Post Editorial

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক ঘটনাবলী প্রসঙ্গে কিছু কথা

সম্পাদকীয় বিভাগ

কেশব ভট্টাচার্য
 

গত ১৯ আগস্ট গভীর রাতে এবং ২০ আগস্ট দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে, যাদবপুরের বিজেপি বিধায়িকা এবং আরএসএস’র ছাত্র সংগঠনের রাজ্য নেতৃত্বের উপস্থিতিতে গুন্ডামি, পেশি শক্তির আস্ফালন, আগুন লাগানো, এমনকি নন্দলাল বসুর নকশা করা ঐতিহ্যবাহী এমব্লেমটিকে ভাঙার মতো যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে রাজ্যের শিক্ষানুরাগী মানুষের কাছে তা যথেষ্ট উদ্বেগের। এই বর্বরোচিত আক্রমণের ঘটনা লজ্জায় রাজ্যের মানুষের মাথা হেঁট করে দিয়েছে। ১৯৭৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসাবে যুক্ত হয়েছিলাম। সেই থেকে অদ্যাবধি বিভিন্নভাবে (ছাত্র, গবেষক, অধ্যাপক) যুক্ত থাকার সু‍‌যোগ ঘটেছে। বহু সময় নানান ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিছু গন্ডগোলের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এবারের এই গুন্ডামির ঘটনার মতো ঘটনা অতীতে কখনও ঘটেনি। তাই ১৯ এবং ২০ আগস্ট ঘটে যাওয়া ঘটনা শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা হিসাবে না দেখে শিক্ষাঙ্গনের ‌আশঙ্কার দিক হিসাবে ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। এই প্রসঙ্গে যাবার আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গড়ে ওঠার প্রতিটি পরতে যে ঐতিহ্য তা একবার ফিরে দেখা দরকার।
১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিকায় প্রথমে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (ন্যাশানাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন) প্রতিষ্ঠিত হয় অরবিন্দ ঘোষ, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখের উদ্যোগে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে জাতীয় ভাবধারায় সাহিত্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা দেওয়া। পরবর্তীকালে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ও বেঙ্গল উচ্চ টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এই দুটি প্রতিষ্ঠান ১৯১০ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে চলে আসে এবং ১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ করে। এইভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করে দেশের মানুষের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমিকায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, জন্মলগ্ন থেকেই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বতন্ত্র, প্রতিবাদী চরিত্র রয়েছে। সেই কারণে বিভিন্ন ঘটনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক বা ‍ শিক্ষাকর্মীদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের একটা বহুমুখিতা রয়েছে, অন্য ধরনেরও হয়ে থাকে। কিন্তু এই প্রতিবাদ আন্দোলনগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠন-পাঠন-গবেষণার ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে সে কথা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন থেকেই যায় — শিক্ষার উৎসবের পীঠস্থান, এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর শাসক দলের এত আক্রমণ কেন? এই প্রসঙ্গে কিছু কথা আলোচনা করা প্রয়োজন।
বিজেপি এবং আরএসএস দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সরকার পোষিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে পরিকল্পনা মাফিক বেসরকারিকরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত, গণতান্ত্রিক পঠন-পাঠন, শিক্ষাঙ্গনে খোলামেলা পরিবেশ, মুক্ত চিন্তার সুযোগ, গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি অবৈজ্ঞানিক ধর্মান্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে বদ্ধপরিকর বি‍জেপি এবং আরএসএস। আমাদের রাজ্যে এবং অন্য রাজ্যেও যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, জেএনইউ, এমন আরও কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের  নাম করা যায়, যেসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজ্যের এবং দেশের শাসকদলের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন হয়েছে, জারি থেকেছে প্রতিবাদ। আর এই প্রতিবাদ আন্দোলন একেবারেই পছন্দ নয় দেশ এবং রাজ্যের শাসকদলের নেতা নেত্রীদের। তাই জেএনইউ-তে একটি ছাত্র সংগঠনের গুন্ডাদের হাতে রক্তাক্ত হতে হয় ঐশী ঘোষকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম ভাঙা হয় পুলিশের সামনে। গভীর রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আগুন লাগায় বি‍‌জেপি’র  দুষ্কৃতীরা।
প্রকৃতপক্ষে আরএসএস-বিজেপি চায় প্রশ্নাতীত বশ্যতা, কোনও প্রশ্ন নয়। যেটা হলেই মানুষের মগজে-মননে-চিন্তায়-চেতনায় খুব সহজেই ধর্মান্ধতার আস্তরণ দেওয়া যাবে। এই কাজ করতে পারলে গোরুর দুধে সোনা খুঁজে পাওয়া যাবে, গণেশ মূর্তি দেখিয়ে প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারির গল্প সহজে বিলি করা যাবে। এককথায় ধর্মতত্ত্বকে (মাইথোলজি) দর্শন (ফিলোজফি) এবং পুরাণকে (মিথোলজি) ইতিহাস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করাই আরএসএস-বিজেপি’র লক্ষ্য। আর এখানেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে সমস্যা, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার পরিবেশ, ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী-গবেষক, আধিকারিকদের পারস্পরিক সুসম্পর্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাত্মতা, অপ্রতুল সরকারি অর্থানুকূল্য সত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে ধারাবাহিক উৎকর্ষতা, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের‍‌ বৈশিষ্ট্য। আজগুবি মনগড়া কথা বলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরএসএস-বিজেপি’র পক্ষে দাগ কাটা সম্ভব হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়‌কে নিয়ে শাসকদলের মাথা ব্যথার এটাই কারণ।
