OlyPub

অলিপাব এবং তার পর...

কলকাতা

আব্দুল কাফি
অলিপাবের সাম্প্রতিক গন্ডগোল কিছুটা থিতিয়ে এসেছে। পক্ষে-বিপক্ষে কথাবার্তাও কিছুটা স্তিমিত। আইনি পথে নিশ্চয় একটি সমাধান পাওয়া যাবে। ভুল এবং দোষ নিয়ে বিতর্ক শেষে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন আদালত। কিন্তু প্রশ্নটি কি কেবল আদালতে মীমাংসার যোগ্য? এর কি আর কোনও অভিঘাত নেই? সেইখানেই আমার মতে বেশি আলো দরকার।
প্রথমে শোনা যাচ্ছিল, ওই নামজাদা খাবার-দোকানে যে বিপত্তি ঘটেছে, তা নিছক ভুল-বোঝা। ধর্মীয় কারণে ‘নিষিদ্ধ’ মাংস দেওয়া হয়েছে এক ক্রেতাকে এবং এটি ঘটেছে রেস্তোরাঁর এক কর্মীর ভ্রান্তিবশত। ক্রেতাও প্রথমে তা বোঝেননি; না-বুঝেই তিনি ওই নিষিদ্ধ মাংস খেয়ে নেন, এবং পরে জানতে পেরে অভিযোগ জানান। কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চান, দুঃখপ্রকাশ করেন। এতেই ব্যাপারটা মিটে যাওয়ার কথা। কিন্তু সাধারণ বুদ্ধির বাইরে যে অসাধারণ-বুদ্ধির পরিসর, সেখানে এত সহজে কি হিসাব মেলে? ফলে, কর্মীর নাম জিজ্ঞেস করা হয়, ক্রেতার ধর্মপরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণ-পরিচয়ও ঘোষিত হয়। এবং তার মধ্যে দিয়ে রচিত হতে থাকে টগবগে ঘৃণার একটি চিত্রনাট্য। অভিযোগকারী তরুণ-বয়সি, ঈষৎ মনোযোগ-প্রত্যাশী এবং কিঞ্চিৎ ভিডিও-বিলাসীও বটে। কিন্তু এমনকি তিনিও দু’-একদিনের মধ্যে ব্যাপারটি মিটিয়ে নেবার কথা বলেন- যদিও তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ততদিনে ওই অভিজাত খাবার-দোকানের কর্মীকে সম্মানে, বিত্তে যিনি বেশ ‘অবহেলা’-যোগ্যই হয়তো, কিংবা কারো চোখে হয়তো ভয়াবহ বিপজ্জনক কেউকেটা ভীষণ তৎপর পুলিশ বিভাগ তাঁকে গ্রেপ্তার করে ফেলেছে। কার্যক্ষেত্রে হয়নি যদিও, তবু অভিযোগকারী বলেছিলেন, তিনি অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। তাঁর এই বলাটুকুকেও আমি খুশিমনে দেখতে চাই। কিন্তু, কী করা যাবে? তিনি পিছু হটতে চাইলেও, রাস্তা-ঘাটে, সমাজ-মাধ্যমে হিংস্র কথোপকথন কি এমন 'সুযোগ' ছাড়ে? অভিযোগকারী খুব নির্ভরযোগ্য নন, অতীতে একাধিক ঘটনায় বরং তিনি যথেষ্ট যোগাতার সঙ্গে নিজের গোলমেলে ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, এক্ষেত্রেও তাঁর অভিযোগের ধরন এবং বিবৃতির মধ্যে বেশ কিছু ফাঁকফোকর স্পষ্ট, কিন্তু সেসব গোল্লায় যাক। আসল কথা হলো, একজন মুসলমান একজন হিন্দুকে নিষিদ্ধ মাংস খাইয়ে দিয়েছে— এমন একটি বয়ান যদি আবছা ভাবেও কিছুদিন ভাসিয়ে রাখা যায়, তাহলে ক্রুদ্ধ করে তোলা যাবে বহু মানুষকে। এমন সুযোগ কে দেয় ভাই? ফলে অভিযোগকারী ব্লগার কী করেছে আগে, এখনই বা সে কী ঠিক বলছে তা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। কেবল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, দলে দলে মুসলমান ওঁত পেতে আছে, তক্কে তক্কে আছে, হিন্দুদের গোপনে নিষিদ্ধ মাংস খাইয়ে দেওয়ার কথা শুয়ে-বসে-হেঁটে ভেবে চলাই তাদের রীতি। আর নিরুপায় অসহায় হিন্দু সংখ্যাগুরু সেই ফাঁদে পড়েই চলেছে। আমরা কতদিন ধরে এই কথা বোঝাবার চেষ্টা করে চলেছি, সেকুলারগিরি দেখিয়ে বাংলার হিন্দুসমাজ সেসব কানেই তোলে না... কেমন, এইবার মিলল তো? আমাদের কথা ফলে গেল তো? এখনো যদি সেকুলার বাঙালি রেগে না ওঠে, তাহলে কী হবে জানো? দশ বছর বাদে এখানে সবাই মুসলমান হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গ খাঁ-খাঁ করবে।
কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, দশ বছর অনেক লম্বা সময়, অত দূরের দৃশ্য কল্পনা করতে যদি কষ্ট হয়, এই ভেবে ব্যাপারটাকে পাঁচ বছরে নামিয়ে এনেছেন তাঁরা- অর্থাৎ অভিজাত সেই খাবার-দোকানের ঘটনায় মুসলমান বেয়ারাটির যদি কঠিন শাস্তি না হয়, কিংবা হিন্দু-মুসলমানে যদি বেশ একটা মারমার-কাটকাট ভাব না আসে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ মুসলমানের আঁস্তাকুড় হয়ে উঠবে অচিরে... হিন্দুদের থাকাই বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ। এইটে হলো মোটের উপর ওই হোটেলখানায় বিশ্রী ঘটনার পরে হিন্দুত্ববাদী এই দাপুটে বয়ানের নির্যাস। আদত কথাটি হলো, তোমার ধর্ম কেড়ে নেওয়া হবে, এই হলো বলে... তোমার অস্তিত্ব খুবই বিপন্ন, অন্য কোনো ভিত্তিতে নয়, কেবল ধর্মের ভিত্তিতেই একজোট থাকতে হবে— এইকথা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলো, বিশ্বাস করতে না চাইলে, হাড়-হিম করা গল্প শোনাও, ‘‘কল্পনা করুন তো, আপনি যদি থাকতেন ওই হোটেলে’’ এমন বাক্যে আচ্ছন্ন করে তোলো, ভয় দেখাও, ক্রমাগত ভয় দেখাও, ইতিহাস থেকে সমস্ত সম্প্রীতির উদাহরণ মুছে দাও, বিপদের দিনে ভিন্ন ধর্মের মানুষ কীভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে বারবার, সে-কাহিনি কেউ বলতে এলে মুখে ঝামা ঘষে দাও, বলো সম্প্রীতি ‘মারাবেন না’, এটাকেই স্লোগান করে তোলো তারপর, বলো, আমরা সম্প্রীতির বিরুদ্ধে, আমাদের পুঁজি ভয় দেখানো এবং পাওয়া দুই-ই, কেননা এর থেকেই শেষ অব্দি জ্বলে উঠবে ক্রোধ আর ঘৃণা, টগবগ করে ফুটতে থাকা সেই ঘৃণা তারপর চলকে উঠবে, অস্ত্র হয়ে ঝলসে উঠবে, তারপর ছুটে চলে যাবে নানা দিকে মালদা কিংবা নদীয়ায়। এইরকম সময়ে কারো কথার মাঝে 'ইনশাআল্লাহ' (ঈশ্বর যদি চান), কিংবা 'মাশাআল্লাহ' (ঈশ্বরের কৃপাতেই হল) যদি শুনতে পাই কোনোখানে, ছমছম করে উঠবে বুক, ওই যে জেহাদি, ওই তো, কী মৌলবাদী ওরা সব, কথায় কথায় ইনশা-মাশাআল্লাহ বলে... তখন অনিবার্য ভাবে ভুলে যাব চারপাশের কত কত লোক প্রতিদিনই বলে চলেছে, ‘ঈশ্বরের কৃপায়’, ‘ভগবানের করুণায়’, ‘ঈশ্বর করুন’, কিংবা ‘এ রাম’। হ্যাঁ, বলি তো, তাতে কী হয়েছে, ওগুলো তো স্বাভাবিক, ওসব বাক্‌ভঙ্গি মাত্র, এবার কি ওগুলো নিয়ে আপত্তি তুলবেন নাকি?
