Post Editorial

নাজিরাবাদ এবং ১২ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট

উত্তর সম্পাদকীয়​

গার্গী চ্যাটার্জি


দক্ষিণ ২৪ পরগনার নাজিরাবাদে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘ওয়াওমোমো’ কাণ্ড কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অবধারিত পরিণতি, যেখানে মুনাফার স্বার্থে মানুষের জীবনকে নির্দ্বিধায় বলি দেওয়া যায়। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ২৫ জন শ্রমিকের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৭ হবে কারণ, থানায় দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী ২৭ জন শ্রমিক নিখোঁজ। সংখ্যার হিসাবে দেখলে এগুলি হয়তো প্রশাসনের নথিভুক্ত তথ্য, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি জীবনের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার দলিল।
একটি কারখানার ভিতরে শ্রমিকদের আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেওয়া এবং তার ফলে তাদের জীবন্ত দগ্ধ হতে দেওয়া—এটি কোনোভাবেই ‘অবহেলা’ বা ‘ত্রুটি’ বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি শ্রমিককে মানুষ হিসাবে নয়, কেবল উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে দেখার মানসিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ। এই মানসিকতা কোনও ব্যক্তির নয়, একটি গোটা ব্যবস্থার—যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্য মানুষের প্রয়োজন মেটানো নয়, বরং সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা।
নাজিরাবাদের ঘটনা নতুন করে সেই মৌলিক প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে— এই দেশে কি শ্রমিকের জীবনের কোনও অন্তর্নিহিত মূল্য আছে? না কি শ্রমিক কেবল একটি ব্যয়যোগ্য উপকরণ, যাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, আবার প্রয়োজনে নিশ্চিহ্ন করেও দেওয়া যায়? বাস্তবতা বলছে, আজকের উন্নয়নের ভাষায় শ্রমিকের নিরাপত্তা একটি “খরচ”, আর সেই খরচ কমানোই কর্পোরেট সাফল্যের শর্ত।
এই ঘটনায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশ্নের মুখে। শ্রম দপ্তরের নিয়মিত পরিদর্শন কোথায় ছিল? নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের খবর কি প্রশাসনের অজানা ছিল? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, এগুলি অজানা ছিল না— বরং উপেক্ষিত ছিল। কারণ রাষ্ট্র আজ নিরপেক্ষ কোনও রক্ষক নয়; সে এমন এক কাঠামোর অংশ, যেখানে নীতি নির্ধারণ হয় বিনিয়োগ ও কর্পোরেট স্বার্থের সুবিধা দেখে। শ্রমিকের জীবন সেখানে গৌণ।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের নীতির মধ্যে মৌলিক কোনও ফারাক খুঁজে পাওয়া কঠিন। একদিকে কেন্দ্রীয় স্তরে দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের ফসল ২৯টি শ্রম আইন বাতিল করে ৪টি শ্রম কোড চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মালিকপক্ষের হাতে ছাঁটাই, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও নিরাপত্তাহীন শ্রম ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজ্য স্তরে ‘শিল্প-বান্ধব পরিবেশ’-এর নামে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে কার্যত অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এই দুইয়ের মিলিত ফলই নাজিরাবাদের মতো ঘটনা।
শ্রমিকদের ভিতরে তালাবদ্ধ করে রাখার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিল্প বিপ্লবের প্রথম যুগের সেই অমানবিক কারখানাগুলির কথা, যেখানে শ্রমিকের জীবন ছিল সস্তা, আর শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হতো ক্ষুধা ও ভয়ের মাধ্যমে। আজ প্রযুক্তি বদলেছে, ব্র্যান্ডের নাম বদলেছে, কিন্তু শোষণের চরিত্র বদলায়নি। শুধু তা আরও সংগঠিত, আরও আইনি ও আরও নির্বিকার হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনাকে যদি কেবল একজন মালিকের নিষ্ঠুরতা বলে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে সত্যের বড় অংশ আড়াল থেকে যাবে। আসল সমস্যা ব্যক্তির নয়, কাঠামোর। যতদিন উৎপাদনের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে অল্প কয়েকজনের হাতে, যতদিন শ্রমিক নিজের শ্রমের উপর কোনও অধিকার পাবে না, ততদিন এই ধরনের ট্র্যাজেডি ঘটতেই থাকবে। কারণ এই ব্যবস্থায় শ্রমিকের নিরাপত্তা কোনও নৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি লাভ-ক্ষতির হিসাবের বিষয়।
নাজিরাবাদের ঘটনা তাই শুধু শোকের নয়, প্রশ্ন তোলারও সময়। কোন উন্নয়নের জন্য এই প্রাণহানি? কোন শিল্পায়নের নামে শ্রমিককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা যায়? যে উন্নয়ন মানুষের জীবনকে রক্ষা করতে পারে না, সেই উন্নয়নের দাবি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ।
নাজিরাবাদের এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশজুড়ে শ্রমিক সমাজ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সিআইটিইউ সহ ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রভিত্তিক ফেডারেশনের আহ্বানে যে দেশজোড়া সাধারণ ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তার মূল দাবিই হলো— কর্পোরেট স্বার্থে রচিত চারটি শ্রম কোড বাতিল করে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ২৯টি শ্রম আইন কার্যকর রাখা। নাজিরাবাদের ঘটনা এই দাবির যৌক্তিকতাকে আরও জোরালো ও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে।
