তপন মিশ্র
বিবর্তনবাদ মানে চার্লস ডারউইন বা ডারউইন মানে বিবর্তনবাদ এমনটা ভাবা বিজ্ঞান গবেষণায় এক অলীক ভাবনা। ডারউইনের আগে থেকেও জীবজগতে ক্রমানুযায়ী পরিবর্তন বা বিবর্তনের ভাবনা ছিল। ডারউইনের পরে এই গবেষণা যুক্তি এবং প্রমাণের মধ্য দিয়ে আরও শাণিত হয়েছে। এখন থেকে ২১৮ বছর আগে ১২ ফেব্রুয়ারী ডারউইনের জন্ম। ডারউইনের জীবনী নিয়ে চর্চার থেকে তাঁর গবেষণা নিয়ে চর্চা আরও গুরুত্বপুর্ণ। এখানে ডারউইন এবং তাঁর পরবর্তীকালে যে সমস্ত বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের বিভিন্ন ধারায় নিরন্তর কাজ করে চলেছেন তাঁরা ঈশ্বর বিশ্বাসী কিনা সেই প্রশ্ন অবান্তর। বিবর্তন সম্পর্কিত গবেষণায় ডারউইন যে মৌলিক পরিবর্তন আনলেন তা হলো এক বিশাল পরিমাণের তথ্য সংগ্রহ করে তিনি তার যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা করলেন যা তাঁর আগে কেউ করতে সক্ষম হননি। তার ফলে যা আমরা দেখলাম তা হলো ডারউইনের পরবর্তী সময়ে জীববিজ্ঞানের সমস্ত ধারার গবেষণা দ্রুতলয়ে এগোতে থাকলো এবং এক সুস্পষ্ট আলোর রেখা গবেষকরা খুঁজে পেলেন। অবশ্য প্রায় একই সময়ে অস্ট্রিয়ার গ্রিগর জোহান মেণ্ডেলের মটর বীজ নিয়ে জেনেটিক্স বা সুপ্রজনন বিদ্যার গবেষণা জীববিজ্ঞানের জন্য শক্ত ভিত তৈরি করে দিল।
ডারউইনের অনেক পরে যখন সৃষ্টি তত্ত্বের অনুগামীদের যুক্তির সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের দেশে বিবর্তনের পঠন পাঠনের উপর নতুন করে আঘাত হানার চেষ্টা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে পাঠ্যসূচি যুক্তিযুক্ত করতে হবে। কিশোর মনে যেসময়ে অনুসন্ধিৎসা অনেকটাই, ঠিক সেই সময়টায় জাতীয় স্তরে এনসিইআরটি নবম-দশম পাঠক্রম থেকে ডারউইনের তত্ত্ব সহ অভিব্যক্তি সম্পর্কিত সমস্ত অধ্যায় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পথ অনুসরণ করে কিছু রাজ্যের সরকার সিলেবাস থেকে বিবর্তন সম্পর্কিত সমস্ত পাঠ্য তুলে দিচ্ছে। কেবল আমাদের দেশে হিন্দুত্ববাদীরা নয় এই একই সময়ে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ যেখানে মুসলমান মৌলবাদীরা ক্ষমতায় যেমন সৌদি আরব, তুর্কী, ওমান, পাকিস্তান, জর্ডান ইত্যাদি দেশে একই ঘটনা ঘটেছে।
এনসিইআরটি’র যুক্তি হলো বিদ্যালয় স্তরে কেন বরং উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার সময় বিবর্তন এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা চর্চা করতে পারে। একথা কে ওদের বোঝাবে যে বিদ্যালয় স্তরে মৌলিক বিজ্ঞানের পাঠ যুক্তিবাদ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞানের ভিত তৈরির ক্ষেত্রে জরুরি। জীবন বিজ্ঞানে এই অর্থে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে ডারউইনের তত্ত্ব পাঠ্য হওয়া উচিত। প্রখ্যাত সোভিয়েত জীববিজ্ঞানী ডবজেন্সকি-র কথায় বিবর্তনের জ্ঞান ব্যতিরেকে জীববিজ্ঞানের কোনও ধারাই আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। ঠিক তেমনই রসায়ন বিজ্ঞানের সাধারণ ধারণা তৈরি করতে হলে চাই ‘পিরিওডিক টেবিল’ সম্পর্কে জ্ঞান। কারণ বস্তু জগতে কিছুই যে বিচ্ছিন্ন নয় বরং প্রত্যেকটি মৌলের পরমাণুর গঠনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট যুক্তি আছে এই টেবিল থেকে জানা যায়। এই টেবিলও এখন পাঠ্য সূচিতে ব্রাত্য।
