Editorial

প্রশ্ন করো না

সম্পাদকীয় বিভাগ

জাতীয় প্রতিরক্ষা তহবিল এবং প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল নামে দু’টি তহবিল বহুকাল থেকেই দেশে চালু আছে। রাজ্যে রাজ্যে আছে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল। এই তহবিলগুলির অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে আসে না। দেশের সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সংগন, প্রতিষ্ঠান এই তহবিলে অর্থ দান করে। অর্থাৎ এই তহবিলগুলির টাকা কোনও ব্যক্তির, গোষ্ঠীর বা কোনও পরিবারের অথবা শাসক দলের নয়। প্রশ্নাতীতভাবেই সেটা জনগণেরই টাকা এবং জনগণ সেখানে স্বেচ্ছায় দান করেন বিপদে, বিপর্যয়ে অসহায় মানুষকে সাহায্য করার জন্য। স্বাভাবিকভাবেই এখানে গোপনীয়তা বা লুকোচুরির কিছু নেই। তহবিলে কে কত টাকা দিল সেটা যেমন আড়াল করার কারণ নেই তেমনি কাকে কত টাকা দেওয়া হলো সেটাও গোপন রাখা অর্থহীন। বরং সবটা প্রকাশ্যে এলে মানুষের দান করার আকাঙ্ক্ষা বাড়বে এবং বেশি বে‍‌শি মানুষ বে‍‌শি বেশি অর্থ দিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। সমাজে সামাজিক ও মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটবে। মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হবে। একের বিপদে অন্যের সাধ্যমত এগিয়ে আসার মনোভাব বৃদ্ধি পাবে।
এতকাল এধরনের সরকারের অধীনে সরকার পরিচালিত তহবিল সম্পর্কে এমন সহজ, সরল ও স্বচ্ছ ধারণাই মানুষের ছিল। বাজপেয়ী জমানাতেও মানুষ অন্যথা ভাবেননি। ভাবনার আমূল বদল ঘটিয়ে দিয়েছে মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার। মোদীরা জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা এধরনের তহবিলকে আমজনতার দ্বারে উন্মুক্ত করতে চান না। কারা কত টাকা দিচ্ছে এবং সেই টাকা কোথায় কীভাবে খরচ হচ্ছে সেটা পুরোপুরি গোপন রাখতে বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ তাঁরা মনে করেন জনগণের দেওয়া এই টাকার কোনও হিসাব তারা দেবেন না। কেউ এটা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থাকা সত্ত্বেও নতুন এক তহবিল ‘পিএম কেয়ার’ মহা শোরগোল তুলে গঠন করা হয় করোনা মহামারীর সময় ২০২০ সালের ২৭ মার্চ। সরকারি ঘোষণায় একে জনকল্যাণমূলক ট্রাস্ট হিসাবে দেখিয়ে তার উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয় জরুরি পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও সাহায্য দান। বোঝা যায়নি বা কোনও ব্যাখ্যাও মেলেনি একই উদ্দেশ্যে চালু থাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল সত্ত্বেও দ্বিতীয় আর একটি চালু করার দরকার হলো কেন? তখনই প্রশ্ন উঠেছিল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কি মোদীরা তাদের পছন্দের লোকের কাছ থেকে টাকা নিতে পারছে না বা খুশি মতো খরচ করতে পারছেন না? সেজন্যই কি পিএম কেয়ার জরুরি হয়ে পড়ে? ধাপে ধাপে দাবি ওঠে জনগণের দানে গড়ে ওঠা তহবিল পরিচালনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা চাই। তথ্যের অধিকার আইনে তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। অডিট করতে হবে সিএজি-কে দিয়ে। মোদী সরকার সবটাই অস্বীকার করে। মোদীর নেতৃত্বে পিএম কেয়ার চালায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। সরকারি দপ্তর, সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি পরিকাঠামোয় চলে পিএম কেয়ার। টাকা আসে রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে তাদের কর্মীদের বেতন থেকে। তারপরও বলা হচ্ছে এটা নাকি বেসরকারি তহবিল। তাই তার কোনও তথ্য, হিসাব প্রকাশ করা যাবে না। সর্বশেষ ঘোষণা করা হয়েছে সংসদেও এইসব তহবিল নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। এটা কোনও ব্যক্তির নিজস্ব পরিবারের বিষয় নয়। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও এখানে নেই। তাহলে এত গোপনীয়তা ও আড়াল করার চেষ্টা কেন? তবে কি অর্থসংগ্রহে ও খরচে এমন কোনও ঘাপলা আছে যা প্রকাশ্যে এলে মোদীরা বেকায়দায় পড়তে পারেন। তাই কি তথ্য গোপনে সরকার এতটা মরিয়া। সৎ সরকারের সৎ নেতারা সব সময় চাইবেন তাদের কাজে যেন কোনও অস্বচ্ছতা না থাকে। মোদী অস্বচ্ছতার আড়ালে সবটা ঢাকতে চাইছেন কেন? ডাল মে সত্যিই কুছ কালা হায়।

Comments :0

Login to leave a comment