এই চারটি শ্রম কোড কার্যত এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে শ্রমিক সুরক্ষা আর রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা নয়, বরং মালিকের সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। শ্রম দপ্তরের পরিদর্শন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ‘সেল্ফ সার্টিফিকেশন’-এর মতো ধারণা চালু করা হয়েছে, যার অর্থ মালিক নিজেই নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে— এই অবাস্তব প্রত্যাশা। ফলত বাস্তবে যা ঘটছে, তা হলো নাজিরাবাদের মতো কারখানায় বছরের পর বছর ধরে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন হলেও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নেই।
স্বাধীনতার পর থেকে শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ যে শ্রম আইন কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা কখনওই শাসকশ্রেণির দান ছিল না; বরং ছিল শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ফসল। ফ্যাক্টরি আইন, ন্যূনতম মজুরি আইন, ট্রেড ইউনিয়ন আইন, শিল্প বিরোধ আইন, চুক্তিভিত্তিক শ্রম আইন— এই সব আইনের মাধ্যমে কাজের সময়, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ, সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও মালিকের ক্ষমতার সীমা নির্ধারিত হয়েছিল। এই আইনগুলির উদ্দেশ্য ছিল পুঁজির সীমাহীন লোভের বিরুদ্ধে শ্রমিকের ন্যূনতম সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
কিন্তু সাম্প্রতিক শ্রম কোড প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই সুরক্ষা কাঠামোকে মূলত ভেঙে ফেলা হয়েছে। ২৯টি শ্রম আইনকে একত্রিত করে ৪টি কোডে রূপান্তর করার অর্থ শুধু আইনি “সংহতি” নয়—বাস্তবে এটি নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, মালিকপক্ষের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সুরক্ষার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করা। ছাঁটাই সহজ করা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসারিত করা, পরিদর্শন ব্যবস্থাকে দুর্বল করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত কঠোর করা— সব মিলিয়ে এটি শ্রমিকের উপর এক ঐতিহাসিক আঘাত। স্বাধীনতার পর এত বড় মাত্রায় শ্রমিক অধিকারের আইনি সুরক্ষাকে একসঙ্গে দুর্বল করার নজির প্রায় নেই। এই কারণেই বহু শ্রম বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শ্রমিক শ্রেণির উপর সবচেয়ে বড় নীতিগত আক্রমণগুলির একটি।
যে ২৯টি শ্রম আইন দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল, সেগুলি কেবল আইনি বিধান ছিল না—সেগুলি ছিল শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার ন্যূনতম গ্যারান্টি। ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট, কন্ট্রাক্ট লেবার অ্যাক্টের মতো আইনগুলি কারখানার ভিতরে কীভাবে কাজ চলবে, কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কীভাবে মালিকের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করতে হবে— সেসব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত করেছিল। এই আইনগুলিকে দুর্বল করাই আজকের কর্পোরেট–কেন্দ্রিক নীতির প্রধান লক্ষ্য।
নাজিরাবাদেরঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—রাজ্যের শ্রম দপ্তরের চালু থাকা শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার সদিচ্ছা থাকলে কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত? শ্রমিকদের ভিতরে তালাবদ্ধ করে রাখা কি এত সহজ হতো? নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর শাস্তির ভয় থাকলে কি মালিকপক্ষ এতটা বেপরোয়া হতে পারত? উত্তর স্পষ্ট। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, এ রাজ্যের সরকার প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করলেও— তাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে কার্যকর করার বহু পূর্বেই এরাজ্যে তা পিছনের দরজা দিয়ে কার্যকর করা হয়। নাজিরাবাদের ঘটনা ও রাজ্যের সরকারের দ্বারা প্রচলিত শ্রম আইনকে অকার্যকর করার মাধ্যমে একথা আজ প্রমাণিত হলো— শ্রম আইন দুর্বল করা মানে সরাসরি শ্রমিকের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
এই পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সারা দেশে যখন কর্পোরেট স্বার্থরক্ষাকারী নীতিকে “সংস্কার” হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে, তখন কেরলের বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট পরিচালিত সরকার প্রকাশ্যেই জানিয়েছে যে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী বিধান তারা রাজ্যে কার্যকর হতে দেবে না। কেরলের অবস্থান দেখায় যে বিকল্প নীতি সম্ভব— যেখানে উন্নয়ন মানে কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বরং শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা রক্ষা করা।
