উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদে আরও এক বিএলও আত্মঘাতী। মৃত বিএলও’র নাম সর্বেশ সিং। পরিবারের অভিযোগ, এসআইআরের চাপ এবং উপর থেকে আসা ক্রমাগত নির্দেশের কারণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। শনিবার বাড়িতে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় একের পর এক বুথ স্তরের অফিসারের (বিএলও) মৃত্যুকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠছে। চলছে রাজনৈতিক চাপান উতোরও। দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এখন এসআইআর চলছে। অত্যন্ত স্বল্প সময়ে এমন বিপুল পরিমাণ কাজের চাপ নিতে না পেরে রবিবার পর্যন্ত ৮ রাজ্যে ২৭ জন বিএলও’র মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। এঁদের মধ্যে কয়েকজন আত্মঘাতীও হয়েছেন বলে খবর।
ভোজপুর থানা এলাকার বিএলও সর্বেশ সিং’র মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের প্রশ্ন তুলেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কাজে অবহেলার নামে বিএলও-দের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। শুধু এলাহাবাদেই ৪০ জন বিএলও-র বেতন আটকে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, এরপরেও যদি কাজে অবহেলা করা হয়, তাহলে তাদের চাকরিই খারিজ করে দেওয়া হবে। নয়ডা যা এখন গৌতম বুদ্ধ নগর জেলা সেখানে ৬০ জনের বেশি বিএলও এবং অন্য কর্মীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। বিএলও ছাড়াও এদের মধ্যে রয়েছেন সহায়ক এবং সুপারভাইজার। ৬ জন সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বাহারাইচ, বরেলি সহ অন্য জেলা থেকেও বিএলও সহ এসআরআর-র কাজে যুক্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর সামনে এসেছে। এসআইআর-র কাজে গিয়ে এইরকম ভয়ঙ্কর চাপ এবং হুমকির মুখে পড়ে একজন শিক্ষিকা আগেই ইস্তফা দিয়েছিলেন নয়ডায়।
মোরাদাবাদে বিএলওর মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী বাবলি প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলছেন এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ’র কথা মাথায় রেখে প্রশাসনের কাছে একটি সরকারি চাকরি এবং ৫ কোটি টাকা দাবি করেছেন।
সর্বেশ সিং জাহিদপুর ভগতপুরের একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তিনি নির্বাচনী কাজের জন্য বিএলও হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী বাবলি বলেন, এসআইআর ফর্ম নিয়ে ক্রমাগত চিন্তিত থাকতেন তাঁর স্বামী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, জেলা শাসক, এসডিএম এবং সুপারভাইজার তাঁর কাছে বারবার জানতে চান, ‘‘কতটা কাজ হয়েছে? তাড়াতাড়ি শেষ করো, নাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ তাঁর স্বামী ভয় পেয়েছিলেন যে তিনি হয়তো চাকরি হারাতে পারেন অথবা জেলে যেতে পারেন। এই চাপের কারণেই সর্বেশ এই ভয়াবহ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। পুলিশ সর্বেশের সুইসাইড নোটটি উদ্ধার করে গোটা ঘটনার তদন্ত করছে।
মৃতের স্ত্রী বলেন, তাঁর চার মেয়েই এখনও নাবালিকা। বাড়িতে একজন বৃদ্ধা শাশুড়ি রয়েছেন। আমার সন্তানদের বিয়ে, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ সবকিছুই এখন অনিশ্চিত। আমার স্বামী পরিবারের এক মাত্র উপার্জনকারি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কারণে পরিবারের ভবিস্যত অন্ধকারে। তাই তিনি প্রশাসনের কাছে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং স্বামীর পরিবর্তে একটি সরকারি চাকরি দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এগুলো ছাড়া পরিবার টিকিয়ে রাখা এবং সন্তানদের লালন-পালন করা অসম্ভব। তাঁর স্পষ্ট দাবি যতক্ষণ না তারা যথাযথ সহায়তা না পায়, ততক্ষণ তারা দেহের শেষকৃত্য করবে না।
সর্বেশ সিং তাঁর সুইসাইড নোটে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি, তবুও আমি লক্ষ্য অর্জন করতে পারছি না। রাতগুলো কষ্ট এবং উদ্বেগে ভরা। আমি মাত্র ২-৩ ঘন্টা ঘুমাতে পারি। আমার চার মেয়ে আছে, যাদের মধ্যে দুটি অসুস্থ। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করুন।’’
ঘটনা প্রসঙ্গে জেলা শাসক অনুজ সিং বলেন, সর্বেশ সিং’র কাজের রেকর্ড ভালো ছিল। তিনি প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। খুব বেশি কাজ বাকি ছিল না তাঁর। তার সুপারভাইজারের সাথে তার পারিবারিক সম্পর্কও ছিল। তাহলে, কেন তিনি এমন পদক্ষেপ নিলেন? এটি তদন্তের বিষয়। প্রশাসনিক এবং পুলিশ উভয় স্তরেই তদন্ত চলছে। সুইসাইড নোটটিও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অপরিকল্পিত এসআইআর-এ কাজের চাপ সামলাতে না পেরে একেবারে নিচের তলায় কাজ করা বিএলও-দের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ হাল ছেড়ে কাজে ইস্তফা দিচ্ছেন, কেউ আবার আত্মহত্যার মতো নির্মম পথও বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সর্বেশ সিং’র পরিবার অভিযোগ করেছে যে সর্বেশ সিং-কে ক্রমাগত অস্বাভাবিক কাজের চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তাঁকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০টি ফর্ম পূরণ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। সময়মতো ফর্ম পূরণ করতে ব্যর্থ হলে এফআইআর দায়েরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
BLO DEATH
ফের উত্তর প্রদেশে আত্মঘাতী বিএলও
×
Comments :0