না ভাই, আপত্তি কেন তুলব? বিনীতভাবে বলব কেবল, এই ঘৃণা এবং ভয়ের চাষ আত্মঘাতী। এ কেবল নিজেকে বীর ও পালোয়ান হিসাবে কল্পনা করতে ডাকে। এ কেবল অজস্র 'অপর' গড়ে, চতুর্দিক থেকে "ওরা" বেড়ে উঠছে- এমন মিথ্যা সাময়িক উত্তেজনা দেয়। এই ধরনের উত্তেজনার ফলেই কোনোদিন সাতে-পাঁচে-না-থাকা নেহাত নিরীহ, পরোপকারী মানুষও আশেপাশে "রোহিঙ্গা" নামক বিভীষিকা দেখতে পায়। তথ্য প্রমাণ দিয়ে যদি কেউ প্রমাণ করেও দেয়, ওসব মিথ্যা, ভালো করে দ্যাখো, কোনো রোহিঙ্গা নেই ভোটার তালিকায়, তখন ভাবতে ইচ্ছে হয়, নিশ্চয় আছে, আসলে ওরা এমন ধূর্ত, এমন আশ্চর্য কলকবজা বের করেছে যে, আমি সরল মানুষ, দেখতে অব্দি পাচ্ছি না। অতএব, আরও সতর্ক, আরও সন্দিহান, আরও হিংস্র হয়ে উঠতে থাকে সে নিজেরই অজান্তে। বন্ধুর ছায়া দেখলেও আঁতকে উঠে ভাবতে থাকে, রোহিঙ্গা নাকি?
শূদ্র কিংবা অস্পৃশ্য মানুষ হিসাবে একদলকে চিহ্নিত করে, তারপর সারাক্ষণ গা-বাঁচিয়ে চলতে চেয়েছে কিছু মানুষ। চলতে চলতে, ভয় আর ঘৃণার আঁচে পুড়েছে নিজেরাও। মুসলমানের ক্ষেত্রেও কতকটা তেমনই। দাড়ি আছে না? টুপি পরে বুঝি? ও মা, মাথায় কাপড় তুলে রাখে? ও আচ্ছা, ওটা হিজাব নিশ্চয়? তাই খাবার পরিবেশনকারী ব্যক্তি মুসলমান চিহ্নিত হওয়া মাত্র মনে হয়েছে অনেকের, এতে আর আশ্চর্য কী? গোপনে নিষিদ্ধ মাংস খাওয়ানো তো ওই "ওদের" পক্ষে স্বাভাবিকই। ভুল করে হয়েছে? হতেই পারে না। ওরা অমনই।
কিন্তু এইটিই একমাত্র বয়ান ছিল না এবার। কত মানুষ যে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন ওই ম্রিয়মান ওয়েটারের পাশে- যাঁর নামে সংখ্যালঘু চিহ্ন। থানায় গেলেন বামপন্থী, কিংবা তত বাম নন এমন মানুষজন, কোনোদিন যাঁরা ওই অভিজাত খাদ্যবিপণিতে যাননি, ভবিষ্যতেও যাবেন না তাঁরাও গেলেন। ঘৃণাবাদী বয়ানের বিরুদ্ধে লিখলেন, কথা বললেন, ধিক্কার জানালেন অভিযোগটিকে, মুসলমান ওয়েটারের জন্য দুঃখ পেলেন অপরিচিত দূরের বন্ধুরা, ঘটনাচক্রে যাঁরা হিন্দু— এমন দৃশ্যও তো দেখল আমাদের শহর ও দেশ। আইন শেষ অব্দি কী বলবে তা পরের কথা। আপাতত আমাদের মন ভরে আছে এইসব সুন্দর দৃশো- রাতের বেলা সব কাজ ফেলে থানায় ছুটে গেছেন অচেনা বন্ধুর পরিচয়ে যাঁরা, তাঁরা কেউ নাট্যকর্মী, কেউ বা ট্রেড ইউনিয়নের কমরেড, কেউ আবার কিছুই না, কেউ-না, কেবলই এই শহরের লোক। সহ নাগরিক।
আহা রে, দীপু দাশের জন্য এমন যদি ছুটে ছুটে যেত কিছু মানুষ.. তাহলে হয়তো বেঁচেই যেত সংখ্যালঘু হিন্দু ছেলেটি। অনেক অনেক নামই লেখা যায়, কিন্তু থাক, একটি নামই অনেক হয়ে ওঠে কখনো কখনো। আমাদের পাশের রাজ্যে এমনই যদি ছুটে যেত কয়েকজন মানুষ, তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত বেঁচেই যেত সংখ্যালঘু মুসলমান, মহম্মদ আতাহার হোসেন। যায়নি একথা সত্যি। কিন্তু বহু যায় গেছেও তো। যাবে, ছুটে যাবে লোক। মিথ্যা বয়ানের বিরুদ্ধে, ঘৃণা-ভাষণের বিরুদ্ধে, দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে ছুটে যাবে।
শেষে লিখছি, অভিযোগকারী ওই তরুণের প্রতি আমি কিছুটা বোকার মতো আবার আস্থা রাখতে চাই, বন্ধুরা অনেকে রেগে যাবেন, দুঃখ পাবেন জানি। তবুও ভরসা করি, এত মানুষের বেদনা এবং উদ্বেগ দেখে তিনি সেরে উঠবেন একদিন। ঘৃণাভাষণকারীদের বিরুদ্ধে তিনি লিখবেন, বলবেন। কোনও একদিন বলবেন ঠিক।

Comments :0

Login to leave a comment