আক্রমণ আগেও প্রতিহত হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। আমেরিকা, ইউরোপ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অভিব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে কিছু ধর্মান্ধ মানুষ সওয়াল করেন উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থাকে। এখানে পাঠকদের সুবিধার জন্য কয়েকটি কথা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সেই সময়ে কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই খুব জোরের সঙ্গে ডারুইনের তত্ত্বের বিরোধিতা করেনি। যদিও ডারউইনকে বিধর্মী এবং নাস্তিক হিসাবে বারবার খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা এবং গোঁড়া বুদ্ধিজীবীরা দোষারোপ করেন। দু’জন বিশ্ববিখ্যাত জীববিজ্ঞানী জা ব্যাপটিস্ট লামার্ক, ফরাসি বিজ্ঞানী ও অভিব্যক্তি তত্ত্বের প্রবক্তা, এবং জোহান গ্রেগর মেণ্ডেল, অস্ট্রিয়ার জীববিজ্ঞানী ও বংশগতি তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন ক্যািথলিক ধর্মের প্রচারক। তবুও চার্চ পোষিত তৎকালীন ভিক্টোরীয় যুগের সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সভা সমিতিতে ডারউইনের অভিব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে স্বর উত্তোলন করতেন। তৎকালীন খ্রিস্টান মৌলবাদের আঁতুড় ঘরের মধ্যে এই দুই পাদ্রি যে কখন মিথ ভাঙার কাজ করছিলেন ঘুণাক্ষরেও তার টের পাননি মৌলবাদীরা।
ডারউইন বিভিন্ন সমালোচনার কারণে মানসিক চাপে কোনও আলোচনাসভায় অংশ গ্রহণ করতেন না। ডারউইনের হয়ে এই সমস্ত বিতর্কে অংশ গ্রহণ করতেন থমাস হেনরি হাক্সলে। হাক্সলে বিখ্যাত প্রকাশনার নাম হলো ‘EvidenceastoMan’sPlaceinNature(1863)’। একারণে হাক্সলেকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে।
ডারুইনের বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধিতা ভর্টিকানসিটি (ক্যা থোলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ সংস্থা) সরাসরি করেনি বরং তারা ঈশ্বর প্রচালিত বিবর্তন তত্ত্বের কথা বলে। ফ্রান্সিস কলিন্স নামে একজন জীববিজ্ঞানী ২০০৬ সালে এক প্রবন্ধে লেখেন ‘বিবর্তন সত্য কিন্তু তা ঈশ্বরের দ্বারা পরিচালিত।’ কলিন্স আমেরিকার জিন তত্ত্ববিদ এবং মানব জিনোম প্রকল্পের সঙ্গে প্রথম থেকেই যুক্ত। কলিন্সের মতো হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী ভর্টিকান সিটির অঙ্গুলি হেলনে চলেন। ২০১৪ সালে ১৪তম পোপ বেনেডিক্টের মতে বিবর্তনের সঙ্গে সৃষ্টিতত্ত্বের কোনও বিরোধ নেই ইত্যাদি। বোঝাই যায় যে সৃষ্টি তত্ত্বেৃর বিরুদ্ধে লড়াই এতোটাই তীব্রতর হয় যে পোপকে রক্ষণাত্মক হতে হয়।
১৯৬০-এর দশকে আমেরিকার বিদ্যালয় শিক্ষাক্রমে বিবর্তনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবার নতুন করে পড়ানো শুরু হয়। ফলে এর বিরুদ্ধে সৃষ্টি তত্ত্বের প্রচারকরা ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাবে বিজ্ঞানের প্রয়াসকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা চলে। ১৯৬৮ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট Epperson v. Arkansas মামলায় অভিব্যক্তির বিজ্ঞান পড়ানোর বিরুদ্ধে সেই দেশের বেশ কিছু জায়গায় যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। নির্দেশে বলা হয় যে অভিব্যক্তির বিজ্ঞান পড়ানো বন্ধ করা দেশের সংবিধান বিরোধী এবং কোনও এক নির্দিস্ট ধর্মের অনুসারী।
ফিলিপ জনসন ‘ডারউইনঅনট্রায়াল’ একটি বই লেখেন। বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে তুলে ধরা হয় যে ডারউইনের তত্ত্বে বলা হয় যে ডারউইনের ত্রুটি হলো ফসিলের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, অপ্রাসঙ্গিকভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব হাজির করা, জীব জগতে প্রকরণের স্বল্প পরিসর থেকে বিবর্তনের বৃহৎ পরিসরে যাওয়ার পদ্ধতি ভ্রান্ত। বলাই বাহুল্য যে আধুনিক গবেষণা এই ফাঁক ফোঁকরের অধিকাংশটাই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।