কেরলে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সামাজিক অগ্রগতি এবং জনমুখী নীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শ্রম কোডের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান একটি রাজনৈতিক বার্তাও বটে—উন্নয়নের নামে শ্রমিক অধিকার বিসর্জন দেওয়া অনিবার্য নয়। এই অবস্থান দেশের শ্রমিক সমাজকে নৈতিক শক্তি জোগাচ্ছে এবং স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ভিন্ন পথ বেছে নেওয়া সম্ভব।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির দেশজোড়া সাধারণ ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত কর্মসূচির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে একটি বিশেষ বাস্তবতা রয়েছে। ওই সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলার কারণে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের অসুবিধা এড়াতে গণপরিবহণে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ধর্মঘটের গুরুত্ব কমছে। বরং শিল্পক্ষেত্র, কর্মস্থল ও উৎপাদন ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে শিল্প ধর্মঘট সংগঠিত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নাজিরাবাদ আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছে— যতদিন শ্রম আইন দুর্বল থাকবে, যতদিন রাষ্ট্র কর্পোরেট স্বার্থের প্রহরী হয়ে থাকবে, ততদিন এমন ট্র্যাজেডি অনিবার্য। ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ ধর্মঘট সেই অনিবার্যতাকেই চ্যালেঞ্জ করার একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। এই ধর্মঘট শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামেরই ধারাবাহিক প্রকাশ।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদালতের তরফে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে, যেখানে শ্রমিকদের ধর্মঘট, কাজ বন্ধ রাখা বা সংগঠিত প্রতিরোধকে ‘অর্থনীতির ক্ষতি’, ‘উৎপাদনে বিঘ্ন’ বা ‘জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী’ হিসাবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিক সুরক্ষা, কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলিকে অনেক ক্ষেত্রে গৌণ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় যখন শ্রমিকের অধিকারকে মূলত একটি “পরিচালনাগত সমস্যা” বা “ব্যবস্থাপনার অসুবিধা” হিসাবে দেখার ভাষা ব্যবহার করে, তখন তার বার্তা নিচের স্তরে স্পষ্টভাবে পৌঁছে যায়। মালিকপক্ষ আরও সাহস পায়, প্রশাসন আরও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। শ্রমিক বুঝে যায়— আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ অনিশ্চিত।
আইন ও বিচারব্যবস্থার এই ভাষাগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন শ্রমিক শোষণকে সরাসরি উৎসাহিত করে। কারণ পুঁজিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় মালিক শ্রেণি সবসময়ই খোঁজে এমন সামাজিক ও আইনি পরিবেশ, যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত থাকে। যখন আদালতের পর্যবেক্ষণে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নের চেয়ে ‘বিনিয়োগের পরিবেশ’ বা ‘অর্থনৈতিক গতি’ বেশি গুরুত্ব পায়, তখন সেই পরিবেশে নাজিরাবাদের মতো ঘটনা কেবল সম্ভবই নয়, বরং অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এখানেই চারটি শ্রম কোডের সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সাম্প্রতিক প্রবণতার এক বিপজ্জনক মিল চোখে পড়ে। শ্রম কোড শ্রমিক সুরক্ষাকে শিথিল করেছে, আর সেই শিথিলতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে এমন এক কথাবার্তার মাধ্যমে, যেখানে শ্রমিকের প্রতিরোধ, ধর্মঘট বা নিরাপত্তার দাবি ‘অযৌক্তিক’ বলে চিহ্নিত হচ্ছে। এই দুইয়ের সম্মিলিত ফল হলো— শ্রমিক আরও অসুরক্ষিত, মালিক আরও নির্ভীক।
নাজিরাবাদ তাই কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল নয়, এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক–আইনি পরিবেশের প্রতিফলন। যে পরিবেশে শ্রমিকের জীবন প্রশ্নাতীত নয়, বরং প্রয়োজনে বিসর্জন যোগ্য। এই বাস্তবতাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির দেশজোড়া সাধারণ ধর্মঘটের গুরুত্বকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ এই ধর্মঘট শুধু সরকারের নীতির বিরুদ্ধেই নয়, সেই নীতিকে স্বাভাবিক করে তোলার যে সামাজিক ও আইনি প্রবণতা গড়ে উঠছে— তার বিরুদ্ধেও এক সম্মিলিত প্রতিবাদ।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের রাজ্যে শিল্প ধর্মঘটকে সর্বাত্মকভাবে সফল করা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। আদালত, প্রশাসন ও কর্পোরেট স্বার্থের এই ত্রিমুখী চাপে শ্রমিক যদি সংগঠিতভাবে আওয়াজ না তোলে, তবে নাজিরাবাদের মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। শিল্পাঞ্চল থেকে পরিষেবা ক্ষেত্র—সব জায়গায় কাজ বন্ধ রেখে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, শ্রমিকের জীবন কোনও উন্নয়নের পথে বাধা নয়, বরং সমাজের ভিত্তি।
নাজিরাবাদ আমাদের সতর্ক করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির শিল্প ধর্মঘট সেই সতর্কবার্তাকে রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ দেওয়ার সুযোগ। আমাদের রাজ্যে এই ধর্মঘটকে সর্বাত্মকভাবে সফল করাই আজ শ্রমিক শ্রেণির প্রতি, এবং ভবিষ্যতের প্রতি, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

 

Comments :0

Login to leave a comment