাসিন্দারা। রবিবার মৃতদেহ উদ্ধারের পর সকাল দশটা পঁচিশ মিনিটে মন্টু মিঞার পরিবারের পক্ষ থেকে শীতলকুচি থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর তা এফআইআর হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ; যার কেস নম্বর-৩৫/২৬। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পরেও কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
সিপিআই(এম)’র কোচবিহার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মোকসেদুল ইসলাম, প্রসেনজিৎ সরকার, পার্টিনেতা নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ, রাখাল চন্দ্র সরকার প্রমুখ নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের আইনি লড়াইয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিহত মন্টু মিঞার স্ত্রী আসেদা খাতুন, ৭ বছরের মেয়ে রিয়া পারভিন এবং পরিবারের সদস্য আসিদুল মিঞা ও তারিক মিঞা সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দের পরামর্শ নিয়ে সোমবার কোচবিহার জেলার আইনজীবী পার্থপ্রতিম সেনগুপ্তের সঙ্গে দেখা করেন। পার্থপ্রতিম সেনগুপ্ত জানান, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল সেটি ২৪ ঘণ্টা পরে পুলিশ এফআইআর হিসাবে গ্রহণ করলেও এখনও পর্যন্ত কোন ধারায় মামলা রুজু হয়েছে সেটি স্পষ্ট নয়। তদন্তকারী পুলিশ অফিসার কোন ধারায় মামলা করলেন সেটি আমরা জানার চেষ্টা করছি।
Coochbehar Cow Vigilance
দু’দিন পার, গরিব মজুরের খুনি গোরক্ষকরা অধরা শীতলকুচিতে
×
Comments :0