সোজা পথে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কবজা করা যাচ্ছে না তখন শুরু হয়েছে বল প্রয়োগের পদ্ধতি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন আরএসএস-বিজেপি’র তরফে এই ধরনের বলপ্রয়োগের ঘটনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগেও ঘটেছে। কয়েক বছর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন রাজ্যপাল মাননীয় জগদীপ ধনকড় এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় এর উপস্থিতিতে বহিরাগত বাহুবলীরা যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল সে কথা সকলেরই মনে আছে। ঘটনার পরের দিন এবিভিপি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখলের আহ্বান জানায়। ঐদিন এবিভিপি-র বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে ঢোকা আটকাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী-গবেষক-আধিকারিকরা গেটের বাইরে রাস্তায় মানব শৃঙ্খল ‍‍‌তৈরি করে রেখেছি‍‌লেন। শেষ পর্যন্ত পু‍‌‍‌লিশ প্রশাসনের কিছুটা উদ্যোগে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ আটকানো গিয়েছিল। অতীতে যখনই এই ধরনের বহিরাগতদের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে,  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের অংশীদারদের সমবেত প্রচেষ্টায় তা প্রতিহত করা গেছে। ‍নিশ্চিতভাবেই এইভাবেও বহিরাগতদের বর্বর আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হবে। কিন্তু এবারের আক্রমণের ধরণ অন্যবারের থেকে পৃথক। তাই সেই সম্পর্কে কয়েকটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
অতীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর বহিরাগত আক্রমণের ঘটনাগুলি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এবারের আক্রমণ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক রাজ্য সরকার তথা রাষ্ট্রের মদতে সংগঠিত হয়েছে। আর তাই এইবারের ঘটনা আরও বিপজ্জনক এবং দুশ্চিন্তারও বটে। আসলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী চরিত্র শাসক দলের এতটাই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত রাজ্য নির্বাচনী প্রচারে এসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেন এবং একটি ভাষণে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দিমাগি নকশাল’ থাকার এবং তার বিপদের কথা বলেছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ থাকবে সেটাই স্বাভাবিক — এই কথাটা আরএসএস-বিজেপি কবে বুঝবে?
প্রধানমন্ত্রীর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক উক্তি করবার সময়ই বোঝা গেছিল বড় কিছু ঘটবে। গত ১৯ এবং ২০ আগস্ট ঠিক সেটাই ঘটল। আরএসএস-বিজেপি’র মদতপুষ্ট কিছু বহিরাগত গুন্ডা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেচ্ছ গুন্ডামি চালালো যাদবপুরের বিধায়িকার উপস্থিতিতে।
শুনতে পেলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্জিকাল স্ট্রাইক করা হবে। মাননীয়া বিধায়িকার শরীরী ভাষা, এক ঘণ্টার মধ্যে কিছু ছাত্রকে হাজির না করালে সারারাত ক্যাম্পাসে তাণ্ডব চালানো হবে— এই ধরনের উক্তি, ২০ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪নং গেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম ভাঙা, রাজ্যের মদতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থিতি নষ্ট করার অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। যাদবপুরে যদি দিমাগি নকশাল থাকে,  দেশ‍‌বিরোধী কার্যকলাপ হতে থাকে সেটা দেখার জন্য প্রশাসন, শিক্ষা দপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রী, আচার্য আছেন। বিধায়িকার সারা রাত তাণ্ডব চালানোর হুঙ্কার দেবার কি প্রয়োজন? একে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাড়া আর কি বলা যায়!
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, প্রকাশ্য জনসভায় বললেন যাদবপুরে ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে হবে। প্রতিবছর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে বন্দেমাতরম ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় প্রতিবছর। মুখ্যমন্ত্রী এটাকে বলেছেন রাখি পূর্ণিমার দিন দশ হাজার মানুষ যাদবপুরে বন্দেমাতরম গাইবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এই ঘটনা ঘটলে আপত্তির কিছু নেই— কিন্তু ক্যাম্পাসের ভিতর এত বহিরাগতর সমাবেশ ঘটলে, অঘটন কিছু ঘটতেই পারে। তার দায় কে নেবে?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী চরিত্র ধ্বংস করতে সক্রিয় আরএসএস-বিজেপি। যাদবপুরে গভীর রাতে হকার উচ্ছেদের সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অকুতোভয় হয়ে বুলডোজারের সামনে দাঁড়ি‍‌য়ে পড়া শাসকদল ভালোভাবে নেয়নি এবং তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয় যার শিক্ষাগত উৎকর্ষের খ্যাতি জগৎজোড়া, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর নিরলস প্রচেষ্টায় যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয় ভীতি না দেখিয়ে বলপ্রয়োগ না করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য এবং চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করাই সকলের কর্তব্য। এই কাজ করলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজ্য তথা দেশের উচ্চশিক্ষার অগ্রগতি ঘটবে। নেতিবাচক এবং ধ্বংসাত্মক চিন্তা ভাবনা সরিয়ে রেখে সমবেতভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষের জন্য কাজ করাই এখন সময়ের দাবি।  
 

Comments :0

Login to leave a comment