গল্প
মুক্তধারা
-------------------------------
স্মৃতিতে হেমন্ত
-------------------------------
রাহুল চট্টোপাধ্যায়
হেমন্তের বিকেলের একটা অদ্ভূত মেদুরতা আছে। একটা মনখারাপ করা বিষণ্ণ সময় হাতছানি দেয়। কবোষ্ণ রোদ চুঁইয়ে যখন বিকেল নামে তখন সবটুকু চেতনাকে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে নামে ।সমগ্ৰ অতীত যেন সামনে এসে দাঁড়ায়। কে যেন ডাকে অসীম অনন্ত কোন সীমা পেরিয়ে। অস্তিত্বের মূল ধরে নাড়া দেয়। হেমন্তের অবসাদ জীবন ছুঁয়ে কখনো চলে অন্য কোন লোকে।
একটা বিষাদের রোদ্দুর ক্রমশই গড়িয়ে চলে নিভে আছে যাওয়ার দিকে। শীতের হালকা চাদর নিয়ে কখন সন্ধে হয়ে যায় বোঝা যায় না। বারান্দার রেলিঙ আর নৌকো চেয়ারটা খালি পড়ে থাকে মায়াময় সন্ধেটায়।
অলকেশ বাবু বারান্দার এককোনে দাঁড়িয়ে চারিদিকে দেখেন-সন্ধ্যে নামছে। বিকেলটা ক্রমশই ছোট হতে হতে এবার মিলিয়ে যাবে। দুপুর মানেই পড়ন্ত বিকেল,আর বিকেল মানেই সন্ধ্যে।
এমন বিকেল স্মৃতিতে টেনে আনে। অলকেশ বাবুও ভারাক্রান্ত হন স্মৃতিতে। যশোরের এমন বিকেলে ছোটবেলা খেলাধুলো, পুকুর পাড়ে ঘোরা ,বাড়ির বড়দের বকুনি আবার ভালোবাসা সব মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে বাড়ির উঠোনে থাকা বড়ো অশ্বত্থ গাছটাকে।জ্যষ্টির দুপুরে কতো অচেনা মানুষ বেড়া ডিঙিয়ে উঠোনে চলে আসতো, অশ্বত্থের ছায়ায় শরীর জুড়িয়ে নিতে।গাছটা ছিল মিলনের রূপ। তারপর একদিন একদল পশুর মতো এলো, মারামারি, কাটাকাটি দেশভাগ, পালিয়ে আসা, অসহায় নিরাশ্রয় জীবন, মানুষের মতো বাঁচার লড়াই...
আজ সেসব মনে পড়ে শিহরিত হন অলকেশ বাবু। হেমন্তের বিকেলের বিষাদ জড়িয়ে ধরে চেতনাকে। ভয় হয়। মনে হয় আবারও বুঝি কোন শত্রুর হাতে পড়ে এ জীবনের দ্বিতীয় আশ্রয়টা হারিয়ে না যায়। স্মৃতির অশ্বত্থ গাছটার মতো মড়মড়িয়ে ভেঙে পড়ে।একটা অন্যরকম নিরাশ্রয়তার বোধ ভারী করে তোলে মনটাকে।
ভাবতে ভাবতে আবছা সন্ধ্যেয় দূরে তাকান অলকেশ বাবু। চারিদিকে আলো জ্বলে উঠেছে।কোথা থেকে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে। ঘনায়িত অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু আলো যেন মশালের মতো জ্বলে উঠেছে। অশ্বত্থ গাছ,হিজল বন, নদী, আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই সব মিলিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেন অলকেশ বাবু -একটা নতুন সকালের স্বপ্ন।
Comments :0