JOURNEY — GOMUKHA — AVIK CHATARJEE — MUKTADHARA — 4th YEAR — 11 JULY 2026

ভ্রমণ — স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ — অভীক চ্যাটার্জি — মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ১১ জুলাই ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

JOURNEY  GOMUKHA  AVIK CHATARJEE  MUKTADHARA  4th YEAR  11 JULY 2026

ভ্রমণস্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ

          অভীক চ্যাটার্জী 

মুক্তধারা৪র্থ বর্ষ —  ১১ জুলাই ২০২৬

পঞ্চম পর্ব

গঙ্গোত্রী যাওয়ার পথে একটা ছোট্ট জনপদ পড়ে পাহাড়ের গায়ে। পাইন দেওদারের গগনচুম্বী সমারোহ আর ভাগীরথীর নিরন্তর গর্জনের মধ্যে ছবির মতো সুন্দর এক ছোট্ট গ্রাম হরশীল। হরশিলে হয়তো খুব কিছু দর্শনীয় নেই, অথবা পুরোটাই দর্শনীয়।

আমরা বেশ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম হরশিলের উদ্দেশ্যে। আমাদের গঙ্গোত্রী যাওয়ার পথে একদিনের একটা বিশ্রাম আছে এখানে। এই জায়গাটায় খুব অত্যাশ্চর্য কিছু হয়তো দেখার নেই, কিন্তু এক অদ্ভুত প্রশান্তি আছে এই নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায়। একদিন এখানে থাকতে ভারী ভালো লাগে। তবে এই গ্রামটা আমার মনে থেকে গেছে এই গ্রামের স্কুলের জন্যে। সে কোথায় পরে আসছি।

প্রথমে গিয়ে একটা ছোট্ট হোটেল দেখে সেখানে আমাদের ব্যাগপত্র রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম এই ছোট্ট গ্রামটা ঘুরে দেখব বলে। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ছে আমাদের গায়ে। পাহাড়ি নদীর শব্দ আর হিমালয়ান মোনালের ডাক শোনা যায় মাঝে মাঝে। রোদের উষ্ণতায় শীত একটু কম তবে পাহাড়ি ঠান্ডা হাওয়া গায়ে কাঁপন ধরিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই পাহাড়ি গ্রামের পথে এগিয়ে চলেছি হিমালয় কে সামনে রেখে।

একটু এগোনোর পর আমরা দেখলাম কয়েকটা আপেলের গাছ। ছোট ছোট আপেল ধরেছে তাতে। আমরা একটু অবাকই হই, যে খোলা মাঠে আপেল গাছ, তবু কেউ নিয়ে যায়নি! সততার এহেন নিদর্শন ভূভারতে কম ই পাওয়া যায়। আমরা একটু এগিয়ে গিয়ে একটা পেড়ে কামড় বসাতেই আমাদের ভুল ভেঙে গেলো। ভয়ঙ্কর টক! টেনিদার সেই পেশোয়ার কি আমির কেও হার মানায় বলা যেতে পারে। যাই হোক, আমরা আসতে আসতে এগিয়ে যেতেই আমাদের চোখে পড়ে একটা ছোট্ট গ্রাম্য প্রাইমারি স্কুল। আর একগুচ্ছ বাচ্চাকাচ্চা। তারা সবাই তখন তৈরি হচ্ছে প্রার্থনার জন্য। আমরাও সবাই তাদের সাথে প্রার্থনায় যোগ দিলাম। প্রার্থনা শেষে মাস্টার মশাই আমাদের সাথে এসে কথা বলেন। এই মাস্টারমশাই এর জন্যই আমার মনে বার বার এই জায়গাটার কথা আজও মনে পড়ে। তিনি আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমার স্কুলের নাম কি? আমি খুব গর্বের সাথে বলি, স্বামী বিবেকানন্দ সেবা সমিতি বিদ্যালয়। তখন তিনি বলেছিলেন, জীবনে যেখানেই যাও, যত বড় হও,যে মানুষটির নাম তোমার স্কুলের নামের সাথে রয়েছে, তার নাম কখনও ভুলে যেও না। আর সারাজীবন তোমার পা যেনো মাটিতেই থাকে। দ্বিতীয় কথাটা সেসময় বুঝিনি ঠিক করে, কিন্তু আজ বুঝি।

সেখান থেকে একটু এগিয়ে একটা সম্ভ্রান্ত বাড়ি পড়ে। কাঠের দোতলা বাড়ি। অতি নম্র সেই গৃহকর্তা আমাদের তার বাড়ির দাওয়ায় বসতে দেন। তার বৃদ্ধা মা সেখানেই রোদ পোহাচ্ছেন। অসংখ্য বলিরেখা তার মুখে। এই পরিবারের মূল উপার্জনের উৎস হলো মেষ পালন আর আপেল চাষ। তিনি আমাদের কিছু আপেল খেতে দিলেন। আর সাথেও দিলেন। বাবা যখন বললেন দাম দেওয়ার কথা, সে প্রায় এক হাত জিভ কেটে বললে, "অতিথি দেবো ভাবো" । অদ্ভুত সেই আন্তরিকতা। অদ্ভুত সারল্য সেই মানুষগুলোর চোখে।

এর পর আমরা ধীরে ধীরে ফিরে আসি হোটেলের দিকে। কিছু খাবার খেয়ে আমরা দুপুরে বিশ্রাম করে বিকালে নদীর পাড় ধরে একটু ঘুরলাম। রাতের চাঁদ উঠল আকাশে। আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম।হারশিলে তখনও বিদ্যুৎ অত বেশি নেই।চাঁদের আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল গ্রামটাকে। আমরা রাতে খিচুড়ির অর্ডার দেয় খাবো বলে। সেই অদ্ভুত মায়াবী রাতে চাঁদের আলো আর একটা সৌরশক্তি চালিত দুর্বল বাতির মধ্যে বসে গরম খিচুড়ি আর ডিমভাজা খাওয়ার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন। আমরা ধীরে ধীরে খাওয়া শেষ করে ঘরে ঢুকে গেলাম। এবার আমাদের পাহাড়ের পথ চলা শুরু।

চলবে

 

Comments :0

Login to leave a comment