Port and Dock Workers Strike

বন্দর শ্রমিকদের ধর্মঘটে বন্ধ ২২ দেশে ১০০ বন্দর

আন্তর্জাতিক

গ্রিসের পাত্রাস বন্দর।

গাজা গণহত্যার বিরোধিতা করে ইজরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম জোগান আটকাতে শুক্রবার দেশে দেশে বন্দর ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। ‘গণহত্যায় একটিও বন্দর ব্যবহার করা যাবে না’, ‘বন্দর শ্রমিকরা যুদ্ধের জন্য কাজ করবে না’ স্লোগানকে সামনে রেখে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া জুড়ে মোট ২২টি দেশের ১০০টি বন্দরে শুক্রবার ধর্মঘট হয়। যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইতে সমস্ত দেশের বন্দর শ্রমিকদের যুক্ত হতে ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেন, তুরষ্ক এবং মরক্কোর শ্রমিক ইউনিয়নগুলি একসঙ্গে আহ্বান জানিয়েছিল। 
শুক্রবারের ধর্মঘটে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন ভারতের শ্রমিকরা। সিআইটিইউ অনুমোদিত ‘ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া’-র সাধারণ সম্পাদক টি নরেন্দ্র রাও জানান, শুক্রবার দেশজুড়ে প্রায় ৫০০০ বন্দর শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। লাঞ্চ আওয়ারের সময় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। মুম্বাই, কোচির মতো বড় বন্দরগুলিতে অন্তত ৫০০ জন শ্রমিক কর্মবিরতি পালন করেছেন। পাশাপাশি তুতিকোরিনের মতো ছোট বন্দরেও প্রায় ৩০০ শ্রমিক এই লড়াইকে সমর্থন জানিয়েছেন। 
নরেন্দ্র বলেন, ‘‘ভারত সরকারকে আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই। বন্দর ও জাহাজ মজদুররা কোনোরকম যুদ্ধ মদত জোগাবে না। তার জন্য যা করার তা আমরা করবো। আমরা বিশ্ব শান্তির পক্ষে।’’ গত আট মাসে ইরান যুদ্ধে ২২ জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে ১৪ জন নাবিক। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে কেন্দ্রীয় সরকারকে নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নরেন্দ্র আরও বলেন, যুদ্ধের স্বরূপ উপলব্ধি করতে হবে শ্রমিকদের, এর বিরুদ্ধে তাদের মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে ফেডারেশন সক্রিয় রয়েছে। 
এ বছর মে মাসে ইউরোপের ৩৫টি বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলি ইস্তানবুলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সভায় মিলিত হয়। সভার শেষে বিবৃতি (ইস্তানবুল ঘোষণা) জারি করে বলা হয়, ‘‘গত ৬ ফেব্রুয়ারি সাতটি দেশের ২০টি বন্দরে ঐতিহাসিক লড়াইয়ের উদাহরণ নির্মিত হয়েছে। ‘নিরাপত্তা’, ‘স্থিতিশীলতা’ এবং ‘নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা’-র কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি আলাদা। এসব শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে জ্বালানির জোগান, বাণিজ্য করিডর, বন্দর, কাঁচামাল ও বাজারের নিয়ন্ত্রণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার মধ্যে কে আধিপত্য বিস্তার করবে তা নিয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে লড়াই চলছে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বা নিরাপত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। শান্তি হোক বা যুদ্ধ পরিস্থিতি, মুনাফার জন্য তারা আমাদের জীবন বলি দেয়। সে যুদ্ধের বোঝা সবসময়ই সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, নাবিক, ডক শ্রমিক এবং শরণার্থীদের কাঁধে এসে চাপে। আমরা কাজ না করলে কন্টেনার আটকে থাকে, জাহাজে পণ্য ওঠে না, যুদ্ধাস্ত্রের চলাচলও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। শিশুদের হত্যায় ব্যবহার হতে পারে এমন কোনও বুলেট, বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র আমরা পরিবহণ করতে দেব না। বন্দরগুলিকে যুদ্ধঘাঁটিতে পরিণত করা আমরা মেনে নেব না। যুদ্ধ অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, অস্ত্রশস্ত্র এবং একচেটিয়া কারবারীদের মুনাফার মূল্য শ্রমিকরা চোকাবে না।’’
আন্তর্জাতিক বন্দর ধর্মঘট ভাঙতে গত এক মাস ধরে শ্রমিকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা চলেছে। ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের নেতৃত্বে যারা রয়েছেন তাদের সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত অবধি করা হয়। চাকরি হারানোর ঝুঁকি সহ একদিনের বেতন কেটে নেওয়া হবে জেনেও তারা লড়াইতে নামছেন কেন? সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ইতালির ‘জিওইয়া তাউরো’ বন্দরের শ্রমিক নেতা ডমিনিকো মাক্রি বলেন, হাতে রুটি নিয়ে ঘরে ফিরে সন্তানদের মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে চান যে কোনও শ্রমিক। দুনিয়ার অন্য প্রান্তে তাঁর মতো বাকিরাও তাই চান। যতদিন অবধি বন্দরকে মৃত্যুর হাতিয়ার হয়ে ওঠা ঠেকিয়ে রাখা যাবে ততদিন শ্রমিকরা এভাবেই চলবেন। 
একই সুর পাওয়া যায় ধর্মঘটের ঠিক আগেরদিন লিভর্নো বন্দরে নোঙ্গর করতে আসা সুনেইদ এক্স জাহাজকে ফিরে যেতে বলে পাঠানো রেডিও মেসেজে। ‘তোমরা জাহাজে করে যা সরবরাহ করতে যাচ্ছ সেসবই প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে জায়নবাদীরা যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে কাজে লাগাবে। লিভর্নো বন্দর তোমাদের জন্য বন্ধ, এখানে তোমাদের জায়গা নেই।’ মেসেজটি পাঠিয়েছিলেন গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র অন্যতম সংগঠক লুকা পোজ্ঞি। গ্রেটা থুনবার্গের সঙ্গে তিনি ও আরও কয়েকজন একসঙ্গে ওষুধ ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গাজায় পৌঁছেছিলেন। ইজরায়েলী সেনা তাদের ত্রাণ বিলি করতে না দিয়ে বন্দি করেছিল, অত্যাচারও চালিয়েছিল। এমন অমানবিক ও যুদ্ধবাজ শক্তির বিরুদ্ধেই এক দিনের জন্য বন্দর অচল রইল।

Comments :0

Login to leave a comment