National Song Debate

শয়তানির নবরূপ

সম্পাদকীয় বিভাগ

বাংলায় প্রবাদ আছে ‘শতবার ধুলেও কয়লার ময়লা দূর হয় না।’ কারণ মলিনত্বেই কয়লার অস্তিত্ব। যাদের ডিএনএ’তেই রয়েছে ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণা, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন যাদের অপরিহার্য রাজনৈতিক হাতিয়ার সেই আরএসএস-বিজেপি’কে হাজার চেষ্টা করলেও ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সংহতির সহজপাঠ শেখানো যাবে না। সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ার পরও তারা যথারীতি প্রশ্ন করে বসবে ‘সীতা কার বাবা’। আসলে ধমান্ধতা পরিত্যাগ করে আধুনিক যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞান ভাবনা যেদিন ওরা আয়ত্ত করবে, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে ধর্মীয় মেরুকরণ ও তথাকথিত হিন্দু ধর্মীয় ঐক্যকে রাজনৈতিক ঐক্যে রূপান্তরের প্রয়াস বর্জন করবে, সেদিন থেকে আরএসএস-বিজেপি’র রাজনৈতিক অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে। বস্তুত বিজেপি টিকে আছে এবং প্রভাব বাড়িয়েছে ধর্মান্ধতার ঘোরে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে এবং বিভাজনের রাজনীতিকে আশ্রয় করে। ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে মোদী সরকার ও শাসক দল বিজেপি’র অতি সক্রিয়তা ও অনাবশ্যক অগ্রাধিকার সেই টিকে থাকার রাজনীতিরই অন্যতম অঙ্গ।
‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জন গণ মন’-র মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরোধ ‍‌ও বিতর্ক তৈরি করে সুকৌশলে যথারীতি হিন্দু-মুসলিম বিভাজন রেখা তৈরি করে হিন্দুদের রাজনৈতিকভাবে বিজেপি’র দিকে টানার অসৎ ও নিন্দনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মোদী সরকার। আরএসএস-বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি হিন্দু ধর্মীয় চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ। তাদের উদ্দেশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে রাখা। তারজন্য অসত্য, বিকৃত, বানানো ইতিহাস ও তথ্য পরিসংখ্যান প্রচার করে তারা তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে, জনবিন্যাস বদলে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে হিন্দুদের কাছে টানতে চায়। একাজে এখন তারা ‘বন্দে মাতরম’-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে। অমিত শাহর স্বরাষ্ট্র দপ্তর বিজ্ঞপ্তি জারি করে জাতীয় গান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশ জারি করেছে জাতীয় সঙ্গীত জন গণ মন গাওয়ার আগে। যাবতীয় সরকারি অনুষ্ঠানে, বিদ্যালয় শুরুর আগে প্রথমে গাইতে হবে বন্দে মাতরম, তারপর জন গণ মন। তেমনি বন্দে মাতরম এর স্বীকৃতি প্রথম দুই স্তবকের বদলে গাইতে হবে পুরো ছয় স্তবক। বন্দে মাতরমের জন্য সময় বরাদ্দ হয়েছে ১৯০ সেকেন্ড আর জন গণ মন গাওয়ার জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৫৫ সেকেন্ড। আরএসএস বরাবরই রবীন্দ্র ভাবনা ও চেতনার বিরোধী, জন গণ মন-কে তারা কোনোদিনই মান্যতা দেয়নি। তেমনি আরএসএস-হিন্দু মহাসভা-জনসঙ্ঘ-বিজেপি তাদের নিজস্ব পরিসরে জন গণ মন-কে কোনোদিন জায়গা দেয়নি। বদলে তাদের পছন্দ বন্দে মাতরম। অবশ্য স্বীকৃত প্রথম দুই স্তবকে তাদের ঘোর আপত্তি। তারা চায় পুরো ছয় স্তবক কারণ সেখানে আছে হিন্দু দেবদেবীদের বন্দনা। ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী ভারতে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্মের দেবতার স্তূতি করে জাতীয় গান হতে পারে না যুক্তিসঙ্গতভাবে। তাই প্রথম দু’টি স্তবককেই জাতীয় গানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী শাসক এখন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সংবিধানকে অস্বীকার করে হিন্দু দেবতার বন্দনাকে জাতীয় সঙ্গীতের উপরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লক্ষ্য আসলে এই প্রশ্নে ধর্মীয় বিতর্ক সৃষ্টি করে বিভাজনের রাজনীতিকে আর এক ধাপ বিজেপি’র অনুকূলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সামনে এরাজ্যে নির্বাচন। তার আগে রবীন্দ্র-বঙ্কিম, বন্দে মাতরম-জন গণ মন-কে গুলিয়ে দিয়ে ধর্মীয় বিভাজনকে ভোটের কাজে লাগানো সহজ হতে পারে। ক্ষমতার জন্য এরা সব কিছু করতে পারে।

Comments :0

Login to leave a comment