Bangladesh

জ্বালানি সঙ্কট! তেল কেনার হিড়িক বাংলাদেশে

আন্তর্জাতিক

মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
ইউটিউব, ফেসবুকে গুজব ও ফেক নিউজ ছড়ানোর ফলে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ভিড় বাড়ছে পেট্রোল পাম্পে। বেশি জ্বালানী তেল দিতে হিম শিম খাচেছন পাম্পের মালিকেরা। এর ফলে দেখা দিচেছ তেলের সঙ্কট। কয়েক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এশিয়া মহাদেশ জুড়ে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এদিকে, জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মনে সৃষ্টি হওয়া উদ্বেগ এবং অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নির্দেশ জারি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন(বিপিসি)। একই সঙ্গে যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের একটি দৈনিক কোটা ঠিক করা হয়েছে, যাতে মজুত ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু রাখা যায় এবং অযৌক্তিক মজুত ঠেকানো সম্ভব হয়।
চট্টগ্রামের বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের অফিস থেকে জারি করা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য জ্বালানি তেলের ব্যবহার অপরিহার্য হলেও ব্যবহৃত তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমান বিশ্ব সংকটের প্রেক্ষাপটে কখনও কখনও আমদানি কাজ বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেক ভোক্তা ও ডিলারের মধ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিপিসি জানায়, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অনেক ডিলার ডিপো থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোটরসাইকেলের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১০ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কন্টেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল সরবরাহ করা যাবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ফিলিং স্টেশনগুলোকে জ্বালানি বিক্রির সময় পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে নগদ রসিদ দিতে হবে এবং পুনরায় জ্বালানি নেওয়ার আগে আগের ক্রয়ের বিলের কপি জমা দিতে হবে। ডিলারদেরও নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে এবং ডিপোতে মজুদ ও বিক্রির তথ্য জমা দিতে হবে।
বিপিসি জানায়, দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত আমদানি কাজ চালু রয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে তেল দেশে আসছে। রেল ওয়াগন ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সারা দেশের ডিপোগুলোতেও নিয়মিত জ্বালানি পাঠানো হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যাপ্ত বাফার মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে জ্বালানি বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেছে বিপিসি।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেন, বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে প্রবাসী আয়, কর্মসংস্থান ও নিত্যপণ্যের দামের ওপর। তিনি বলেন, অতীতের সরকারগুলো দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থে নানা ধরনের চুক্তি ও নীতি গ্রহণ করায় দেশের জ্বালানি খাত আমদানি ও ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। বিশ্ব সংকটের প্রভাব এখন আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা এত বেশি না হলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এতটা গভীর হতো না। জনস্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো প্রকাশ এবং প্রয়োজনে বাতিলের দাবি তুলেন এই অর্থনীতিবিদ। 
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রক্তন চেয়ারম্যান এম এ মায়ীদ বলেন, ইউনুস সরকারের সময় বিশেষ আইনের আওতায় টেন্ডার ছাড়াই যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হয়েছে, এর অনেকগুলোতে অনিয়ম হয়েছে। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভোক্তাদের সাশ্রয়ী মূল্য এবং জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।   শুক্রবার বিকেল চারটে নাগাদ নগরীর সাগরপাড়া এলাকার আফরিন তেল পাম্প বন্ধ দেখা যায়। পাম্পের কর্মী মানিক জানান, তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় বিকেল থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে। পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী বিভাগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল জানান,  কয়েকটি পাম্পে তেল না থাকায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব পাম্পে তেল রয়েছে, সেগুলোতেও সীমিত পরিমাণে বিক্রি করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় তেল কেনার হিড়িক পড়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment