প্রবন্ধ | নৌকা, নদী, বলাগড়ের নৌকা শিল্প এবং শ্রেণী সংগ্রাম
অয়ন মুখোপাধ্যায়
মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৩ জুলাই ২০২৬
মহাজন তাড়ানোর নতুন উপায়
তাহলে কি আমরা ধরে নেব বলাগড়ের এই শতাব্দি প্রাচীন নৌকার গল্পটা এখানেই শেষ? শহরের মধ্যবিত্তরা শুধু কফি কাপে চুমুক দিয়ে হা-হুতাশ করবে আর কারিগররা স্রেফ না খেতে পেয়ে মরবে? তা নয়। ইতিহাস আমাদের যেমন শোষণের অংক শেখায়, তেমনই ঘুরে দাঁড়ানোর উপায়টা ও দেখায়। জি আই ট্যাগ যখন পাওয়াই গেছে, তখন এই ট্রফিটাকে শুধু ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে না রেখে, একেই কারিগরদের বাঁচার হাতিয়ার করে তুলতে হবে। আর তার জন্য দরকার একটা খোল নলচে বদলে ফেলার মতো পরিকল্পনা।
সবচেয়ে আগে যেটা দরকার, তা হলো মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনদের ওই একচেটিয়া সিন্ডিকেটটা ভাঙা। কারিগর দের নিজেদের একটা ‘কো-অপারেটিভ’ বা সমবায় সমিতি গড়তে হবে। যেখানে কাঠ কেনা থেকে শুরু করে নৌকা বিক্রি—সবটাই হবে সমবায়ের মাধ্যমে, তখন মহাজনের চড়া সুদের জালটা ছিঁড়ে যাবে। সরকার যদি সরাসরি এই সমবায়কে সুলভে বা ভরতুকি তে কাঠ জোগানের ব্যবস্থা করে, তবে কাঁচামালের জন্য কারিগরদের আর কারও দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
নতুন ব্যবসা ও পরিবেশবান্ধব নৌকা
দ্বিতীয়ত, আমাদের মাথায় ঢোকাতে হবে যে ঐতিহ্য মানেই পুরোনো দিনের অন্ধকূপ নয়। ঐতিহ্যকে আধুনিক হতে হয়। কারিগরদের শুধু ছেনি আর হাতুড়িতে আটকে না রেখে, তাঁদের হাতে আধুনিক কাঠের কাজের টুলস তুলে দিতে হবে, যা তাঁদের খাটুনি কমাবে আর উৎপাদন বাড়াবে। এর পাশাপাশি, শুধু বড় মালবাহী নৌকার ভরসায় বসে থাকলে চলবে না। আজ বাংলার পর্যটন বা ট্যুরিজম বাড়ছে। বলাগড়ের এই কারিগরদের যদি একটু প্রশিক্ষণ দিয়ে বিলাসবহুল হাউসবোট, শিকারা বা আধুনিক ওয়াটার স্পোর্টসের বোট তৈরিতে কাজে লাগানো যায়, তবে কিন্তু একটা নতুন এবং বিরাট বাজার খুলে যাবে।
ট্যাগের আসল জোরটা লুকিয়ে থাকে ব্র্যান্ডিং-এ। বড় কর্পোরেট কোম্পানি গুলো যেভাবে নিজেদের প্রোডাক্ট বিক্রি করে, ঠিক সেই কায়দায় বলাগড়ের নৌকার পরিবেশ বান্ধব দিক টাকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে হবে। প্লাস্টিক আর ফাইবারের যুগে কাঠের নৌকার কোনো দূষণ নেই—এই গুণটা কে হাতিয়ার করে যদি সরাসরি রিসর্ট ব্যবসায়ী বা পরিবেশ প্রেমী আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে কারিগরদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া যায়, তবে লাভের টাকাটা আর মাঝপথের দালালরা লুঠ করতে পারবে না; তা সরাসরি ঢুকবে কারিগরদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
বলাগড়ের নৌকা ও নদীর এই কোলাজ তাই কোনো চিরস্থায়ী কান্নার গান নয়। পুঁজি প্রতি যুগে রূপ বদলে শ্রমকে শুষে নেয় ঠিকই, কিন্তু সেই পুঁজির চোখেই চোখ রেখে যদি কারিগররা সমবায়ের শক্তিতে আর আধুনিক প্রযুক্তির পিঠে চড়ে দাঁড়াতে পারে, তবেই এই জি আই ট্যাগ সার্থক হবে। সমকালের ইতিহাস স্রেফ ধ্বংস হয়ে যাওয়া নৌকা শিল্পের কফিনে নস্টালজিয়ার পেরেক ঠোকা নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরে তাকে আজকের যুগের দরবারে পরিবেশ বান্ধব বলে কাঠের নৌকাকে বিশ্ব বাজারে প্রতিষ্ঠা করা।
আসলে, বলাগড়ের এই ডিঙি নৌকোগুলো কেবল কাঠের কাঠামো নয়, ওগুলো নদীর বুকে ভেসে থাকা এক একটা জেদি প্রাণ। পলি জমলে নদীর গভীরতা কমে, কিন্তু মানুষের লড়াইয়ের গভীরতা কমে না। জি আই ট্যাগের আন্তর্জাতিক সিলমোহরটা তখনই কারিগরের পকেটে ঢুকতে পারবে, যেদিন বিশ্ববাজারের হাতুড়িটা মহাজনের সিন্দুক ভেঙে সরাসরি শ্রমের প্রকৃত দাম ফিরিয়ে দেবে। সেদিন হয়তো ভাগীরথীর জল আর কোনো শোষণের সাক্ষী থাকবে না; বরং স্রোতের বিপরীতে দাঁড় টেনে নিজস্ব অধিকার বুঝে নেওয়া এক প্রান্তিক, লড়াকু মানুষের বিজয়ের শরিক হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে বলাগড়। দাঁড়াবে বলাগড়ের নৌকা।
সমাপ্ত
Comments :0