Editorial

স্বস্তির জয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

বাংলাদেশ আর একটা আফগানিস্তান বা আর একটা পাকিস্তান হওয়া থেকে এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছে এটা ভেবে অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। আর এই আপাত দুশ্চিন্তামুক্তি ঘটেছে শুধু বাংলাদে‍‌শের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শান্তি সম্প্রতি-সৌহার্দকামী মানুষেরই নয়, ভারত সহ প্রতিবেশী দে‍‌শের ও অন্যান্য দেশের উদার মনোভাবাপন্ন গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষেরও। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে যারা বিভাজন চায় না, সব মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখে সেই মানুষরা তারা যে দেশেরই নাগরিক হোন না কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে তারা খুশি। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচনে কোন দল বা জোট জিতলো, কারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেল না, তার থেকে বড় কথা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি জিততে পারেনি বা ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছে। আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো তথাকথিত ছাত্র অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের প্রবল বিক্ষোভে দেড় বছর আগে হাসিনা সরকার উৎখাতের পর বাংলাদেশের বুকে যে চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা তৈরি হয়েছিল এবং তার পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো যে মুসলিম মৌলবাদীদরা বাংলাদেশের মানুষ তাদের সমর্থন করেননি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষের বধ্যভূমি বানাতে চেয়েছিল, নির্বাচকমণ্ডলী তাদের ক্ষমতার অলিন্দে ঢুকতে দেননি। যে ছাত্র সমাজ হাসিনা সরকারবিরোধী কার্যত গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল সেই ছাত্ররা মৌলবাদীদের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে পৃথক দল গড়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও কোনও সুবিধা করতে পারেনি। অসাম্প্রদায়িক মানুষ যারা গণতন্ত্র ও মুক্তি যুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তারা মৌলবাদী জামায়েতের সঙ্গে ছাত্র নেতাদের ঘনিষ্ঠতাকে মেনে নেননি।
প্রয়াত খালেদা জিয়ার দল বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও এটা মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনার দল আওয়ামি লিগ নির্বাচনে ছিল না। তাদের সমর্থকদের একটা বড় অংশের ভোট বিএনপি’র দিকে গেছে মৌলবাদী জামায়েতকে আটকানোর জন্য। তবে এই নির্বাচন অনেকটাই ধর্মান্ধতা-যুক্তিবাদ, সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র এমন বিভাজনকে স্পষ্ট করেছে। এখন দেখতে হবে বিএনপি’র সরকার বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতার ভিতকে মজবুত করতে কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তবে কাজটা যে খুব সহজ হবে না সেটা বলাই বাহুল্য। মনে রাখতে হবে জামায়েত পরাজিত হলেও তাদের আসন ও ভোটের হার অনেক বেড়েছে। তাছাড়া গত দেড় বছর ধরে ইউনিসের নেতৃত্বে একটি ঠুটো জগন্নাথ সরকার দেশে নৈরাজ্য বিস্তার, মুসলিম মৌলবাদীদের যথেচ্ছাচারে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ মৌলবাদী শক্তির প্রসারে সবচেয়ে বেশি সহায়তা এসেছিল সরকারের কাছ থেকে। তাই ইতিমধ্যে মৌলবাদীরা যতটা শেকড় ছড়িয়েছে তাকে উপড়ে ফেলা সহজ নয়। বিএনপি যে কোনও না কোনোভাবে মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করবে না সেটাও জোর দিয়ে এখনই বলা যাবে না। অন্যদিকে প্রত্যাশা থাকলেও বামপন্থীরা বিশেষ কোনও সুবিধা করতে পারেনি। বামপন্থীদের প্রভাব বাড়লেও মৌলবাদীদের ঠেকানো তুলনামূলকভাবে সহজ নয়। মৌলবাদী দাপটের ভয়ে অসাম্প্রদায়িক দলও মহিলাদের প্রার্থী করতে চায়নি। এমন কি বিএনপি-ও তাদের জনপ্রিয় নেত্রীদের প্রার্থী করেনি। তারা নিরপেক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়ে অনেকে জয়ী হয়েছে। প্রথম ধাপে বিরাট জয় সন্দেহ নেই। এবার আরও বড় লড়াই করতে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক মানুষকে।

Comments :0

Login to leave a comment