ডারউইনের তত্বেে র উপর দাঁড়িয়ে ২০২২ সালের নোবেল বিজেতা, সুইডেনের বিজ্ঞানী, জার্মানির লেইপজিগ শহরের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সেভান্তে পেবো মানব অভিব্যক্তি সম্পর্কিত নতুন তথ্য আবিষ্কার করলেন যা মানব-অভিব্যক্তি ইতিহাসকে আরও স্বচ্ছ করল। একদিকে যেমন আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌছাচ্ছি তখন অন্যদিকে মৌলবাদীরা জ্ঞানের আলোকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
আমাদের দেশে এই সংক্রান্ত গবেষণার অপ্রতুলতার কারণ মূলত সরকারি দীর্ঘসূত্রতার বাধা। এদেশের অনেক বিজ্ঞানী বিদেশে গিয়ে ভারত উপমহাদেশের জিনের বৈচিত্র, মানব অভিব্যক্তির (বিবর্তনের সাথে অভিপ্রয়াণ এবং অভিযোজনের মধ্যদিয়ে বৈচিত্র) ইত্যাদি নিয়ে অনেক গুরুত্বপুর্ণ কাজ করছেন।
মৌলবাদীরা কেবল ডারউইনের তত্ত্ব নয় তার পরবর্তীকালে এই সম্পর্কিত যে গবেষণাগুলি সংগঠিত হয়েছে তার বিরোধিতা করে। বিবর্তনের পঠন-পাঠন এমনকি গবেষণায় ওরা ভয় পায় মূলত যে কারণে সেগুলি হলো- প্রথমত বিবর্তনবাদের গবেষণায় ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনী তত্ত্ব হলো ক্রমানুযায়ী পরিবর্তনের তত্ত্ব এবং সমস্ত ধরনের স্থবিরতার বিরুদ্ধে। জ্ঞানের বিকাশ মৌলবাদীদের ভিত করে কারণ তাদের সমস্ত জ্ঞান চর্চাই গীতা, ভাগবত, রামায়ণ মহাভারত, মনুস্মৃতি, বাইবেল বা কোরানের মধ্যে সীমিত। এগুলি থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু তাদের গাত্রদাহের কারণ। দ্বিতীয়ত পরিবর্তনশীলতা হলো বস্তুবাদী চিন্তা এবং দ্বান্দিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এখানে ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি অর্থাৎ ‘সৃষ্টি তত্ত্ব’-এর কোনও স্থান নেই।
তৃতীয়ত বিবর্তনবাদ বার বার প্রশ্ন করার অবকাশ তৈরি করে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রেনে ডেকার্তের মতাদর্শ এই প্রশ্ন করার উপর প্রতিষ্ঠিত। ডারউইন নিজে তাঁর দুটি বিখ্যাত বইতে যেমন ‘On the Origin of Species by Means of Natural Selection’ (প্রকাশনা ১৮৫৯ সাল)’ এবং ‘The Descent of Man, and Selection in Relation to Sex’ (প্রকাশনা ১৮৭১ সাল) ছাড়াও অন্যান্য প্রকাশনা গুলিতে বার বার বেশ কিছু প্রশ্ন করেছেন যার উপর ভিত্তি করে তাঁর পরবর্তীকালের বিবর্তনের গবেষণা এগিয়েছে।
চতুর্থত তাঁর ঈশ্বরকে অস্বীকার করে নিখুঁত প্রশ্ন করার ক্ষমতা। মানব বিবর্তন সম্পর্কিত তাঁর বই ‘ডিসেন্ট অব ম্যান-‘ বইতে তিনি সৃষ্টি তত্ত্ব সম্পর্কে লেখেন, ‘যখনই বুঝতে পারা যায় যে একটি প্রজাতি অন্য প্রজাতিতে বিবর্তিত হতে পারে, তখনই পুরো কাঠামোটি টলমল করে ভেঙে পড়ে’। এখানে সৃষ্টি তত্ত্বের কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে। তিনি আবার প্রশ্ন করেন ‘আর যদি মানুষ একটি উন্নত প্রাণী ছাড়া আর কিছুই না হতো, তাহলে তার আধ্যাত্মিক মর্যাদা কোথায় থাকত? আর যদি সে নিজেই বিবর্তনের ফসল হয়, তাহলে ঈশ্বরের কাছে তার নৈতিক জবাবদিহিতা সম্পর্কে কী বলা যায়?’
একারণেই তো বিবর্তনবাদের পঠন পাঠন নিষিদ্ধ করতে চাইছে সরকার। এচএমএস বিগল-এ ৫ বছর ধরে পৃথিবী পরিক্রমার পর বিবর্তনবাদের চেতনায় দীক্ষিত হয়ে ডারউইন লেখেন “If the misery of the poor be caused not by the laws of nature, but by our institutions, great is our sin.”(Voyage of the Beagle)। ভিক্টোরীয় যুগের ইংল্যান্ডে এই প্রশ্ন তোলা যে কতটা সাহসিকতার কাজ তা এখন বুঝতে পারলে আজকের সমাজে প্রশ্ন করা আরও সহজ হবে। আজকের মৌলবাদীরা এই প্রশ্নকেই ভয় পায়।
Comments :0