রাত পোহালেই দুনিয়া দেখবে ভারতের অন্তত ৩০ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ময়দানে শাসক-মালিকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এঁরা শ্রমজীবী শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদন করেন, পরিষেবা দেন কিন্তু ন্যায় সঙ্গত মজুরি পান না, কাজের নিরাপত্তা নেই, নেই সামাজিক কোনও নিরাপত্তা। অনিশ্চিত রুজিই এঁদের জীবনের বাস্তবতা। বিশ্বে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসাবেই ভারতের পরিচয়। এদেশে গণতন্ত্রের ভিতও নাকি শক্তিশালী। কিন্তু দেশের মোট শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশেরও বেশি (৫০ কোটির বেশি) কাজ করেন অসংগঠিত ক্ষেত্রে। শোষণের তপ্ত কড়াইয়ে প্রতিদিন দগ্ধ হয়ে প্রতিদিন চলে এঁদের রুজির লড়াই, বাঁচার লড়াই। অনিশ্চিত কাজে অনিশ্চিত মজুরি। সেটা এতটাই কম যে সভ্য সমাজে ন্যূনতম চাহিদা মেটানো যায় না। তাই দারিদ্র, অসহায়তা তাদের নিত্য সঙ্গী। এই মানুষরা বেশি কিছু চান না। চান স্থায়ী কাজ, স্থায়ী মজুরি। এমন মজুরি যা পরিবারের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতে পারবে। অসুখবিসুখে ন্যূনতম চিকিৎসা করা যাবে। মাথা গোঁজার মতো নিরাপদ একটা আস্তানা থাকবে। সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু এই তথাকথিত জনকল্যাণ রাষ্ট্র তার মোট জনসংখ্যার অর্ধেককে সেই সুযোগ দেয় না। তাদের কাজের নিশ্চয়তা নেই, রুজির নিশ্চয়তা নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, সন্তানের শিক্ষার সামর্থ্য নেই। আগের প্রায় ৩০টি শ্রম সংক্রান্ত আইন বাতিল করে যে চারটি শ্রমকোড জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে এই ৫০ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোনও আইনি অধিকার বা রক্ষাকবচ নেই। এদেরকে রেখে দেওয়া হয়েছে পুঁজির অবাধ শোষণের খোরাক হিসাবে। শ্রমশক্তির যে ১০ শতাংশ কোনও না কোনোভাবে সংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত তাদের অর্ধেককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্রম কোডের আওতার বাইরে। যে মাত্র ৫ শতাংশ চার শ্রমকোডের আওতায় তাদেরও কার্যত বলির পাঁঠা বানিয়ে কর্পোরেট পুঁজির শোষণের নৈবেদ্যে অর্পণ করা হয়েছে। শ্রমকোড, তবে সেটা মালিকদের জন্য আইনি অস্ত্র। শ্রমিকদের জন্য সবদিক থেকে বঞ্চিত ও আক্রান্ত হবার ঘোষণাপত্র।
মূলত শ্রমকোডের নামে শ্রমিক-কর্মচারিদের বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী আক্রমণের বিরুদ্ধে ধর্মঘট। তার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আরও অনেক কিছু। মোদী জমানা ক্রমাগত যেভাবে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার হরণ, রুটি-রুজি সঙ্কোচন, শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে মালিকের মুনাফা বৃদ্ধির যে বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে শ্রমজীবীরা। যাবতীয় আইন সংশোধন করে বা বাতিল করে যে আইন তৈরি হচ্ছে প্রত্যেকটিতেই মানুষের অধিকার খর্ব করে শাসক-শোষক তথা পুঁজির মালিকদের অধিকার বাড়ছে।
এই সরকার সম্পদের কেন্দ্রীভবনে বিশ্বাস করে। কর্পোরেট পুঁজিই এই সরকারের নয়নের মণি। তাই কর্পোরেট স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার রূপায়িত হচ্ছে সরকারের প্রতিটি নীতি ও পদক্ষেপ। কর্পোরেট স্বার্থ দেখতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন। কর্পোরেট স্বার্থ মানেই কর্পোরেট ও বিত্তবানদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি। তাই সমাজে তীব্র গতিতে বাড়ছে বৈষম্য। এই অসাম্যের শোষণের বঞ্চনার বিরুদ্ধে দেশের দশটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন জোটবদ্ধভাবে এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। তাতে যোগ দিয়েছে কৃষক ও খেতমজুররাও। তাই ধর্মঘটের প্রভাব শুধু শহর ও শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রসারিত হবে গ্রামেও।
Editorial
আগামীকাল ধর্মঘটে শ্রমিক কৃষক খেতমজুর
×
Comments :0